রবিবার ১৭, ডিসেম্বর ২০১৭ - ২, পৌষ, ১৪২৪ - হিজরী

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন

অবসটেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকলজির জীবন্ত কিংবদন্তীর সাক্ষাৎকার

[অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন।

বাংলাদেশের অবসটেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকলজির জীবন্ত কিংবদন্তী। এক্লাম্পশিয়া, প্রি-এক্লাম্পশিয়া চিকিৎসায় তিনি অগ্রপথিক। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ম্যাগনেশিয়াম সালফেট, মিসোপ্রোস্টল তিনিই প্রথম বাংলাদেশে পরিচিত করান। জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয় ও নিরাময়েও তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আইকন। ভায়া টেস্ট, কল্পোস্কপি তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে শুরু। ছিলেন অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট।

পিজি হাসপাতাল থেকে অবসর গ্রহনের পর তিনি দীর্ঘদিন এনাম মেডিকেল কলেজের গাইনী ও অবস বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি মিরপুরে নিজ বাড়ীতে বর্ণালী নার্সিং হোম নামক সেবাদান কেন্দ্রে অগণিত প্রসূতি মায়েদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেছেন। গবেষণা, স্বাস্থ্যশিক্ষার উন্নয়ন থেকে শুরু করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এখনো নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন এই চিকিৎসক। পেয়েছেন ফিগো অ্যাওয়ার্ড।

মেডিভয়েস-এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর জীবনের নানান দিক। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মেডিভয়েসের বার্তা সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন। ক্যামেরায় ছিলেন আহসান হাবীব ]

 

মেডিভয়েস: আস্সালামু আলাইকুম। ম্যাডাম, কেমন আছেন?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: ওয়ালাইকুম আস্সালাম। ভালো আছি।

 

মেডিভয়েস: আপনার জন্ম, পারিবারিক পরিচয় ও বেড়ে ওঠার কথা জানতে চাচ্ছি।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: ১৯৪৫ সালে ১২ই মার্চ আমার জন্ম।আমাদের গ্রামের নাম বড়কয়ের,গাজিপুর। আমার জন্ম সেখানে। কিন্তু আমি বড় হয়েছি পুরান ঢাকার বংশালে।

বাবার নাম মাওলানা কবির উদ্দিন রহমানি। লেখাপড়া করেছেন দিল্লির একটি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। তিনি বংশাল বড় মসজিদের ইমাম ছিলেন। আমরা দশ ভাই-বোন। আমিই একমাত্র ডাক্তার, বাকিরা সব অন্যান্য পেশায়। ইঞ্জিনিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। ব্যবসায়ী।

আমাদের জীবনটা আসলে বৈচিত্রময়। যেমন আমাদের জন্ম হয়েছে গ্রামে, বড় হয়েছি ঢাকা শহরে। আমি মাওলানা সাহেবের মেয়ে। তখন এভাবে মেয়েদের চলাচল ও শিক্ষার সুযোগ কমই ছিল।

যাই হোক আমি বংশাল স্কুল থেকে পাশ করে ইডেন কলেজে ভর্তি হলাম। তারপর ১৯৬২ সালে ভর্তি হলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ১৯৬৮ সালে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে বের হই। পাশ করার পর এ.কে.এম. সামসুদ্দিনের সাথে আমার বিবাহ হয়।

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, আপনার চাকরি জীবনের কথা জানতে চাচ্ছি।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: চাকরি জীবনের শুরুতে আমি বগুড়া মোহম্মদ আলী হাসপাতালে ছিলাম ১৭ বছর। প্রথমে মেডিকেল অফিসার, তারপর কনসালটেন্ট। এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে সহকরী অধ্যাপক হিসেবে। তারপর আমি চলে আসলাম ঢাকাতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে সিলেট মেডিকেল কলেজে। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সবশেষ পিজি এবং পিজি নাম পরিবর্তন করে হলো বিএসএমএমইউ। তারপর আমি অবসর গ্রহণ করি।

 

মেডিভয়েস: মুক্তিযুদ্ধকালীন আপনার স্মৃতি বা ভূমিকা- আমাদের বলবেন কি?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বগুড়া মহিলা পরিষদের সেক্রেটারি ছিলাম। সংগঠনটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রীদের নিয়ে। আমি সারাদিন তাদেরকে নিয়ে কাজ করতাম। যুদ্ধশেষে কেউ ফিরে এলো, কেউ মারা গেলো। ঐ সময় বগুড়ার চিত্র ছিল অনেক খারাপ। তখন অনেক মেয়ে গর্ভবতী হয়ে যায়, ধর্ষিতা হয়ে যায় এগুলো তো সবার জানা।

বগুড়ার কালীতলাতে একটা বিল্ডিং ভাড়া করে আমরা মেয়েদেরকে সেখানে রাখতাম। আমি একমাত্র মহিলা মেডিকেল অফিসার। তাদের যারা গর্ভবতী তাদেরকে প্রসব করানো আবার বাচ্চাগুলোকে বিভিন্ন চ্যারিটি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে বাইরের দেশে পাঠানো ছিল আমাদের কাজ। তাদের কে এখন কোন দেশে আছে আমি জানি না। কিন্তু বাচ্চাগুলোর মায়েরা আমার সাথে রয়ে গেল। তাদের জন্য আমি একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করি। পরবর্তীতে সরকার সেই কেন্দ্রের জন্য আমাকে জমি প্রদান করে। সেই কেন্দ্রের স্মৃতি আমি এখনও ভুলতে পারি না। সেখানে অনেক বীরঙ্গনাদেরকে তাদের বাবা, ভাইয়েরা রেখে যেত। কোনদিন আর নিতে আসত না। ওরা শুধু কাঁদত। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো।  

 

মেডিভয়েস: এদেশের নারীদের এক্লাম্পশিয়া এবং প্রি-এক্লাম্পশিয়া রোগ প্রতিরোধে আপনার বিশেষ ভূমিকার কথা শুনেছি।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমার চিকিৎসা জীবনের বেশিরভাগ সময়ে দেখেছি, গর্ভবতীরা অধিকাংশ মারা যেত এক্লাম্পশিয়াতে আর পোস্ট পার্টাম ব্লিডিংয়ে, যেটা প্রসবের পরে হয়। এটার চিকিৎসা তখন বাংলাদেশে ছিল না। ১৯৯৪ এ যখন আমি ঢাকা মেডিকেলে আসি তখন আমার দেখা হয় ‘ফাদার ইমপ্রুভমেন্ট অব মেডিকেল কলেজ’ নামক ইউকের একটা গ্রুপের সাথে। তারা আমাকে জানালো যে পৃথিবীর ১৭টি জায়গায় এক্লাম্পশিয়ার উপর কাজ হচ্ছে।

এর মধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও আছে। আমি উৎসাহিত হলাম, ভারতে যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশে কেন হবে না। তখন আমি কাজ শুরু করলাম। দেখলাম যে, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট নামে একটা ড্রাগ আছে। এতে রোগী অনেকটা সেরে যায়। এই ড্রাগটা আনার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করি কিন্তু ফান্ডিং সহজে পাওয়া যায় না।

ম্যাকপাই ট্রায়াল নামে একটা ট্রায়াল হয়েছিল সারা বিশ্বের ১৭২ টি দেশ নিয়ে। সেখানে আমরা এনরোল্ড হলাম।

বহু কষ্টে ড্রাগটা যোগাড় করে ট্রায়াল বেসিসে ঢাকা মেডিকেলের অনেক রোগীকে দিলাম। তারা ভালো হয়ে গেল। এটা আমাকে এতটা আনন্দ দিয়েছিল যা বলে বুঝানো যাবে না। তখন আমরা বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগটা দেশে আনতে চেষ্টা করলাম।

তারপর বাংলাদেশে ড্রাগটা আনা হলো। এখন বাংলাদেশে এ ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচার হচ্ছে। নাউ উই ক্যান ম্যানেজ দ্যা এক্লাম্পসিয়া।

একটা বিষয় অবশ্যই রিমার্কেবল। তখন আমি পিজি-তে চেয়ারম্যান। শ্রীলংকায় একটা ইন্টারন্যাশন্যাল সেমিনারে গিয়ে দেখি এই ডিসিপ্লিনের এশিয়ান কান্ট্রি পারসন সবাই উপস্থিত।

সেখানে মিসোপ্রোস্টল ড্রাগ সম্পর্কে জানতে পারলাম। যেটা দিলে গর্ভপরবর্তী ব্লিডিং বন্ধ হয়। কিন্তু অনুমোদন না থাকায় ড্রাগটা আমরা দেশে আনতে পারছিলাম না। অবশেষে মিসোপ্রোস্টল ব্যবহারের অনুমোদন নিলাম। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাদের কাছে মিসোপ্রোস্টল পাঠালো। আজ সেই মিসোপ্রোস্টলও আমাদের দেশে ম্যানুফ্যাকচার হচ্ছে।

এক সময় বাংলাদেশে প্রতি আধ ঘন্টায় একজন করে মা গর্ভকালীন এবং গর্ভপরবর্তী জটিলতায় মারা যেতেন। আজ সে সংখ্যা অনেক অনেক কম। এজন্য ডাক্তার, ওজিএসবি, বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্যরা কাজ করেছি একসাথে। এটা আমাদের সবার সাফল্য।

 

মেডিভয়েস: সারভাইকাল (জরায়ু মুখ) ক্যান্সার চিকিৎসায় আপনি অনেক কাজ করছেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমি যখন স্টুডেন্ট বা মাত্র পাশ করেছি। ফিরোজা ম্যাডাম ছিলেন গাইনির প্রফেসর। উনি গাইনি ক্যান্সার রুমে ঢুকতেন না। রুমটাতে উৎকট গন্ধ থাকতো। ক্যান্সারের জায়গা থেকে দুর্গন্ধটা আসতো। ম্যাডাম আমাকে বলতেন, লতিফা তুমি রোগীগুলো দেখেছ? আমি বলতাম, জ্বি ম্যাডাম দেখেছি। তারপর উনি অন্য রোগীর পাশে চলে যেতেন। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ম্যাডাম আপনি রোগীগুলো দেখেন না কেন? জবাবে ম্যাডাম বললেন, সারভাইকাল ক্যান্সারের রোগীগুলো দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে। আমি তো রোগীগুলোকে সুস্থ করতে পারব না।  

জরায়ু মুখের ক্যান্সার বাংলাদেশের নারী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই রোগ শরীরে বাসা বাঁধার পর ১০ বছর সময় লাগে ফুল ডেভেলপড হতে। এই সময়ের মধ্যে যদি রোগটি ধরা যায় তাহলে তা নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে রোগটা সনাক্ত করব কিভাবে। তখন আমরা জানতে পারলাম, ভায়া নামে একটা সাধারণ পরীক্ষা আছে। জরায়ুর মুখে ৫% সিলকা যদি লাগিয়ে দিতে পারেন যে জায়গাটা রোগাক্রান্ত সেটা সাদা হয়ে যায় আর যে জায়গাটা ভালো ওটার রঙ স্বাভাবিক থাকে।

আমি দেখলাম এর চেয়ে কম খরচের পরীক্ষা আর নেই। আমি সরকারের কাছে চাইলাম এবং সরকার আমাকে দিলো। তখন আমি পিজি হাসপাতালে এই ভায়া করতে শুরু করলাম।

আমরা ১০ লক্ষের বেশি মহিলাকে ভায়া টেস্ট করি। এরপর আস্তে আস্তে কলপোস্কপি, বায়োপসি ইত্যাদি আমরা করছিলাম। এই রোগের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির জন্য, ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে যেতে হয়েছে। আমার সাথে প্যাথলজি, রেডিওথেরাপি-অনকোলজির প্রফেসররাও ছিলেন।

এই তো কয়েকদিন আগেও রাজশাহীতে গেলাম। মানববন্ধন করলাম। শ্লোগান দিলাম। মানুষজনকে লিফলেট দিলাম।

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, বাংলাদেশে নতুন করে স্বাস্হ্য আইন হতে যাচ্ছে। নিশ্চয় শুনেছেন, এ নিয়ে চিকিৎসকদের মাঝে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। আইনটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছিলাম।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমি এটা নিয়ে খুব একটা বলতে পারব না। কারণ, আইনটি রিসেন্টলি হতে যাচ্ছে। আইন করে কিছু হয় না। ওটা মানুষের মন থেকে আসতে হয়। আমি মনে করি, সরকার হয়ত বুঝে শুনেই করেছে। কিন্তু আমি এর মধ্যে সম্পৃক্ত না। খুব একটা বলতে পারব না আপনাকে।

 

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, আপনি জেনে অবাক হবেন যে, চিকিৎসায় অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসায় ফৌজাদারি আইনে জেল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে আইনটিতে। আপনার কি মনে হয় না- এর ফলে চিকিৎসকরা স্বাভাবিকভাবে চিকিৎসা দিতে পারবেন না? এ প্রেক্ষিতে যদি কিছু বলতেন।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমার মনে হয়, সরকারের উচিত আইনটা টোটালি অমিট করা। কারণ আপনি যদি আমাকে সম্মান না করেন, আমি কিন্তু আপনাকে সম্মান করব না। এটিই নিয়ম। আমরা আমাদের পেশাকে আমাদের কাজকে সম্মান করি। তাই কখন সূর্য ওঠে, কখন চাদঁ ওঠে তার খবর আমরা রাখি না। আমরা সেবা দিব, এটাই আমাদের মানসিকতা। তার বিনিময়ে আমরা হয়ত কয়েকটি পয়সা নিই আপনাদের কাছ থেকে।

কিন্তু এ সার্ভিস যদি আমরা না দেই, তাহলে কী হবে এখানে? এই কথাটা মনে করলেই বিভীষিকাময় একটা চিত্র, অন্ধকার একটা পৃথিবী দেখবেন। আমি মনে করি, এটা মারাত্মক ভুল। আমাদের একটা রোগীর অবস্থা যখন খারাপ হতে থাকে, তখন আমরা প্রত্যেকেই মনে মনে বলি, আল্লাহ তুমি রোগীটার প্রাণ ফিরে দাও। যখন রোগী মারা যায়, তখন রোগীর স্বজনদের মতো আমাদের মনও খারাপ হয়। আমরা হয়ত আমাদের আবেগটা প্রকাশ করি না। এর পরেও যদি সরকার মনে করে যে, আমরা ইচ্ছে করে ভুল করি বা ইচ্ছে করে চিকিৎসায় অবহেলা করি- তাহলে তো হয় না। ইট ইজ সিম্পলি ইমপসিবল। আমার মতে, সরকারের উচিত এ আইনটি এখনই চেঞ্জ করা। এখনই।

 

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, আপনার চিকিৎসা জীবনের স্মরনীয় কোন ঘটনা যা আপনাকে খুবই আনন্দ দেয়...

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমি যেখানেই যাই না কেন, সেখানেই আমি আমার স্টুডেন্ট পাই। এটা আমাকে ভীষণভাবে আনন্দ দেয়। যেমন আমি কিছুদিন আগে ইউ.কে-তে গিয়েছিলাম। রাত দেড়টার সময় দুইজন গাইনোকলজিস্ট তাদের ফ্যামিলি মেম্বার নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসলো। বললো- ম্যাডাম,  আমরা আপনার ছাত্র। ওরা আমার সাথে তাদের ফ্যামিলি মেম্বারদের পরিচয় করিয়ে দিল। এরকম প্রায়ই হয়। এটা খুবই ভালো লাগে।

আমি এবং আমার স্বামী একবার হজ্ব করতে গেলাম। সেখানেও আমার এক ছাত্রের সাথে দেখা হয়ে গেল। সে সৌদি আরবে গাইনোকলজি প্র্যাকটিস করছে। আমাদেরকে সে হোটেলে থাকতে দিবে না। জোর করেই তার বাসায় নিয়ে গেল। হজ্বের পুরোটা সময় আমরা ওর বাসায় থেকেছি। এই আনন্দটা আর কোন আনন্দের সাথে মিলে না।

আমি এইবার বই মেলায় গিয়েছিলাম আমার দুই নাতনি এবং ছেলের বউসহ। হঠাৎ একজন লোক এসে সালাম দিয়ে বলল, ম্যাডাম আপনি একটু দাঁড়ান এখানে। কিছুক্ষণ পর সেই ভদ্রলোক কয়েকজন ইয়াং ছেলে মেয়েকে আমার সামনে নিয়ে আসলো। বললো,  ম্যাডাম, এদের সবার ডেলিভারি আপনার হাতে হয়েছে। ওরা সবাই আমার সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুললো। এটা যে কী আনন্দ দেয় বলে বুঝাতে পারব না!

 

মেডিভয়েস: চিকিৎসক জীবনের কোন ঘটনা বা স্মৃতি যা আপনাকে কষ্ট দেয়?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: ডাক্তারদের জীবনে প্রতিদিনই কোন না কোন কষ্টদায়ক স্মৃতি থাকে। কারণ আমাদেরকে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে হয়। কখনো আমরা জিতি কখনো হারি। কিছুদিন আগেও গাইনী ডিপার্টমেন্ট ছিল হাসপাতালের সবচেয়ে অবহেলিত ডিপার্টমেন্ট। মায়েরা হাসপাতালে ডেলিভারির জন্য আসতে চাইত না। যখন আসতো, তখন আমাদের কিছু করার থাকতো না।

আগে বাল্য বিবাহের প্রচলন ছিল। অল্প বয়সে মেয়েদের বাচ্চা হয়ে যেত। আমার লেবার রুমে কমপক্ষে ৩-৪জন রোগী থাকত, যাদের বয়স ১৫-১৬ বছর। আবার বয়স্ক মহিলাদের ক্যান্সার হতো কিন্তু ক্যান্সারের চিকিৎসা তখন ছিল না।

এই চিত্রগুলো আমাকে খুব ব্যথিত করতো।

 

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, তরুণ শিক্ষার্থী যারা গাইনীতে ক্যারিয়ার করতে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: গাইনী একটা কঠিন সাবজেক্ট। যে এখানে আসবে, তাকে ডিভোটেড হয়েই আসতে হবে। এখানে আসলে দিন-রাতের হিসাব ভুলে যেতে হবে। কারণ, কার ডেলিভারি পেইন কখন হবে তা কেউ জানে না। সকল অবস্থায় কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। আমি মনে করি, যারা আসবে তারা বুঝেই আসবে।

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আপনি যেসব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন সেগুলো নিয়ে যদি বলতেন?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: অ্যাওয়ার্ড তো অনেক পেয়েছি। দেশ থেকে পেয়েছি। আন্তর্জাতিক ভাবেও পেয়েছি। কয়েকদিন আগে আমাকে ফিগো অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ। গাইনোকলজিস্টদের জন্য এটা হাইয়েস্ট প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড।

 

মেডিভয়েস: বর্তমানে কি কি নিয়ে ব্যস্ততা আপনার ? 

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন: আমি অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এখনও এর সাথেই আছি। আমাদের যতগুলো কমিটি আছে, সব কমিটিই আমি মোটামুটি দেখি। বিশেষভাবে এক্লাম্পশিয়া ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং ক্যান্সার কমিটি এই দুটোতে আমি আছি। গাইনোকলজিতে সাব-স্পেশালিটি তৈরির দায়িত্বেও আছি। যেমন ইনফার্টিলিটি, গাইনোকলজিক্যাল অনকোলজি এই সাব স্পেশালিটিগুলো এখন চালু হয়েছে।

আমি BCPS এর কাউন্সিলর ছিলাম। এখন BMA  তে আছি। FIGO, SAVE THE CHILDREN ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করছি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে যাই। সায়েন্টেফিক জার্নালে লেখালেখি করি। গাইনোকলোজির উপরে কিছু টেক্সট বই লিখেছি। তবে এখন লেখালেখিতে আগের মতো সময় দিতে পারি না।

 

মেডিভয়েস: ম্যাডাম, আপনাদের সময় যে মাতৃমৃত্যু হার ছিল তা এখন অনেক কমে এসেছে। এই বিষয়টা আপনাকে কেমন আনন্দ দেয় ?

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন : এটা খুবই আনন্দ দেয়। মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোলের একটি গোল, ছিল এই মাতৃমৃত্যু হার কমানো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এজন্য আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। দেশের মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। অবসটেট্রিশিয়ানদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই তা সম্ভব হয়েছে।

 

মেডিভয়েস : ম্যাডাম, মেডিভয়েসকে অনেক সময় ‍দিয়েছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

অধ্যাপক ডা. লতিফা সামসুদ্দিন : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। মেডিভয়েসের জন্য শুভকামনা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত


আরো সংবাদ


শহীদ ডা. মিলন দিবস আজ

শহীদ ডা. মিলন দিবস আজ

২৭ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:১৭


তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৪১







জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর