যোবায়ের মাহমুদ

যোবায়ের মাহমুদ

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। 


০১ এপ্রিল, ২০১৭ ০১:১১ পিএম

অ্যাজমা যেন আপনাকে না থামিয়ে দেয়

অ্যাজমা যেন আপনাকে না থামিয়ে দেয়

গ্যালারীতে রিদওয়ান স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। পিনপতন নিস্তব্ধ ক্লাস।
অ্যাজমা পড়াচ্ছেন। অসাধারণ বাচনভঙ্গিতে মোহিত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন অ্যাজমার ধরণ, উপসর্গ আর প্রতিকার। শেষপর্যায়ে চমৎকার একটা কথা বললেন, "Asthma is 'absolutely a physiological condition'. With proper medication and management, you can lead your life as you want!"
হেলথ লাইন.কম অবলম্বনে মেডি ভয়েস পাঠকদের জন্য থাকছে অ্যাজমা নিয়ে বেচে থাকা মানুষদের সাফল্যের ফুলঝুরি।

আপনি ধারণা করতে পারেন, বিখ্যাত কোন অ্যাথলেটের বুঝি অ্যাজমা ছিলো না! প্রতিযোগীতার সময় সব অ্যাথলেটদেরই প্রচুর অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আর তাই শ্বাস নেওয়ার সময় শাঁশাঁ আওয়াজ (হুইজ) এবং কাশির সমস্যা থাকলে অ্যাথলেটদের জন্য ট্রেনিং নিতে এবং ভালো পারফর্ম করতে সমস্যা হয়।

জেনে অবাক হবেন, কিছু বিশ্বখ্যাত অ্যাথলেটদের জন্য অ্যাজমা কখনোই প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াতে পারেনি। এসব ফুটবল খেলোয়ার, দৌড়বিদ এবং সাতারুরা তাদের সমস্যাকে জয় করেছেন এবং রেকর্ডের পর রেকর্ড করেছেন! চলুন তেমনি কয়েকজন বিখ্যাত অ্যাথলেটের প্রোফাইল দেখে আসি।

১. ডেভিড বেকহ্যাম
হার্টথ্রুব ফুটবলার 'ডেভিড বেকহ্যাম' যে অ্যাজমা আক্রান্ত সেটা কেউ কল্পনা-ই করে নি, যতদিন না ইনহেলার ব্যবহাররত অবস্থায় তার ছবি প্রকাশ পেল! বেকহ্যাম সেই সময়ে ২০০৯ সালে এলএ গ্যালাক্সির পক্ষে এমএলএস কাপে খেলছিলেন। 
'কখনো হয়তো আমার দিনটা ভালো যায়,কখনো খারাপ। আমি কখনো এটা গোপন করিনি, আসলে বেশ কয়েক বছর ধরেই এটা আছে। মনে হয় এটা আমার জন্য নেতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না, কারণ অ্যাজমা নিয়েই তো এতগুলো বছর খেলে গেলাম। আমি জানি 'পল স্কোলস' এর মত আরো অনেকেই আছেন যারা অ্যাজমার প্রতিবন্ধকতাকে এড়িয়ে গেছেন', বলছিলেন বেকহ্যাম।

অবসরের আগ পর্যন্ত ডেভিড বেকহ্যাম ছয়টি প্রিমিয়ার লীগ খেলেছে ,দুবার এমএলএস কাপ এবং একবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতেছেন।

২. জ্যাকি জয়নার কার্সি
একজন বাস্কেটবল প্লেয়ার ও দৌড়বিদ হিসেবে অ্যাজমা আছে এ খবর জানার পর অন্য সবার মতই জ্যাকি জয়নারও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। কাজেই এ খবর তিনি তার কোচদের কাছে গোপন করলেন। 
জ্যাকি এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ' আমি সবসময় বলেছি অ্যাজমা থাকলেও একজন তরূণ হিসেবে তুমি এসব সবকিছুতেই অংশ নিতে পারো, যেখানে আমি অংশ নিয়েছি। প্রথমে আমি যখন জানলাম আমার অ্যাজমা আছে, খবরটা হজম করতে আমার বেশ খানিকটা সময় লেগেছিলো। আমাকে ওষুধ খেতে করতে হবে, এই জিনিসটা মেনে নিতেও আমার সময় লেগেছে। ডাক্তার আমাকে ওষুধ খেতে বলছিলেন, কিন্তু আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার অ্যাজমা আছে। এরপর যখন আমাকে ব্যাপারটা মেনে নিতেই হয়, আমি নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া শুরু করি। আমি বুঝতে পারি, এই রোগটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ; তার জন্য ব্যাপারটা মেনে নিতে হবে'।

জ্যাকি কার্সি অলিম্পিকে ছয়টা পদক জিতেছেন, যার তিনটা স্বর্ণ, একটা সিলভার এবং দুটো ব্রোঞ্জ। সেই সাথে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড তাকে 'Greatest Female Athlete of the 20th Century' উপাধিতে ভূষিত করেছিলো।

৩. গ্রেগ লাউগেনিস

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ডাইভার গ্রেগকে অ্যাজমা পারেনি পাঁচ-পাঁচটি অলিম্পিক মেডেল জেতা থেকে বিরত রাখতে। সেই সাথে তিনি পাঁচবার পেয়েছেন বিশ্বসেরা পদক এবং ৪৭ বার দেশসেরা ডাইভার হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই অ্যালার্জি আর অ্যাজমাতে ভোগা গ্রেগকে বেশ কয়েকবার সিভিয়ার অ্যাজমা আক্রমনের কারণে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে। কিন্তু থেমে থাকেন নি গ্রেগ।

'অ্যাজমার আক্রমনের জন্য আমাকে হাসপাতালেও থাকতে হয়েছে কিন্তু ডাক্তার আমার মাকে অনুপ্রাণিত করে গিয়েছেন যেন আমি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা না থামাই', বলছিলেন গ্রেগ।

৪. পলা রেডক্লিফ
ইংরেজ ম্যারাথন দৌড়বিদ পলা খুব ছোট বয়সেই দৌড়াতে শুরু করেছিলেন, যেটা এক পর্যায়ে গিয়ে পরিণত হয় তার নেশায়! সেই বয়েসেই তার অ্যাজমা ধরা পড়ে। কিন্তু রোগটা কখনো তাকে তার দৌড় থেকে বিরত রাখতপ পারেনি। 'আমি মনে করিনি অ্যাজমা আমার ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যদি কিছু করেই থাকে অ্যাজমা বরং আমাকে সফল হতে আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে'!
পলা বলছিলেন, 'যদি আপনি আপনার অ্যাজমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন আর নিয়মিত ঔষধ নেন, কোন কিছুই নেই আপনাকে থামিয়ে রাখতে পারে'।

পলা চারটি অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন এবং ২০০৫ সালে দেশের হয়ে পলা মহিলা ম্যারাথনে জয় করেন স্বর্ণপদক! এবং এখন পর্যন্ত তিনি মহিলাদের ম্যারাথনে ২:১৫:২৫ সময়ের রেকর্ডধারী।

৫. জেরোমি বেটিস

ফুটবল খেলোয়ারেরা মাঠের বাইরেও কখনো কখনো কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন,যেমন পড়েছিলেন জেরোমি বেটিস। জেরোমির বয়স যখন ১৫,তখন তার অ্যাজমা ধরা পড়ে। তিনি ভেবেছিলেন আর বুঝি তার খেলা হলো না, তবু তার পিতামাতা তাকে সাহস দিয়ে গেছেন।

হাইস্কুলের পর বেটিস কলেজে ভর্তি হন এবং ফুটবল খেলতে থাকেন।১৯৯৩ সালে জাতীয় ফুটবল লীগে যোগ দেন এবং প্রথমে লস অ্যান্জেলস র‍্যামস, পরে পিটসবার্গ স্টিলার্সে খেলেন। ১৯৯৭ সালে স্টিলার্সের একটি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত খেলা অবস্থায় বেটিস আক্রান্ত হন অ্যাজমায়,যেটি তার জন্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ছিলো। এবং একই সাথে সেটি ছিলো জেরোমি বেটিসের জন্য জেগে ওঠার সময়। 'সেদিন থেকেই আমি শিখেছি কিভাবে আমার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়। আর ভালো সংবাদটা হচ্ছে আমি আমার প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।

৬. পিটার ভেন্ডারকে
বিখ্যাত সাতারু মাইকেল ফেসপসের সাথেই সাতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন পিটার। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে একসাথে তারা সোনাও জিতেছেন। অ্যাজমা আছে এমন পাঠকদের জন্য ব্যাপারটা অনুপ্রেরণার যে, পিটারও একজন অ্যাজমা আক্রান্ত মানুষ। দশ বছর বয়স থেকেই তার অ্যাজমার লক্ষণ দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে দেখা যায় তিনি আসলে EIB(Exercise Induced Bronchospasm) তে আক্রান্ত।

'অ্যাজমাকে থামানোর জন্য কার্যকর চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব, এটা জানার পর থেকেই আমি সচেতন ছিলাম এবং তার ফলশ্রুতিতেই আজকের এই আমি। ডাক্তার, আমার পিতামাতা এবং আমি নিজে সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছি যেন সাতারের ট্রেনিং আমি চালিয়ে যেতে পারি'। পিটার বলছিলেন, 
'কিছুদিন পর আমার জন্য একটা সুখকর খবর ছিলো, আমি জানলাম অসংখ্য অ্যাথলেট আছেন যারা অ্যাজমা নিয়েই তাদের সখের পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এই ব্যাপারটাই আমার জন্য ইন্সপায়ারিং ছিলো'!

৮. টম ডোলান

অ্যাজমার সাথে লড়াই করা এক জিনিস, আবার সেই সাথে যদি কারো জন্ম থেকেই শ্বাসনালী চিকন থাকে? কেমন হবে ব্যাপারটা?
ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছিল টম ডোলানের সাথে। সাধারণ মানুষ যতটা অক্সিজেন নেয়, তার মাত্র ২০% অক্সিজেন নিতে পারতেন ডোলান।

ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা একটা আত্মজৈবনিক প্রবন্ধে ডোলান তুলে এনেছিলেন এইসব কথাবার্তা। ডোলানের ভাষায়, 'আমার সমস্যাগুলোর জন্যই আমি আরো ভালো করেছি কিনা জানি না, কিন্তু এটা বলতে পারি, আমি অবশ্যই আলাদা একজন। একটা ব্যাপার আমি বুঝেছি,কতদূর গেলাম, তারচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে আমি কতদুর যেতে চেয়েছিলাম।আমার পুরোটা জীবন জুড়েই এই ব্যাপারটা মিশে আছে'।

টম ডোলান এখন পর্যন্ত দুটো অলিম্পিক গোল্ডমেডেল এবং বিশ্বরেকর্ডের মালিক!

অ্যাজমা যেন আপনাকে না থামিয়ে দেয় :

এক্সারসাইজ বা ব্যায়ামের সময় আপনার শরীর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী অক্সিজেন চায়। কাজেই আপনাকে দ্রুত শ্বাস নিতে হয় এবং হতে পারে আপনাকে হয়তো মুখ দিয়েই শ্বাস নিতে হচ্ছে। যখন আপনি মুখ দিয়ে শ্বাস নিচ্ছেন, বেশি করে শুষ্ক ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করছে ফুসফুসে। আপনার যদি অ্যাজমাপ্রবণতা থাকে, এই শুষ্ক ঠান্ডা বাতাস আপনার শ্বাসনালীকে সংকীর্ণ করে দিতে পারে। সুতরাং অক্সিজেন প্রবেশের রাস্তাটাই সংকীর্ণ হয়ে গেল! কারো কারো ক্ষেত্রে ধূলোবালি অথবা ফুলের রেণুও অ্যাজমার সংক্রমণ কে ত্বরান্বিত করতে পারে।

'কাশি, শ্বাস নিতে শা শা আওয়াজ এবং শ্বাসকষ্ট' হচ্ছে অ্যাজমার প্রধান লক্ষণ। AAFA এর মতে, সাধারণত একটু কষ্টকর কোন কাজ করলেই এটা শুরু হয় আর কাজটা শেষের ২০-৩০ মিনিটের মধ্যেই অ্যাজমার লক্ষণও থাকে না। কাজেই সমস্যা চিহ্নিত করাটাই মূল ব্যাপার, যাতে আপনি চিকিৎসাও দ্রুত শুরু করতে পারেন। ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নেওয়াটাই এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

অ্যাজমা থেকে বাচবেন কিভাবে?

১. অ্যালার্জেন বা ধূলোবালি এড়িয়ে চলুন।
২. ঠান্ডা শুষ্ক আবহাওয়ায় কাজ করার সময় মাস্ক পরে নিন যাতে শ্বাসনালীতে প্রবেশ করা বাতাস গরম হতে পারে।
৩. যতক্ষণ সম্ভব নাক দিয়ে শ্বাস নিন, একেবারে দরকার না পড়লে মুখ দিয়ে শ্বাস নেবেন না।
৪. ব্যায়াম শুরুর আগে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ওয়ার্ম আপ করে নেবেন।
৫. হঠাৎ করে ব্যায়াম ছেড়ে না দিয়ে আস্তে আস্তে ছাড়বেন।
৬. বেশি করে পানি খাবেন

ব্যায়াম বা অন্য কোন কষ্টকর কাজ অ্যাজমাকে ত্বরান্বিত করে, আবার এই ব্যায়ামই পারে আপনার ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে আপনাকে সুস্থ রাখতে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে আপনিও কর্মক্ষম থাকতে পারেন একদম যেমনটা আপনি চান!

 

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে