০৭ এপ্রিল, ২০১৭ ১০:৫৯ পিএম
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক

শহীদ ডা. মুহাম্মদ শফী

শহীদ ডা. মুহাম্মদ শফী

 

  • নাম : ডা. মুহাম্মদ শফী
  • পিতার নাম : সুফি আবদুল লতিফ
  • পিতার পেশা : সরকারি চাকরি
  • মাতার নাম : বিবি আয়সা খাতুন
  • ভাইবোনের সংখ্যা : চার ভাই ও চার বোন; নিজক্রম-অষ্টম
  • ধর্ম : ইসলাম স্থায়ী ঠিকানা
  • স্হায়ী ঠিকানা (আদি) : গ্রাম-দিঘড়ে, ডাকঘর-তারকেশ্বর, জেলা-হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
  • নিহত, নিখোঁজ হওয়ার সময় ঠিকানা : বাড়ি-‘মুশতারী লজ’, সড়ক-বাটালী রোড, এনায়েতবাজার, ওয়ার্ড নং-২২, ডাকঘর-জি.পি.ও. থানা-কোতোয়ালী, জেলা-চট্টগ্রাম
  • জন্ম : ২২ শ্রাবণ-১৩২২; ৫ এপ্রিল ১৯১৫

 

শিক্ষাগত যোগ্যতা :

  • ম্যাট্রিক : প্রথম বিভাগ, ১৯৩০, হুগলি জেলা হাই স্কুল, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
  • আইএসসি : প্রথম বিভাগ, ১৯৩২, হাওড়া সরকারি কলেজ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
  • এমবিবিএস : দ্বিতীয় বিভাগ ১৯৩৬, কলকাতা মেডিকেল কলেজ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত  
  • শখ : ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, দাবা খেলা ও বেহালা বাজানো; কলকাতা বেতার ‘আকাশবাণী’র শিল্পী ছিলেন
  • পুরস্কার : ‘জনসংখ্যা ও সম্পদ’ গ্রন্থের জন্য ‘ ন্যাশনাল ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৬৪ রাইটারস গিল্ড পাকিস্তান’ সংস্থা  স্বরচিত গ্ৰন্থ : 'চিকিৎসা বিজ্ঞান’ (অনুবাদ), ‘চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস’ (অনুবাদ), ‘জনসংখ্যা ও সম্পদ', ‘প্রেম ও বিবাহের সম্পর্ক', 'চরিত্রহানীর তাৎপর্য', 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ" (অনুবাদ), শান্তি না শক্তি' (অনুবাদ), "হুনানের কৃষক আন্দোলন', (অনুবাদ) জনযুদ্ধের বিজয় দীর্ঘজীবী হোক’ (অনুবাদ), ‘নয়া গণতন্ত্ৰ'
  • রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা : প্রগতিশীল রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন
  • চাকরির বর্ণনা : চুক্তির ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলের দন্ত চিকিৎসক ছিলেন
  • হত্যাকারীর পরিচয় : আল-বদর
  • নিহত, নিখোঁজ হওয়ার তারিখ : ৭ এপ্রিল ১৯৭১, দুপুর ১-৩০ মি.
  • মরদেহ প্রাপ্তিস্থান : পাওয়া যায়নি
  • স্মৃতিফলক/স্মৃতিসৌধ : নেই
  • মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে সাহায্য/দান/পুরস্কার : পাননি
  • স্ত্রীর নাম : বেগম মুশতারী শফী
  • বিয়ে : ১৬ জানুয়ারি, ১৯৫৫

 

সন্তান-সন্ততি : তিনপুত্র ও চার কন্যা

  • ইয়াসমিন ফারজানা : এম.এ (ইতিহাস), ব্যবসায়ী
  •  মো. এবাদ ইয়াসিন শফী : ইলেকট্রিক্যাল ডিপ্লোমা, ব্যবসায়ী
  •  মে'রাজ তাহসীন শফী : এমকম (ব্যবস্থাপনা), ব্যবসায়ী
  • নাসরিন রিজওয়ানা : বিএ, বিদেশে চাকরিরত
  • নেয়াজ মোহসিন শফী : এমকম (হিসাব বিজ্ঞান), ব্যাংকার  
  • নাজনীন রুমানা : এম.এ. (সমাজ বিজ্ঞান), শিক্ষকতা
  • শারমিন তারানা : এমএ (ফাইন আর্টস), গৃহিণী 
  • মুক্তিযুদ্ধে শহীদ নিকটাতীয় : এহসান (শহীদ চিকিৎসকের শ্যালক)

 

আমার স্বামী

শহীদ ডা. মুহাম্মদ শফী

মুশতারী শফী

১৯৫৫ সাল। ১৬ জানুয়ারি। আমার বয়স ১৫ পেরোবার পরের দিন। ডা, শফীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তাঁর সাথে আমার বয়সের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাঁর সদাহাস্য প্রাণচঞ্চল আমুদে স্বভাব, তারুণ্য, আমার প্রতি উদার মনোভাব, অগাধ ভালোবাসা আমি অভিভূত করেছিল। আমি যেন এক নিশ্চিত আশ্রয় পেলাম। শিশুকালে মাতৃহওয়ায় আমার লেখাপড়া তেমন হয়নি, কিন্তু তিনি আমার শিক্ষার পিপাসা মেটাতে চেষ্টা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গৃহশিক্ষক রেখে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম, পরে গিটার শিক্ষা। সবকিছুতেই তিনি যেন আমাকে পুরোপুরিভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আমি সফল হইনি, সে ব্যর্থতা আমার। দেখেছি অনেককে প্রথমে তাঁর রোগী ও আসতেন, পরে এমন বন্ধু হয়ে যেতেন যে কেবল তাঁরই নয়, পরিবারের সবার কি তাঁর আত্মীয় পরিবারে কেউ এলে তাদের কাছ থেকেও তিনি ফি নিতেন না। শফী প্ৰগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক অথচ ধাৰ্মিক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলের রাজবন্দিদের চুক্তির ভিত্তিতে চিকিৎসা করতেন। আর এ তার পক্ষে আরো সম্ভব হয়েছিল গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া, মাঝে মধ্যে কড়া পুলিশ প্রহরায় রাজবন্দিদের নিয়ে আসা হতো আমাদের গৃহসংলগ্ন তার চেম্বারে। জেল কর্তৃপক্ষকে বলে এ কাজটি তিনিই করেছিলেন কৌশলে। বিয়ে থেকেই দেখছি বাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে রাজনৈতিক আড্ডা, মাঝে মধ্যে গণসঙ্গীতের আসর। এ সময় চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রান্তি ক’, পরে জাগৃতি”। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রচুর অর্থ সাহায্য করতেন এই প্রতিষ্ঠান দুটিকে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করলে অনেক রাজনৈতিক নেতা গ্রেফতার হন, অনেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। যাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন, তাঁরা আসতেন গভীর রাতে হঠাৎ হঠাৎ৷

ডা. শফীকে দেখতাম তখন আনন্দে আত্মহারা হতে। আমাকে অনুরোধ করতেন তাঁদের রেধে খাওয়াতে, পরে এ কাজ আমার গা-সওয়া হয়ে গেলে। মাঝে মধ্যে আমি বিরক্ত হলে তিনি বলতেন, ‘এঁদের সেবা করা মানেই দেশের কাজ একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, 'দেশের কাজ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছো? তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘বুঝবে না, তুমি এখনো ছেলেমানুষ। ঠিক আছে পূর্ণেন্দুদা অথবা হারুন এলে ওদের কাছ থেকে জেনে নিও।”

ডা. শাফী নারীশিক্ষার ব্যাপারে প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতেন গভীরভাবে । সেই সাথে বিশ্বাস করতেন নারীর সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার ছাড়া সামাজিক কল্যাণ এবং দেশের অগ্রগতি কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই তাঁর একান্ত সাহায্য-সহযোগিতায় আমি গড়ে তুলেছিলাম “বান্ধবী সংঘ’ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ডা. শফী প্রথম জীবনে বেহালা বাজাতেন, ছবিও আঁকতেন। কিন্তু পেশাগত কারণে সেসবের চর্চা আর অব্যাহত থাকেনি। তবে ছবি তোলার শখ ছিল তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত।‘বান্ধবী সংঘের’ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনিই ছিলেন একমাত্র বিনে-পয়সার ক্যামেরাম্যান। ১৯৬৮ সালে সম্পূর্ণ মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত ‘মেয়েদের প্রেস’ নামে একটি ক্ষুদ্র ছাপাখানা আমরা প্রতিষ্ঠা করি আমারই বাসগৃহে। এই প্রেস প্রতিষ্ঠার পেছনেও ডা. শাফীর ছিল অপরিসীম উৎসাহ। এর সিংহভাগ অর্থ তিনিই দান করেছিলেন। শুধু তাই নয়। চেম্বারে রোগী দেখার পরের সময়টুকুও তিনি প্রেসের জন্য দিতেন।

ডা. শফীর স্মৃতিকথা বলতে গেলে দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয় অনিবাৰ্যভাবে এসে পড়ে। তাই তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে একাত্তরের কথা বলতেই হবে। ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের অবাঙালি আধ্যুষিত এলাকায় বাঙালি নিধন চলছে পুরোদমে। এ সময় একদিন আমাদের পাড়ায় এনায়েত বাজারের বাঙালি ছেলেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে দা, ছুরি, হকিস্টিক, লোহার রড ইত্যাদি নিয়ে অবাঙালি বাড়ি আক্রমণ করতে হৈহৈ করে ছুটে এলো। আমাদের এই এলাকায় আগাখানি ও বোহরা সম্প্রদায়ের অবাঙালি ব্যবসায়ীদের বসবাস বেশি। ডা. শফীকে দেখলাম সেই ক্ষুব্ধ জনতার সামনে ছুটে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়িয়ে, বক্তৃতা করে, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের আদর্শ ব্যাখ্যা করে, এমনকি নিজের জীবনদানের জন্য প্ৰস্তুত বলে জানালে সেই উন্মত্ত জনতা থেমে যায়, ফিরে যায়। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিল তাঁর রোগী। ডা. শফীর আরেকটি গুণ ছিল দরিদ্র প্রতিবেশী এবং শ্রমজীবী মানুষদের কাছ থেকে কখনোই ফি নিতেন না। শুধু তাই নয়, অনেকেই বুঝতো না 'ডেন্টাল সার্জন' মানে কেবলই দাঁতের চিকিৎসক। সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার' লেখা আছে, তাই যে কোনো রোগের জন্যই ওরা আসতো, এমনকি গভীর রাতেও আসতো। তিনি বিরক্ত হতেন না, দেখতাম হাসিমুখে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ দিচ্ছেন, বড় রকমের কিছু হলে চিঠি লিখে পাঠাতেন। অন্য ডাক্তারের কাছে যাতে ফি না নেয়। অথবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন, ভালো না হওয়া পর্যন্ত খোঁজখবর নিতেন। এ কারণেই তিনি সবার পরিচিত ছিলেন, অনেকেই তাকে ভালোবাসতো, শ্রদ্ধা করতো, আর তাই অবাঙালি প্রতিবেশীরাও সেদিন রক্ষা পেয়েছিল।

এলো সেই কালরাত ২৫ মার্চ। চট্টগ্রাম শহর হঠাৎ করেই যেন ভয়ানক রকম থমথমে হয়ে উঠলো।

রাত প্রায় ১০টা। পথঘাট নিঝুম। অসহযোগ আন্দোলনের ফলে ইলেকট্রিসিটি নেই। সারা শহর অন্ধকার। বিকেলের দিকে কে একজন উড়ো-ফোনে বলেছিল, “বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।” শঙ্কা সবার মনে। সেই অবস্থায় ডা. শফী গোসল করে এলেন (তাঁর চিরদিনের অভ্যাস খুব ভোরে আর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা)। মন শান্ত ও স্থির করার জন্যই কি না জানি না, গিটারটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বাজাতে অনুরোধ করলেন। আমি রেগে বললাম, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে, গান-বাজনা করার মতো মনের অবস্থা আছে?” তীর মুখ কিন্তু প্ৰসন্নতায় ভরা। বললেন, “তুমি ভীত ও বিচলিত। আমার কিন্তু আনন্দ হচ্ছে। বাঙালিদের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা এবার পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এবার পাকিস্তানিরা পাততাড়ি না গুটিয়ে পারবে না, দেখে নিও। যাকগে, একটু বাজাও না?” তিনি আমাকে সহজ করতে চাইলেও আমি সহজ হতে পারছি না। বুক কাঁপছে, হাত কাঁপছে। কী বাজাবো? সুর তো সব ভুলে যাচ্ছি। একটা নজরুল গীতির সুর বাজাতে চেষ্টা করলাম। বেসুরো হলো। তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, “অত কঠিন সুরে কেন? রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটি বাজাও,-“নাই নাই ভয় হবে জয়।” বাজালাম।

রাত পৌনে বারোটার দিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলে আমি বাচ্চাদের ও বাড়ির নিরাপত্তার চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেও তিনি তেমন হননি। পরদিন ২৬ মার্চ, কলকাতা রেডিওতে জীবন থেকে নেয়া’ ছবি থেকে গৃহীত সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে "আমার সোনার বাংলা’ গান ও ঘোষকের কণ্ঠে পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঘোষণা শুনে ডা. শফী উত্তেজনায় টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন, “দেখে নিও, আমাদের দেশ এবার স্বাধীন হবেই।” বলতে বলতে আবেগে তার চোখে পানি এলো ।

ঢাকার সাথে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। খবর রটেছে, ঢাকা ম্যাসাকার হয়ে গেছে। পুরুষরা সবাই বেরিয়ে পড়েছে খবরাখবর জানতে । কেবল বেলাল মোহাম্মদ ও ডা. শফী আছেন বাসায়। হঠাৎ বেলাল ভাই বললেন, “আচ্ছা ভাবি, যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে পারবে, যারা পারবে না, তাদের করণীয় কী? আমি নির্বাক চেয়ে রইলাম। তিনি আবার বললেন, ‘ঢাকা রেডিও স্তব্ধ। চট্টগ্রাম রেডিওটা তো কাজে লাগাতে পারি। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্ৰ নাম দিয়ে চালু করে দিলে কেমন হয়?” প্ৰস্তাব শুনে ডা. শফী আনন্দে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বেলাল মোহাম্মদ বেরিয়ে গেলেন, যাওয়ার সময় বলে গেলেন কথাটা এখন যেন প্ৰকাশ না করি। সেদিনই সন্ধ্যায় আবুল কাশেমের কণ্ঠ শোনা গেল, “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি।” অবশ্য আগেই বেলাল ভাই ফোনে বলেছিলেন ‘রেডিওটা অন করে রেখো।” আমাদের উল্লাস আর ধরে না। ডা. শফী রেডিওর ভলিউম এমন বাড়িয়ে দিলেন যে, বাড়ির সামনে ভিড় জমে গেল। ডা. শাফী বললেন, আমাদের এবারে কাজ হবে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী কেবল নিয়মিত শোনা নয়, যে যা শুনবে কাগজে টুকে রাখতে হবে, বেলালদের কাজে লাগবে ।’ আমি আর আমার ভাই এহসান (এম.কম শেষ বর্ষের ছাত্র তখন, ডা. শাফীর সাথে তাঁকেও হারিয়েছি)৷ মিলে তাই করলাম। শুনছি আর দ্রুত লিখছি। বেলাল ভাইসহ “স্বাধীন বাংলা বেতার কমীরা ফিরে সোয়া ১১টায়। ডা. শফীর এই নির্দেশ দারুণ কাজে লাগলো। রাত জেগে, মোমের আলোয় সেসব খবর ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হলো আগামী দিন প্রচারের জন্য কিছু মেটেরিয়ালস। এভাবে আমরা বাসায় ডা. শাফীর একান্ত সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলা বেতারের কাজ চলতে লাগলো ২৯ মার্চ পর্যন্ত ।

২৭ মার্চ। এদিন ডা. শাফী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরেকটি দুঃসাহসিক কাজ করলেন। সন্ধ্যায় ন্যাপ , হারুন অর রশীদ এলেন আমার বাসায়। ব্যস্ত হয়ে ডা. শফীকে নিয়ে ঢুকে গেলেন চেম্বারে। দরজা কাটালেন কিছু সময়। শুনলাম টাইপরাইটারের খটখট শব্দ। অল্প পরে ডা. শফী আমাকেও ডেকে নিলেন ভিতরে। চৌধুরী হারুন বললেন, “ভাবি, আপনার এখানে আমরা কিছু জিনিস রাখবো । কিছু অ্যামুনেশন্স। আমি ভয় পেয়ে বললাম, এই মধ্যশহরে, বাড়ির দু’পাশে রাস্তা, চারদিকে অবাঙালি, এ অবস্থায় এসব এখানে রাখা কি ! ডা. শফী বললেন, "ভাবছো কেন? দেশকে মুক্ত করতে হলে বুকে সাহস রাখতে হবে। তাছাড়া ভয়ের কোন কারণ নেই। হারুন সব ব্যবস্থা করেছে।” হ্যাঁ, চৌধুরী হারুন এভাবে ব্যবস্থা করেছিলেন—আমার বাড়ির দোতলাটা খালি পড়ে ছিল। সেটা একটা অবাঙালির নামে কোর্টস্ট্যাম্প পেপারে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামা ইংরেজিতে টাইপ করা হয়েছে। তারিখ দেয়া হয়েছে এক বছর আগের। বাড়ির মালিক হিসেবে সই করলাম আমি, অবাঙালি ভাড়াটিয়ার নাম সই করলেন চৌধুরী হারুন। রাত ৯টার দিকে দুটি ট্রাক এসে থামলো, তিন-চারজন কর্মী ছেলেসহ চৌধুরী হারুন, ডা. শফী, আমার ভাই এহসান সবাই মিলে গুলিভর্তি কাঠের বাক্সগুলো উপরে তুলতে লাগলো। আর তখন থেকেই অশুভ আশঙ্কায় আমার বুক থেকে থেকে কাঁপতে থাকে।

২৯ মার্চ। চট্টগ্রাম শহর পুরো দখলে চলে গেল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর। চট্টগ্রাম পুরো তাদের দখলে চলে গেলে আমার আতঙ্কের কথা বেলাল ভাইকে জানিয়েছিলাম। তিনিও শঙ্কিত হয়ে ডা. শফীকে অনুরোধ করেছিলেন ওগুলো সরিয়ে ফেলতে। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের কাজে লাগতে পারে, অতএব ওগুলো মেজর জিয়াকে দিয়ে দেয়া হোক। হারুন ভাইকে প্রস্তাবটা জানিয়েছিলেন। তিনি রাজি হননি। আমরা নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। ডা. শফী বাইনোকুলার নিয়ে ছাদে সারাক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখেন পাকসেনাদের।

কোথায় কোথায় দেখা যাচ্ছে। আমার বাড়ির পূর্বদিকে পাহাড়ের উপর কোর্ট বিল্ডিং।। পশ্চিমেও পাহাড়। তার ওপর সিআরবি অফিস আর ‘ইপিআরের’ হেডকোয়ার্টার। কোর্ট বিল্ডিং ওরা দখল করে কামান বসিয়েছে ইপিআর হেডকোয়ার্টার মুখে। যে কোনো সময় গোলা ছুড়লে আমার বাড়ির ওপর এসে পড়তে পারে। এই ভয়ে অনেকেই আমাদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

এলো ৭ এপ্রিল। যে তারিখটি রক্তের অক্ষরে লেখা হয়ে আছে আমার বুকের গভীরে। এদিনেই হারিয়েছি আমি আমার একটি মাত্র ভাইকে, আমার সন্তানেরা হারিয়েছে ওদের স্নেহময় পিতাকে। সকাল ৯টা। একটা জিপ আর একটা লরি এসে থামলো বাড়ির সামনে। চোখের নিমেষে সৈন্যরা আমার বাড়ি ঘিরে ফেললো। তারপর ড্রইংরুমের দরজায় দুমদুম ধাক্কা। ডা. শফী নিজেই ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন, ওরা জানতে চাইলো, ‘ডা. শাফী কে?’ তিনি বললেন, “আমি” । “তুমি এখানে দাড়াও”—ওঁকে ড্রইংরুমে দাঁড় করিয়ে রাখলো। সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়লো বাড়ির ভেতরে। প্রতিটি রুম, বাথরুম, রান্নাঘর তছনছ করে খুঁজলো। ভয়ে আমি কাঠ। যদি এবার দোতলায় যায় এবং তালা ভাঙে-তারপর? কিন্তু না ওরা দোতলায় গেল না। অফিসারকে কী যেন বলে লরিতে গিয়ে উঠলো, সাথে ডা. শফীকেও নিয়ে গেল সার্কিট হাউসে।

আমার আকুল অনুনয়-বিনয়, বাচ্চাদের কান্না, কোনো কিছুতেই ওদের মন গললো না। কিন্তু না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুপুর ১২টার দিকে তিনি ফিরে এলেন। চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না, ডা. শফী আমার সামনে দাঁড়িয়ে। বাচ্চারা আনন্দে জড়িয়ে ধরেছে। ওর আব্বাকে। সবার হাজার প্রশ্ন, কী করে এ সম্ভব হলো?” ডা. শফী ম্লান হেসে বললেন, ফিরে এসেছি ব্রিগেডিয়ার বেগের জন্য। পাকিস্তানের বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মীর্জা আসলাম বেগ ছিলেন ডা. শফীর রোগী। জেনারেল বেগের দাঁতে ক্যান্সার হয়েছে, এই তথ্য মিথ্যে প্রমাণ করে তিনি তাকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। আমি এবার কেঁদে বললাম, ‘এসেছে যখন আর এক মুহূর্ত এ বাড়িতে নয়, এক্ষুণি চলো অন্য কোথাও’ তিনি এবার রাজি। বললেন, “নিশ্চয়ই যাব। কিন্তু এই দিনের বেলা বেরুতে গেলে বিপদের সম্ভাবনা। সবার দৃষ্টি এখন আমাদের দিকে। সন্ধ্যা হোক।” দুপুর ১টা। ভাত দেয়া হয়েছে টেবিলে। বাচ্চাদের নিয়ে তিনি সবে খেতে বসেছেন। আবার গুলির শব্দ, বেরিয়ে দেখি ৪০-৫০ জন সৈন্য আমার বাড়ি আবার ঘিরে ফেলেছে। এরা অন্য গ্রুপ। সাথে দু’জন অফিসার। সৈন্যরা আবার ঢুকে পড়লো বাড়ির ভেতর। ডা. শফী খাওয়া ছেড়ে ওঠে গেলেন ওদের সামনে। আমিও গেলাম ওর সাথে। আমার ভাই এহসানও এসে দাড়ালো পাশে । ওরা বললো, “তুমি আর তোমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এলিগেশন আছে। তোমরা আওয়ামী লীগ করো। গোপন রেডিওর সাথে যুক্ত, তোমাদের এখানে গোপন অস্ত্রও আছে।” শেষের কথায় বুকটা ধড়াস করে উঠলো। এত যে সাহসী ডা. শফী, তীর মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ আমিই সাহসের সাথে প্রতিবাদ করলে ওরা হেসে একটা টাইপ করা কাগজ খুলে ধরেছিল আমাদের চোখের সামনে। হ্যাঁ, এক, দুই করে এগারোটি অভিযোগ রয়েছে আমাদের নামে। আর তাতে স্বাক্ষর রয়েছে আমাদের অবাঙালি প্রতিবেশী দু'জনের, তার মধ্যে একজন ডাক্তার। এদেরকেই ডা. শফী একদিন বঁচিয়েছিলেন। সৈন্যরা এবার

দুপদীপ শব্দে ওঠে গেল দোতলায়। ওরা দুমদাম শব্দে তালা ভাঙছে। সে সময়ের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা নেই। আমরা মৃত্যুর প্রহর গুনছি। তালা ভাঙা শেষ হতেই ওরা উত্তেজনায় ছুটে এলো। হড়বড়িয়ে মেজরদের কী বলতেই হোয়াট" বলে হুঙ্কার ছাড়ল মেজর। আগুন ঝরছে। ওদের চোখে। মুখে কুটিল হাসি। বললে, "চলো উপরে।’ আমরা তিনজনই ওদের সাথে গেলাম উপরে। মেজর বোখারী মুচকি হেসে বললো, মিসেস শফী তুমি বললে তোমার ভাড়াটিয়ারা এসব রেখে গেছেন গত বছর ফেব্রুয়ারিতে। দেখ তো প্রতিটি বাক্সের ওপর কত তারিখ আছে? আমরা তিনজনই প্ৰচণ্ড বিস্ময়ে দেখলাম প্রতিটি বাক্সের ওপর লাল কালিতে ইংরেজিতে ২৭.০৩.১৯৭১। ওরা এবার ডা. শাফী আর এহসানকে দিয়েই বাক্সগুলো ট্রাকে তুললো। আর আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকে মনে মনে বললাম, হারুন ভাই, এ আপনি কী করলেন? আমরা তৈরি হলাম। কিন্তু না, ওরা আমাদের লাইন করে দাঁড়িয়ে ব্রাশফায়ার করলো না। গুলির বাক্সগুলো ট্রাকে তোলা হলে আমাদের তিনজনকে বললো জিপে উঠতে। আমার ভাই এহসান অনুমতি চাইলো ওদের কাছে, “আমি একটু অজু করে আসি।” ওরা ওর মুখের তাকিয়ে কী ভেবে বললে, “যাও। আমি বোবা কান্নায় ইশারায় বললাম, তুই আর এখানে আসিস না ভাই, যা। কিন্তু না, এহসান ঠিক অজু করে লুঙ্গি বদলে প্যান্ট পরে এলো। বাচ্চাদের কান্না-চিৎকার পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম জিপের কাছে। উঠতে যাব, দুই মেজর পাঞ্জাবি ভাষায় নিজেরা কী যেন বললো; তারপর আমাকে বললো উর্দুতে, ‘মিসেস শফী তুমি এখন থাকো। তোমার বাচ্চারা বড় বেশি কাঁদছে। প্রয়োজন হয় হলে পরে নেব তোমাকে । কিন্তু খবরদার পালাবার চেষ্টা করবে না। তাহলে তোমার স্বামী আর ভাইকে তো পাবেই না,  বাড়িটাও ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেব।”

এই প্রথম আমি মেজরের দুই হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিলাম, ‘তোমরা তো আমার ভাই আর স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছ, এই ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আমি কোথায় যেতে পারি? কিন্তু তোমরা কথা দিয়ে যাও ওদের ফিরিয়ে দেবে? ওরা বলেছিল, “আমরা কথা দিচ্ছি ওরা ফিরে আসবে।’ পাঠান-পাঞ্জাবিরা নাকি মিথ্যা কথা বলে না! তবু  ঐ সময় ওদের ঐ কথা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও মনে হলো ডা. শফী যেন বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর মুখ সামান্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল প্রচ্ছন্ন আশায়। আমাকে শেষ কথা বলেছিলেন, “তুমি ভেবো না, ঘরে যাও বাচ্চাদের কাছে। দেখো, আমি আবার ঠিক ফিরে আসবো।” না, তিনি আর ফিরে আসেননি। এর পরের এক সুবিশাল বিস্তৃত অভিজ্ঞতার কাহিনী। দেশের মুক্তিযুদ্ধ আর আমার জীবনযুদ্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যে স্মৃতিসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে অবগাহন করে আমি আজও এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি—আমার একটি ও আমার স্বামী ডা. শফীসহ সব দেশপ্রেমিক শহীদ ফিরে আসবেন এই বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে।

সংকলনে : মেডিভয়েস

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) 

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ

 

 

 

 

Add
একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

চীনে রহস্যজনক ‘করোনা ভাইরাসে’ দ্বিতীয় মৃত্যু

একজন এফসিপিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ চিকিৎসকের অনুভুতি

পরীক্ষা প্রস্তুতির শেষের কয়েকদিন মেয়ের সাথে দেখা করতে পারিনি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স