ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


০৩ এপ্রিল, ২০১৭ ১০:৩১ এএম

জেল-জুলুম-মার খাওয়ার ভয়ে থাকা ডাক্তারকে প্রফেশনাল এথিক্স শিখিয়ে লাভ হবেনা

জেল-জুলুম-মার খাওয়ার ভয়ে থাকা ডাক্তারকে প্রফেশনাল এথিক্স শিখিয়ে লাভ হবেনা

একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ডিউটি করতে গিয়েছি। হাসপাতালটিতে শিশু রোগীদের জন্য আলাদা করে কোনো সেট আপ নাই। এজন্য সাধারণত বাচ্চা রোগী ভর্তি করা হয়না। তবে ক্রিটিক্যাল না, এই ধরনের বাচ্চাগুলোকে মাঝে মাঝে ভর্তি করানো হয়।

হাসপাতালটাতে খরচ কম, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো হয়না। এজন্য সাধারন মানুষজন নানা সমস্যার কথা জানা থাকার পরও হাসপাতালটিতে আসেন। রাজ্যের ভীড় লেগে থাকে সারাদিন।

ইভিনিং ডিউটিতে গিয়ে হ্যান্ডওভার নেয়ার সময় মর্ণিং ডাক্তার জানালেন, একটা রোগীর পার্টি একটু ঝামেলার আছে, কেয়ারফুলি হ্যান্ডেল করতে। আমি সদা হাস্যমুখী মানুষ। এই ধরণের পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে রোগীর পার্টির সাথে হাসিমুখে কথা বলার চেষ্টা করি। অধিকাংশ সময়ে এই পরিস্থিতিগুলো স্বাভাবিকভাবে মিটে যায়। তাই অতটা গুরুত্ব দিলামনা।  

হালকা বিশ্রাম নিয়ে ফলোয়াপ দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এসময় দেখি ওই রোগীর একজন এটেন্ডেন্ট এসে হাজির। উনি নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন, উনার ভাইয়ের ছেলে ভর্তি। সকাল থেকে জ্বর। ভাইয়ের ফ্যামিলি আমেরিকা থাকে। দেশে আসার পর এই ঝামেলা। উনার ভাই খুব ক্ষেপে যাচ্ছে, জ্বর কমতেছেনা কেনো? আমি যেনো কনসালটেন্টকে কল দিই।

কনসালটেন্টকে কল দিলাম। উনি বললেন, উনি অলরেডি দুইবার এসে বাচ্চাটাকে দেখেছেন এবং পেসেন্ট পার্টিকে কাউন্সেলিং করেছেন। উনার ধারণা, এটা ভাইরাসঘটিত জ্বর। ইনভেস্টিগেশন আসলে ডেঙ্গু না হলে এন্টিবায়োটিক শুরু করা যায়। উনি রাতে আবার আসবেন। ফলোয়াপ দিতে রোগীর কেবিনে গেলাম। কনসালটেন্টের কথাগুলো জানালাম। বাচ্চার বাবা মা ক্ষেপে অস্থির।

বাচ্চার ইউএসএ প্রবাসী পিতা আমার হাসিমুখ এবং কাউন্সেলিং উপেক্ষা করে জানালেন, উনারা ইউএসএতে বাচ্চার জ্বর হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওরা এক ঘন্টার ভিতর জ্বর কমিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা কি ছাল বাকল ডাক্তারি করছি যে, আটঘন্টার মধ্যেও বাচ্চার জ্বর কমে না?

ভদ্রলোক ডিভি পেয়ে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। এখন সম্ভবত ট্যাক্সি-টূক্সি চালান। উনার মুখে নিজের ডাক্তারিবিদ্যা সমন্ধে প্রশ্ন শুনে মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন। তারপরেও ভদ্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। পরে অন্য পেসেন্ট ফলোয়াপ দেয়ার সময়ও দেখি সিস্টারদের সাথে ইংরেজিতে ধমকা ধমকি করছে।

রাত্রে কনসাল্টেন্ট আসলেন। রোগীর লোক কনসাল্টেন্টের কাছে একই প্রশ্ন রাখলো। আমেরিকার ডাক্তাররা এক ঘন্টায় জ্বর কমিয়ে দেয়, উনারা পারেন না কেনো ?  কনসাল্টেন্ট বোঝানোর চেষ্টা করছেন। উনারা জ্বর কমানোর দাবীতে অটল। আমার ডিউটি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। নতুন ডাক্তারকে হ্যান্ড ওভার বুঝিয়ে চলে আসার সময় দেখি শেষ পর্যন্ত কনসাল্টেন্ট বাচ্চাটাকে রেফার করে দিয়েছেন।

এই হাসপাতালে এনআইসিউ নাই। বাচ্চা খারাপ হলে তখন বিপদে পড়বেন, এটা বুঝিয়ে রোগীকে কোনো একটা এনআইসিউ আছে এরকম হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এখন কোনো একটা এন আইসিউতে নিলে পেসেন্ট পার্টির মোটামুটি প্রতিদিন পনেরো বিশ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হবে। অথচ ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত বাচ্চাটি এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিতে হয়তো ভালো করা সম্ভব ছিলো। তারপরও এটাতো শুধু টাকার উপর দিয়ে গেলো।

এই অতিসচেতন এটেন্ডেন্টদের জন্য পেরিপেরির হাসপাতালে কোনো ধরণের বিপজ্জনক রোগী রাখা হয়না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শুধু রেফার হতে থাকে। জেল জুলুম আর মার খাওয়ার ভয়ে থাকা লোককে প্রফেশনাল এথিক্স শিখিয়ে খুব বেশি লাভ হবেনা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত