ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ৩১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী

অটিজম নিয়ে কাজ করা সহজ নয়

সমাজে আমরা একতাবদ্ধ হয়ে বাস করি কিন্তু সব বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনা, উপলব্ধি একরকম নয়। সমাজের কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে আমাদের সম্মিলিত ভাবনা ও প্রচেষ্টা জরুরি। সমাজে কিছু অসহায় চরিত্র আছে, যাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। অটিজম নিয়ে বলতে গিয়েই আমার এই উপলব্ধি। যিনি আমাদের এ ভাবনায় যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। সত্যি বলতে কী, অটিজম নিয়ে তার কর্মকাণ্ড আমাদেরকে মোহিত করেছে, আবেগাপ্লুত করেছে। এক সময় ভাবা হতো অটিস্টিক শিশুরা সমাজের বোঝা। পরিবারের কাছেও তারা ছিল অবহেলিত। অটিস্টিক শিশুদের সুষ্ঠু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ছিল না যথাযথ পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যবস্থাপনা। সাধারণত অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তির কথা-বার্তা বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈকল্য ও অসঙ্গতি দেখা যায়। দেরিতে কথা বলা, জবান বা বোল বা বাক প্রভৃতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। খেলাধুলায় অনীহা কিংবা নিজেকে গুটিয়ে রাখার চেষ্টা থাকে। আচরণিক ক্ষেত্রেও এদের মধ্যে অঙ্গের যেমন- হাত, আঙুল, মাথা প্রভৃতির অস্বাভাবিকত্ব দেখা যায়। এসব দিকে মনোযোগ দিলেই অনুধাবন সম্ভব অটিজমের একেকজন শিশু কতটা অসহায়। অভিভাবকগণ তাদের নিয়ে কতটা যাতনাময় দিন পার করছেন, তা আমাদের অনুভবে আনা দরকার। আমাদের অনেকেরই জানা নেই, দক্ষিণ এশীয় অটিজম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের উদ্যোগেই ২০১১ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অটিজম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অটিজম বিষয়ে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদানের জন্য পুতুলকে ২০১৪ সালের জন্য “এক্সিলেন্স এওয়ার্ড” পর্যন্ত দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

“বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস” উপলক্ষে ২০১৬তে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে “অটিজম মোকাবিলা:এসডিজি’র আলোকে বিশ্ব সমপ্রদায়ের কৌশল” শীর্ষক সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। জাতিসংঘে যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ, ভারত, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিশন এবং অটিজম স্পিকস।

জাতিসংঘে উচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনায় মহাসচিব বান কি-মুনের স্ত্রীসহ প্রায় সকল বক্তাই বাংলাদেশের কর্মকৌশলের প্রশংসা করেন। এ সময় সকলেই কৃতজ্ঞচিত্তে অটিজম বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম উচ্চারণ করেন। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। বাংলাদেশে অটিজম শিশুদের সার্বিক কল্যাণে যে সব কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে তারও আলোকপাত করেন কেউ কেউ। এ অনুষ্ঠানের প্যানেলিস্ট হিসেবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তার কর্ম-অভিজ্ঞতার আলোকে চমত্কার একটি উপস্থাপনায় বাংলাদেশ কীভাবে অটিজম সমস্যার আলোকে কাজ করছে তা সকলকে অবহিত করেন।

বাংলাদেশে অটিজমের ওপর এসব উদ্যোগের ফলে এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তাও প্রশংসনীয়। বাংলাদেশে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে ছয় স্তরে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যেখানে কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীদের থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসা-শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট এন্ড অটিজম ইন চিল্ড্রেন সেন্টার’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজী’ বিভাগ এবং অটিস্টিকদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, প্রশিক্ষক, চিকিত্সক, সেবাদানকারী ও মা-বাবার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অটিস্টিকদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রকর্ম প্রদর্শনীসহ তাদের সৃষ্টিশীল মনের বিকাশের লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও তাদের সুবিধামত অবকাঠামোগত পরিবেশ তৈরির বিষয়টি নিয়েও তিনি ভেবেছেন। এ জন্য বাড়ানো হয়েছে উপবৃত্তি সুবিধাভোগীর সংখ্যা। অন্যদিকে প্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিত্সা দিতে দেশের ৬৪ জেলায় ১০৩টি সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র (ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার) স্থাপন করা হয়।

আমরা আরো আশান্বিত হই, যখন দেখি অটিজম আক্রান্তদের কর্মসংস্থানেরও চিন্তাভাবনা চলছে। এদের অনেকে চাকরি করছেন এবং স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ অটিজমে আক্রান্তরা এখন আর অভিশপ্ত নয়, সমাজের বোঝা নয়। তারা ক্রমেই সচল হয়ে উঠছে। আর তা সম্ভব হচ্ছে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এর মতো সেবিরা আছেন বলেই। তাদের দেখাদেখি আরো অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন সেবায় নিজেকে জড়াচ্ছেন। অটিজমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোও সন্তান নিয়ে আগের মতো দিশাহারা হচ্ছেন না।

অটিজম নিয়ে জাতিসংঘের সর্বশেষ গবেষণা জরিপে বলা হয়, প্রতি ৬৮ জনের একজন অটিজম সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত অর্থাত্ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১% অটিজম জীবন নিয়ে বড় হচ্ছে। এর সিংহভাগই শিশু। অটিজম আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সুজান রীটের  ভাষ্য মতে, বিশ্বে ৭ কোটি মানুষ অটিজমে ভুগছে। এর সাথে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে আরো অনেকে। তবে খুশির সংবাদ হচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে অটিজম শিশুদের ব্যাপারে সামাজিক-সচেতনতাও জোরদার হচ্ছে।

অটিজমে আক্রান্তদের নিয়ে বলতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য আমার মনে আজও গেঁথে আছে। তিনি বলেন, “এদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আছে। সেটাই বিকশিত করে দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যেন মেধা বিকাশের মাধ্যমে তারাও সমাজকে কিছু উপহার দিতে পারে।” অটিজমে আক্রান্ত হিসেবে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লস ডারউইন, আইজ্যাক নিউটনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অটিস্টিক শিশুরা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তারাও মানুষ। তারাও আমাদের সমাজের অংশ, তাদের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। একটা দেশকে উন্নত করতে হলে সবাইকে নিয়ে করতে হবে, কাউকে অবহেলা করে না।”

যিনি মানুষ নিয়ে এতটা ভাবেন, তার কন্যাতো তেমনই হবেন। আমরা আমাদের নেত্রীদের কাছে এমনটাই আশা করি। উন্নয়নশীল দেশে অটিস্টিকদের জন্য কাজ করা খুব সহজ নয়। এর জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। এসব দেশে অটিজম মোকাবিলায় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সীমিত সেবা, সেবাদানকারীদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের অভাব এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তার একাগ্রতা আমাদের মুগ্ধ করেছে। মূলত বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি জাতির জনকের চিন্তা ও আদর্শ ধারণ করে মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল অটিজম শিশুর জীবন যাত্রায় প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে বিকশিত জীবনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার যে প্রত্যয় ও প্রচেষ্টা নিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তা প্রশংসার দাবিদার।

একটি রাষ্ট্র তখনই কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা বজায় থাকে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত। উন্নয়নের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দেশের সবার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আমাদের অটিজম শিশু এবং প্রতিবন্ধীরা সঠিক পরিবেশে বেড়ে উঠবে। এক সময় তারা দেশের উন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক : সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়,

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর