ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ৩১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


অটিজমঃ আমরা কতটুকু জানি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়েট্রিক নিউরোলজি বিভাগের আউটডোরে প্রতিদিন দেড়শোর মতো রোগী আসে। এর মধ্যে একটা অংশ তাদের বাচ্চাদের অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ নিয়ে আসেন। তাদের ব্যাকুল জিজ্ঞাসা তাদের বাচ্চা অটিজম আক্রান্ত কিনা। বাচ্চা অটিজম আক্রান্ত না হলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তারা। অটিজম সমন্ধে ব্যাপক প্রচারণার কারণে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। বাচ্চা একটু অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা বাচ্চার কোনো ডেভলপমেন্টাল সমস্যা দেখলেই তারা অটিজম নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও অটিজম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভুল ধারণা বা তাদের নিয়ে বিরূপ ধারণা এখনো কমেনি। এই প্রসঙ্গে অটিজম নিয়ে কিছু ধারণা শেয়ার করি।

#অটিজম কি ?
অটিজম কোনো রোগ নয়।কোনো শারীরিক, মানসিক বা বংশগত রোগের নাম অটিজম নয়। অটিজম একটা মনোবিকাশগত সমস্যা। এটাকে ইংরেজিতে একধরণের Neurodevelopmental disorder বলা হয়। গ্রামের দিকে এই ধরণের বাচ্চাদেরকে জীনে বা ভুতে ধরা অথবা বাতাস লাগা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং বিভিন্ন ঝাড়ঁফুকের ব্যবস্থা করা হয়। এটা পুরোপুরি ভুল।অটিজম বিষয়টিকে এখন ASD (autistic spectrum disorder) হিসেবে বলা হয়। স্পেক্ট্রাম শব্দটি দিয়ে এর ব্যাপকতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এর ব্যাপকতা স্বত্বেও বলা যায়, অটিজম একটা স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা।

#অটিজম আক্রান্ত শিশুর বৈশিষ্ট কি ?
অটিজম আক্রান্ত শিশু প্রতিবন্ধী নয়। তাই এদের দেখা, শোনা বা অন্য কোনো দিক দিয়ে শারীরিক সমস্যা থাকেনা।তবে অটিজমের পাশাপাশি আলাদা করে তার মধ্যে প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে।তবে এ শিশুদের আলাদা করে যে বৈশিষ্ট দেখা যায় তা নিম্নরুপঃ

১। সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় সমস্যাঃ শিশুর নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়না, এমনকি ফিরেও তাকায়না। বাবা মা অথবা পরিচিতজনদের চোখে চোখ রেখে তাকায়না। সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করেনা। কোনো আনন্দ প্রকাশ করতে বা আনন্দের বিষয় কারো সাথে শেয়ার করেনা। কারো কোলে উঠতে চায়না, কেউ তাকে আদর করুক তাও পছন্দ করেনা।

২। সামাজিক যোগাযোগের সমস্যাঃ এই শিশুগুলো সাধারণত কোনরকম সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতে পারেনা। কারো আথে ঠিকভাবে কথা বলতে পারেনা। থার্ড পার্সনে কথা বলে, যেমনঃ "আমি ঘুমাবো" না বলে "বাবু ঘুমাবে" এভাবে বলে। একই কথা বারবার রিপিট করে। দুই থেকে তিন বছরের বাচ্চা যেসব শব্দ তৈরি করতে পারে বা যেসব উপায়ে যোগাযোগ করে যেমন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ,তা অটিস্টিক শিশুরা পারেনা।

৩।আচরণগত সমস্যাঃ অটিস্টিক শিশুরা একই কাজ বারবার করতে থাকে। একই খেলা বারবার খেলতে থাকে। অনেকে তাই এদের শান্ত শিশু মনে করে ভুল করে। এদের পছন্দ অপছন্দ অনেক তীব্র হয়। যা পছন্দ করে, তার কোনো ব্যতিক্রম এদেরকে অনেক বেশি সেনসেটিভ করে তোলে। পরিচিত পরিবেশের কোনো ব্যতিক্রম এরা সহ্য করতে পারেনা। যেমনঃ গোসলের আগে কাপড় পরিবর্তন করা বা ঋতুর পরিবর্তনে অভ্যাস এবং কর্মকান্ডের পরিবর্তন এদের ক্ষুদ্ধ করে তোলে। এরা ঠিকভাবে এই অপছন্দের বিষয় প্রকাশও করতে পারেনা। এতে অক্ষমতাজনিত বেদনায় এরা কান্নায় ভেংগে পড়ে।

উপরের লক্ষনগুলোর সবগুলোই অটিস্টিক শিশুর থাকে অথবা এগুলোর একটা দুটো থাকলেই অটিস্টিক হয়ে যাবে বিষয়টা এরকম নয়।তবে সামগ্রিকভাবে এগুলোই অটিস্টিক শিশুর সাধারন বৈশিষ্ট।

#অটিজম কখন ধরা পরে?
অটিজম আক্রান্ত শিশুর লক্ষনগুলো সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই ধরা পড়ে। তবে খুব গভীরভাবে যেসব বাবা মা তাদের সন্তানদের খেয়াল রাখেন, তারা বারো থেকে আঠারো মাসের মধ্যেই সন্তানদের অস্বাভাবিকতা ধরে ফেলেন। এই সময়ের মধ্যে বাবা মা খেয়াল করেন, তাদের বাচ্চা অন্য বাচ্চার মতো সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা, শব্দ সাজিয়ে কথা বলতে পারছেনা, খেলাধুলায় আগ্রহ দেখাচ্ছেনা, অন্য বাচ্চার সাথে মিশছেনা। কিছু কিছু বাচ্চা এক বা দুই বছর পর্যন্ত অন্য বাচ্চার মতো স্বাভাবিকই থাকে।এরপর হঠাত করে তাদের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

#অটিজম নিয়ে ভুল ধারণাঃ
একসময় অটিজম আক্রান্ত বাচ্চার অভিবাবকরা তীব্র মানসিক অশান্তিতে ভুগতেন। পাড়া প্রতিবেশী তাদের বাচ্চাকে পাগল বা প্রতিবন্ধী বলে অভিহিত করতো এবং এটার জন্য বাচ্চার বাবা মাকে দায়ী করতো। অথচ এই ধারনাগুলোর কোনটাই ঠিক নয়। অটিজম মানে পাগলামি বা প্রতিবন্ধকতা নয়। এটা একটা মনোবিকাশজনিত সমস্যা। এটার জন্য মা বাবা কোনোভাবেই দায়ী নয়। মা বাবার সঙ্গ বা কেয়ার কম পাওয়ার কারণে অটিজম হয়- এই ধারণার কোনো সত্যতাও মেলেনি। নব্বইয়ের দশকে মনে করা হতো হাম রুবেলার টিকা দেয়ার কারণে অটিজম হয়। এটাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে অটিজমের কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। অটিজম সমন্ধে অনেকে ধারণা করেন যে, এটা বয়সের সাথে সাথে সেরে উঠবে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। উপযুক্ত থেরাপি এবং মনোযোগ না পেলে অটিস্টিক বাচ্চা কখনোই ভালো হবেনা। মৃদু মাত্রার অটিজম, যেমন অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা, সমর্থন ও শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। উচ্চমাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সেও অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনোই স্বনির্ভর দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্ভব নয়। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী -এই ধরণের একটা ধারণা অনেকেরই আছে। কেউ কেউ এটার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন বা হকিংসের উদাহারণ দেন। হুমায়ুন আহমদ তার 'কে কথা কয়" উপন্যাসে একটা অটিস্টিক বাচ্চাকে অনেক মেধাবী হিসেবে দেখানোয় বাংলাদেশিদের মাঝে এই ধারণা অনেক পোক্ত। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণার কোনো সত্যতা মেলেনা। আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই গণিত-প্রতিভা বা অন্য কোন ক্ষেত্রে জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল। কথা বলতে দেরি হলে অনেক মা বাবা সন্তান অটিস্টিক ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু অটিস্টিক বেবি ছাড়া অন্য অনেক বেবিও কথা শুরু করতে দেরি করতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া উচিৎ। 
 

#ডাক্তারের কাছে কখন যাবেন?
অটিজম সম্পুর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি এটা ডায়াগনোসিস করা যায় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যায়, তবে অনেকটাই প্রশমিত করা যায়। তাই সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া জরুরি। আপনার বাবুর মধ্যে যদি নিছের সমস্যাগুলো থাকে, তাহলে বাবুকে খুব তাড়াতাড়ি একজন চাইল্ড নিউরোলজিস্ট অথবা নিদেনপক্ষে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কছে নিয়ে যাবেনঃ

১. এক বছর বয়স পার হলেও শিশুর মুখে বুলি ফুটছে না।

২. বয়স দু’বছর অতিক্রম করলেও দুটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে বাক্য উচ্চারণ করতে পারছে না; যেমন- মা খাব, বই দাও।

৩. এক বছর বয়সের মধ্যে হাত নেড়ে টাটা বলতে বা কোনো কিছু আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করতে শিখছে না।

৪. নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।

৫. ১৬ মাস বয়স হলেও একটি মাত্র শব্দও উচ্চারণ করতে পারছে না।

৬. বয়স বাড়লেও মুখে ভাষা নেই।

৭. খেলনা দিয়ে কিভাবে খেলতে হয় তা জানে না বা বোঝে না।

৮. খুব যত্নের সাথে খেলনা বা নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখে।

৯. হাসে না, কাঁদে না, প্রয়োজনীয় জিনিস মুখ ফুটে চায় না, হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

১০. কোনো কিছু বুঝতে বা শিখতে শিশুর অসুবিধা।

১১. সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া, নিঃস্ব ও দুঃখী ভাব।

১২. চোখে চোখ রেখে তাকায় না।

১৩. একটি নির্দিষ্ট খেলনা দিয়েই বছরের পর বছর খেলতে থাকে।

১৪. মসৃণ বস্তু বারবার ঘষা।

১৫. অখাদ্য বস্তু খায়, যেমন- মাটি, কাগজ, চক, পেস্ট।

১৬. জগৎ সম্পর্কে উদাসীন, কাউকে আদর করে না, কারো আদর পেতে পছন্দও করে না।

১৭. দুরন্তপনা, ক্রমাগত লাফানো, আঙ্গুলে ভর দিয়ে হাঁটা।

১৮. ব্যথা পেলেও নির্লিপ্ত থাকে বা অধিক চেঁচামেচি করে।

১৯. অকারণে চিৎকার করে, স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে পারে না, কোনো একটি দুর্বোধ্য শব্দ বারবার উচ্চারণ করে।

২০. সহজে মিশতে পারে না; কোনো ব্যক্তি নয়, বস্তুর সাথে সম্পর্ক গড়তে পছন্দ করে।

২১. সাধারণ শিক্ষাপদ্ধতিতে লেখাপড়া শিখতে পারে না; কিন্তু অনেক সময় কোনো বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতা প্রদর্শন করে, যেমন- অঙ্কন, গান, নৃত্য।

২২. মনে হয় শিশু কানে ভালো শুনতে পায় না।

২৩. একই ভঙ্গিতে শরীর দোলানো।

২৪. বিপদের ভয় নেই আগুনে হাত দেয়, ধারালো বস্তু হাতে নেয়।
 

#অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসাঃ
মুলত অটিজমের কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও আবিষ্কৃত হয় নি। কিন্তু কিছুকিছু ওষুধ ব্যাবহারের ফলে শিশুর এনার্জির মাত্রা বাড়ানো, কোন কিছুর প্রতি মনযোগী করা, হতাশা রোধ করা অনেখখানি সম্ভব করা যায়। U.S. Food and Drug Administration বলেছে risperidone and aripripazole (antipsychotic drugs) এই ওষুধ অটিস্টিক শিশুদের যাদের অযাচিত ক্ষোভ, আক্রমণাত্মক ব্যাবহার সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। তবে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিভিন্ন থেরাপি বেশ কার্যকর ফল দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন আচরণ এবং যোগাযোগ শিক্ষার ট্রেইনিং, স্পিচ থেরাপি, ওকুপেশনাল থেরাপি।

# কোথায় চিকিৎসা পাবেনঃ
অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের IPNA (institute of paediatric neurology and autism centre)তে। এখানে ডায়াগনোসিস থেকে শুরু করে সব ধরনের চিকিৎসার পাশাপাশি একটা অটিজম স্কুলও রয়েছে। এছাড়া NINS (national institute of neuroscience), মেডিকেল কলেজগুলোর শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোতে অটিজমের চিকিৎসা এবং পরামর্শ দেয়া হয়।

শেষকথাঃ  আশার কথা যে, অটিজম আক্রান্ত শিশুদের পাশে এসে দাড়িয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে উপরের দিকের লোকজন। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের সচেতনতা আর সহযোগিতা ছাড়া এই শিশুগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসম্ভব। এতো প্রচারণার পরেও আমরা এখনো দেখি, অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের মা বাবা ছাড়া কেউই এদের সমস্যাগুলো বুঝতে চাননা, অবজ্ঞা আর অবহেলার চোখে তাকান। এই দৃষ্টিভংগির পরিবর্তন জরুরি। মনে রাখতে হবে, আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা মানবিক তা বোঝা যায়, এই শিশুগুলোর প্রতি আমাদের আচরণের মাধ্যমে।

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ
১। practical paediatric neurology, Veena Kalra
২। জাতীয় তথ্য ভান্ডার, তথ্য আপা প্রকল্প।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর