ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


০৩ এপ্রিল, ২০১৭ ০৩:৩১ পিএম

দ্যা টিচার : ডাঃ গোলাম সামদানী

দ্যা টিচার : ডাঃ গোলাম সামদানী

-হ্যালো, ডাক্তার গুলযার? 
- জ্বি।

-ডা: গুলযার, আমি ডাঃ ..........(অস্পষ্ট, নেটওয়ার্ক বিভ্রাট অথবা অন্য কোন কারণে নামটা বোঝা যায়না)
- জ্বি..স্লামালিকুম ... আমি আসলে......(???)

ফোনের আগন্তুক এবার গর্জে উঠলেন

-আমি ডাঃ গোলাম সামদানী 

প্রায় সাত বছর পর প্রিয় গর্জন শুনে নড়ে উঠলাম। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালাম স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মত। 
-স্যার স্যার স্যার।

তিনবার স্যার বলে নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করলাম।

-তুই কি আমার নাম্বার ইরেইজ কইরা ফালাইছস?
-না স্যার, আসলে আমার মোবাইল হারায়ে গেসিলো স্যার। সীম সহ । সব নাম্বার চলে গেসে স্যার।

আমি অপরাধীর মত জবাবদিহি করি।

-আইচ্ছা অসুবিধা নাই আমার কাছেও তোর নাম্বার আছিলনা, ম্যানেজ করসি।

মনে মনে হেসে ফেলি। এই না হলে সামদানী স্যার?

-শোন তরে একটা কারণে ফোন দিসি ........

কথা এগিয়ে চলে। আমি স্মৃতিতে ডুবে যাই। কুমিল্লার দিনগুলি। আমাদের মেডিকেল কলেজ জীবনে সামদানী স্যার ছিলেন আমাদের কাছে হিরো। মেদহীন এ্যথলেটদের মত দীর্ঘ স্বাস্থ্য। স্ট্রেইট লম্বা চুল, মাঝ বরাবর সিথি দেখতে লাগতো ইন্ডিয়ান হিরোদের মত।

একজন স্বচ্ছ ভাল মানুষের প্রতিকৃতি। কুমিল্লা শহরের অন্যতম অভিজাত পরিবারের সন্তান। দিলখোলা ভরাট গলা, সুদর্শন স্মার্ট আর ব্যাপক সৌখিন এই মানুষটি চাইলেই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারতেন, কিন্তু বলতেন না। কথা বলতেন কুমিল্লার আঞ্চলিক ডাইলেক্টে ,একটু চড়া টোনে। আমার ধারণা ইচ্ছে করেই।

কোমরে বেল্ট পরতেন না। বেশিরভাগ সময় চামড়ার স্যান্ডেল পরতেন। তাতে তাকে আরো বেশি স্মার্ট লাগতো। আমাদের কাছে তখন ওটাই স্টাইল এবং স্মার্টনেস মনে হত।
স্যারের দেখাদেখি নিজেও দুই একদিন বেল্ট না পরে কলেজে গিয়েছি। আমাকে স্মার্ট লাগেনি, চোরের মত লেগেছে। (বান্ধবীদের অপিনিয়ন)

টেলিফোনের কথপোকথন এগিয়ে চলে।

-তুই এখন কই?
-স্যার লাইব্রেরীতে।
-কুন লাইব্রেরী?
-বিসিপিএসে স্যার। আপনি তো মনে হয় কাছকাছিই আছেন। স্যার আমি আসবো? আপনি বললে আমিই আসতেছি। 
- না না তর আসা লাগবনা। তুই পড়। তর অসুবিধা হইতেছেনা লাইব্রেরীতে কথা কইতে? 
- না স্যার। 
-তর অসুবিধা হইবো ক্যান? তর তো পড়ালেখায়........
আমি হেসে দিলাম। 
-গানবাজনা করস এখনো?

মানুষটা বদলায়নি। চিরকালীন শিক্ষক।

মনে পড়ে পুরনো দিনের কথা। বাংলাদেশ সরকার তাকে মূল্যায়ন করেনি। এত প্রতিভাবান আর মেধাবী মানুষটিকে অবমূল্যায়ন করেছে দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত করে। এক দুপুরের সিদ্ধান্তে কুমিল্লা মেডিকেলের সরকারি চাকরি ছেড়ে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে ঢুকলেন। ভাইস প্রিন্সিপ্যাল তারপর প্রিন্সিপ্যাল। বলতে গেলে কলেজটাকে একহাতে টেনে তুললেন। একই সময়ে আমিও এমবিবিএস শেষ করি। ইন্টারনি শেষ করে পরদিনই ঢুকে পড়লাম ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে।

আমি যেন এক নতুন দন্ডকারন্যে এসে পড়লাম। বন কেটে নতুন লোকালয় তৈরীর আনন্দ। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং অর্থবহ সময় পার হতে লাগল। আস্তে আস্তে আমি হয়ে উঠলাম স্যারের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

ছাত্র জীবনে আমি সামদানী স্যারের বকা খেয়েছি সবচেয়ে বেশি। আমরা তাকে ভয়ও পেতাম ভীষণ। পড়া না পারলে সবার সামনে বলতেন " তর এন্সার টা কি হইসে জানস? গু গু।" বলে হাত গোল করে দেখাতেন।

স্যার ছিলেন কুমিল্লা বোর্ড এর এককালের সেরা ছাত্র। স্কলারশিপ নিয়ে মস্কো থেকে ডাক্তারি পড়ে এসেছিলেন।

স্যারের শৌখিনতার গল্প তখন কুমিল্লা শহরে মিথ এর মত সবার মুখে মুখে চালু ছিল। কুমিল্লার ডাক্তারদের মধ্যে সেই সময়ের সবচেয়ে সুন্দর বাড়িটি ছিল তার। বাড়ির ছাদে সেই সময়ে প্রথম ডিশ এন্টেনাটি তিনি লাগিয়েছিলেন। এটা দেখে একবার গোয়েন্দা পুলিশ নাকি তার বাসায় এসেছিল। সদ্য রাশিয়া ফেরত ডাক্তার কেজিবি'র সাথে জড়িত কিনা খতিয়ে দেখতে।

স্যার ভীষণ টেকনোলজি ফ্রেন্ডলি। কুমিল্লায় যখন ল্যাপারস্কপি ছিল দুরের স্বপ্ন তখন তিনি নিজে মেশিন কিনে নিজে নিজেই শুরু করলেন ল্যাপারস্কপিক সার্জারি। সবাই যখন মোবাইল ফোনকেই বিরাট প্রযুক্তি ভেবে টিপেটুপে দেখছিলেন স্যার তখন ল্যাপ্টপে নতুন নতুন প্রোগ্রাম অপারেট করছেন।

সামদানি স্যার সার্জন হলেও কোন প্রাইভেট ক্লিনিকে কখনই যেতেন না। মনে আছে একবার ওয়ার্ডে ক্লাস নিচ্ছিলেন। এমন সময় কোন এক ক্লিনিকের ফোন আসে। ক্লিনিকের মালিক তাকে একটা রোগী দেখে যেতে অনুরোধ করে। স্যার স্বভাব সুলভ গর্জন করে ওঠেন "আমি ওইসব ফালতু জায়গায় যাইনা। আপনে কই পাইছেন আমার নাম্বার.....? " এভাবে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা সবার ছিলনা।

যাই হোক গ্রাজুয়েশন শেষ করে আমি তার সহকর্মী, তার কলেজের তরুন প্রভাষক। স্যার একধরনের অফিসিয়াল এটিচ্যুড ধরে রাখতে চান কিন্তু বেশিক্ষণ পারেন না। একটু এদিক ওদিক হলেই আগের মতই গালি দিয়ে ওঠেন। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেন...... "নাহ তরা এখন টিচার।"

আমাদের দিন ভালই চলতে থাকে। স্মৃতির ভান্ড ভারী হতে থাকে।

যেদিন কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকায় আসব, সেদিনের কথা কখনই ভুলবনা।

আমার ছাত্ররা আমাকে বিদায় জানাল। 
আমি গেলাম স্যারের রুমে। স্যার স্বভাব সুলভ গর্জন করে বললেন - তুই আমার দুইডা wing আছিলি। আমার ড্যানা দুইডা কাইট্টা দিয়া আশীষ তরে লইয়া গেলগা........

আমি নিরুত্তর।
আয় তর লগে কুলাকুলি করি
স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি হঠাত অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম স্যার কাঁদছেন।

-ডিগ্রী ফিগ্রী কিসু একটা কইরা আইসা পড়বি। তর লাইজ্ঞা আমার দরজা অলোয়েজ ওপেন। 
-স্যার দোয়া করবেন।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি স্যারের দিকে। কিছু মানুষ এরকম থাকে। বাইরে এরা একটা কঠোর আবরন তৈরী করে রাখে, ভেতরে আসলে ঘাপ্টি মেরে থেকে একটা কোমল মানুষ।

আমাদের ফোনালাপ শেষ হল ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ দিয়ে। স্যার কুমিল্লা ঘুরে যেতে বল্লেন। ইস্টার্ন মেডিকেল অনেক বড় হয়ে গেছে।

-স্যার, একবার আমাদের হাসপাতালটা ঘুরে যান। 
-না রে আজকে পারতাম না। আই এম অফুলি বিজি। তুই তো জানস আমার কত কাজ করা লাগে।

আমার কুমিল্লায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। ঢাকায় কেন আসলাম সে হিসেব মেলাতে পারিনা। সব আপেক্ষিক মনে হয়। ঢাকায় কত আলেম, কত কুতুব, কত কিংবদন্তী দেখলাম। এরকম খাঁটি মানুষ আর দেখলাম না।


পুনশ্চ : আমি আজ সারাদিন বেল্ট পড়িনি, সন্ধ্যায় সেন্ডেল পড়ে হসপিটালে গিয়েছিলাম। এটা স্যারের সম্মানে।

 

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না