০৬ এপ্রিল, ২০১৭ ১১:৩০ এএম

মানব উন্নয়ন সূচকে তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ

মানব উন্নয়ন সূচকে তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ

মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু ও শিক্ষা—এই তিনটি সূচককে মূল্যায়ন করে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বিশ্বের ১৮৮টি দেশকে নিয়ে নতুন যে তালিকা তৈরি করেছে, তাতে আগের বছরের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা প্রতিবেদনে ইউএনডিপি বলেছে, মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩৯তম। আগের বছর অবস্থান ছিল ১৪২তম। যদিও একই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ঘানা ও জাম্বিয়া ভাগ বসিয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকে সবার ওপরে আছে নরওয়ে। একই স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড। ইউরোপের দেশ জার্মানি আছে চার নম্বরে।

১৯৯০ সাল থেকে প্রতিবছর মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ইউএনডিপি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ মার্চ সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ অংশের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন কার্যালয়ের পরিচালক ড. সেলিম জাহান। বাংলাদেশ অংশটি তুলে ধরেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, এসডিজি বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারি-বেসরকারি খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা কমিশন ও ইউএনডিপি যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। এবারের মানব উন্নয়ন সূচকের মূল প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য মানব উন্নয়ন’।

সাধারণত মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু ও শিক্ষা—এই তিনটি খাতের ১৫টি উপখাতের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানব উন্নয়ন সূচক তৈরি করা হয়। যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেশি, গড় আয়ু বেশি এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত, সেসব দেশের নাম থাকে তালিকায় সবার ওপরে। আর যাদের স্কোর কম থাকে, তালিকায় ওই সব দেশের নামও থাকে নিচের দিকে। সূচকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—একটি দেশের শিক্ষা, মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু, আয় বৈষম্য, লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্যের হার, জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান, মানুষের নিরাপত্তা, মানবাধিকার। আর স্কোর হলো এক। এসব সূচকে যার অবস্থান যত ভালো, সে দেশ তত ওপরের দিকে থাকে। যেমন এক নম্বরে থাকা নরওয়ের একের মধ্যে স্কোর ০.৯৪৯। ১৩৯ নম্বরে থাকা বাংলাদেশের স্কোর ০.৫৭৯। আগের বছর ছিল ০.৫৭৫। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত ১৩১তম। ভুটান ১২৩তম। মালদ্বীপ ১০৫তম।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইউএনডিপি বলেছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে এখন নারীর অংশগ্রহণ ৩৪ শতাংশ। ২০২৬ সাল নাগাদ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে ৮২ শতাংশে উন্নীত হবে। যার ফলে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১.৮ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের এখন গড় আয়ু ৭২ বছর। একজন শিক্ষার্থীর স্কুলে কাটানোর গড় ১০ বছর এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) বছরে তিন হাজার ৩৪১ ডলার।

ইউএনডিপি বলেছে, মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৮ দেশের মধ্যে সবার নিচে আছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক। তার ওপরে আছে যথাক্রমে নাইজার ও চাদ।

মূল প্রবন্ধে সেলিম জাহান বলেন, ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় একজন মানুষও যাতে পিছিয়ে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। গত দেড় দশকে বিশ্বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বে শিশু মৃত্যুর হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবে এত পরিবর্তনের মধ্যেও বিশ্বে অসমতা বাড়ছে। বাংলাদেশেও অসমতা বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে উন্নয়নের সামনে। বিশাল যুবক শ্রেণিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। তাই এই তিনটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। সেলিম জাহান বলেন, বিশ্বে এখনো প্রতি তিনজনের একজন মানব উন্নয়ন সূচকে কাঙ্ক্ষিত মানের নিচে। ১৫০ কোটি মানুষ বহুমুখী দারিদ্র্যের শিকার। প্রতি মিনিটে ১১টি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারা যাচ্ছে। সেলিম জাহান বলেন, বায়ুদূষণে প্রতিবছর বিশ্বে ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তিন লাখ ৮০ হাজার মানুষ জীবন হারায় অসংক্রামক রোগে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনই গুরুত্বের সঙ্গে না দেখলে ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ কোটি মানুষ পুনরায় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

গত সাত বছরে সরকারের নেওয়া নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে আছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, চলার পথে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেতিবাচক প্রভাব অন্যতম বড় বাধা। অবশ্য দেশের উন্নয়নে কোনো বৈষম্য হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। মুস্তফা কামাল বলেন, উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম সবদিকে সমানভাবে উন্নয়ন হচ্ছে। কোনো বৈষম্য হচ্ছে না। আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ অনেক ভালো করেছে। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আর্থ-সামাজিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ ভালো করেছে। তবে এখানে শিক্ষার গুণগত মান এখনো অনেক পিছিয়ে। এখানে উন্নতি আনতে হলে দরকার বিনিয়োগ বাড়ানো।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত