ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


০৩ এপ্রিল, ২০১৭ ১১:০১ এএম

সময় গেলে সাধন হবে না

সময় গেলে সাধন হবে না

একদিন এক রোগীকে আনুষঙ্গিক কারনে ডায়াবেটিস সন্দেহ করে সকালে খালি পেটে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে রিপোর্টসহ কয়েকদিন পর সাক্ষাত করতে বলেছিলাম। দেখা গেল, এক সপ্তাহ পার হলেও তিনি পরীক্ষাটি করেন নি। পরে তার নিকটজনের কাছে থেকে জানতে পারলাম , ডায়াবেটিস ধরা পড়ার ভয়ে তিনি পরীক্ষাটি করান নি। কারন ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তার নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হবে। তিনি মনে করেন , পরিক্ষা না করে মনে মনে 'আমার ডায়াবেটিস নাই' ধরে নিয়ে দিন পার করলেই সেরে গেলেন।

কিন্তু এটা আসলে ভুল ধারনা এবং আত্মঘাতী। টাইপ টু ডায়াবেটিস সাধারনত ৩৫ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। আরো আগেও শুরু হতে পারে। শরীরে জীবানু সংক্রমণ হলে জ্বর বা পুঁজ বা ফোঁড়া হয়। হার্ট এটাক হলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বুকে ব্যাথা হয়। স্ট্রোক হলে সাধারনত শরীরের একপাশের হাত পা অবশ হয় বা গলা বসে যায় বা রোগী আংশিক বা সম্পূর্ণ জ্ঞান হারায়। এ কারনে এসব রোগ হলে রোগী সাথে সাথেই বুঝতে পারেন এবং হাসপাতালে চলে যান। কিন্তু টাইপ টু ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ এমন ধরনের রোগ , যা সাধারনত শুরু থেকে প্রথম ৫-৮ বছর কোন লক্ষন প্রকাশ করে না । শরীরের ভিতরে নীরব ঘাতকের মত তিলে তিলে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমুহ নষ্ট করে পরবর্তীতে হঠাত হার্ট এটাক, স্ট্রোক বা শরীর ফুলার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। তখন পরীক্ষা করলে দীর্ঘ দিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা/এবং উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে । চোখ পরীক্ষা করলে দেখা যায় রেটিনাতে ছোট বড় রক্তপাতসহ যাবতীয় সমস্যা হয়ে আছে, যার ফলে দৃষ্টি শক্তি কমে যায় এবং এক সময় ধীরে ধীরে বা হঠাত রোগী অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সময়মত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারনে অনেকের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কয়েক বছর ধরে মস্তিস্ক, কিডনি, হৃদপিণ্ড, চোখ সহ যাবতীয় অঙ্গকে তিলে তিলে নষ্ট করে। যৌনশক্তি কমিয়ে দেয় । পায়ের বোধ শক্তি নষ্ট করে পায়ের তলায় ক্ষত সৃষ্টি করে। অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়। এ ধরনের রোগীদের কেউ কেউ হঠাৎ শরীরের এক পাশে অবশ বা বুক ব্যাথা নিয়ে দ্রুত গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এভাবে স্ট্রোক বা হার্ট এটাক হলে রোগী এমনকি ৫-১০ মিনিটের মধ্যে মারা যেতে পারে। পরীক্ষা করলে দেখা যায়, কিডনী নষ্ট হয়ে কর্মক্ষমতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তখন রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কিডনী সংযোজন করে বেঁচে থাকতে হয় বাকি জীবন।

নিজ আগ্রহে সময় মত ডায়াবেটিস , প্রেশার পরীক্ষা না করানোর ফলে এবং যথাযথ চিকিৎসা না করানোর কারনে এভাবেই সব অঙ্গ ধ্বংস হওয়ার পর ঘটনাক্রমে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না। যাকে বলে, সময় গেলে সাধন হবে না। সবচাইতে দুঃখজনক পরিস্থিতির অবতারনা হয় তখন যখন দেখা যায় ৩-৪ টি নাবালেগ সন্তানের বাবা ৩৫- ৪০ বছর বয়সী কারো হঠাত ঘটনাক্রমে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে এবং দেখা যায় ততক্ষনে কিডনি-সহ প্রায় সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেছে।

তাই স্থুল চিন্তা বা মোটাবুদ্ধি না করে ২৭-২৮ বছর বয়স থেকে সবার উচিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সকালে খালি পেটে নিজের রক্তের গ্লুকোজ এবং প্রেশার পরীক্ষা করানো। অন্যথা এক সময় নিজের নাবালেগ সন্তানেরা এবং স্ত্রী একথা বলার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে, "সে নিজে মরলো, মাইরা গেল আমাগোও"। রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করাতে গড়পড়তা ১৫০-২০০ টাকা লাগে। বিভিন্ন ফার্মেসিতে স্ট্রিপ দিয়ে এ পরীক্ষা করাতে মাত্র ৫০ টাকা লাগে। তবে স্ট্রিপ এর মাধ্যমে করালে অনেক সময় ফলাফল ভুল হতে পারে।

তাই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ভালো কোন হাসপাতালে বা ক্লিনিকে করানোই ভালো। অনেকে মনে করেন পেশাবের পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস ধরতে হয়। এটা একটা ভুল ধারনা। ডায়াবেটিস ছাড়াও অন্য কারনে পেশাবের সাথে গ্লুকোজ যেতে পারে। অনেকে মনে করেন যাদের ডায়াবেটিস থাকে , তাদের তো বার বার অথবা বেশি পেশাব হয়। আমার যেহেতু এমন হয় না , তাই আমার ডায়াবেটিস নেই। বাস্তবতা হচ্ছে বার বার অথবা বেশি পেশাব না হয়েও একজনের ডায়াবেটিস থাকতে পারে। তাই ঝুকি নেবেন না।

যাদের পিতা মাতা , নানা নানী , দাদা দাদীর ডায়াবেটিস বা প্রেশার আছে বা ছিল , তাদের এগুলো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমার পরিবারের কারো ডায়াবেটিস বা প্রেশারের ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও গত ৭-৮ বছরে কয়েকবার নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছি।

অনেকে মনে করেন, মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়। এটাও একটা ভুল ধারনা। মিষ্টি খাওয়ার কারনে সচরাচর কারো ডায়াবেটিস হয় না। বরং যার ডায়াবেটিস আছে , তিনি চাইলেই যখন তখন ইচ্ছামত মিষ্টি খাওয়া অনুচিত। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, হায়াত শেষ হলে তো এমনিতেই মরবো, এত কিছু করার কি দরকার? কিন্তু রেলগাড়ি আসতেছে দেখেও যদি আপনি রেল লাইনের উপরে দাড়িয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন না নিশ্চয় ?

হাদিছে ৫ টি অবস্থার পূর্বে ৫ টি অবস্থার গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। তার মধ্যে ১ টি হচ্ছে , অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। তিরমিযী শরীফের একটি হাদীস -- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার দেখলেন একলোক তার উট না বেঁধে চলে যাচ্ছে, রাসুল (সাঃ) লোকটিকে জিজ্ঞাস করলেন “কেন তুমি উট না বেঁধেই চলে যাচ্ছ?” লোকটি বললঃ “আমি তো আল্লাহর উপর ভরসা করেছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেই লোকটিকে বললেনঃ “আগে উটটা বাঁধ; তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।” এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং ঠিকমত চিকিৎসা করাটাই হচ্ছে উটটাকে বাঁধা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত