ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

চিকিৎসক ও সরকারী চাকুরিজীবী। 


৩০ মার্চ, ২০১৭ ০১:০৫ পিএম
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক

শহীদ ডা. ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম মো. ফারুক

শহীদ ডা. ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম মো. ফারুক
  • নাম : ডা. ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম মো. ফারুক
  • ডাকনাম ; ফারুক
  • পিতার নাম : আবু তালেব ভূঁইয়া
  • পিতার পেশা : ব্যাংকার
  • মাতার নাম : বেগম নূরুন নেসা
  • ভাইবোনের সংখ্যা : তিন ভাই, তিন বোন। নিজক্ৰম-দ্বিতীয়
  • ধৰ্ম : ইসলাম
  • স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম-বসন্তপুর, ওয়ার্ড ১, ডাকঘর/ উপজেলা- বাজিতপুর, জেলা- কিশোরগঞ্জ
  • নিহত হওয়ার সময় ঠিকানা : কুমিল্লা সেনানিবাস, কুমিল্লা জন্ম : বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ

 

শিক্ষাগত যোগ্যতা:

  • বিএসসি, গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ
  • এমবিবিএস, ১৯৬৯, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী শখ ; সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা ও খেলাধুলা চাকরির বর্ণনা : আর্মি মেডিকেল কোর
  • ক্যাপ্টেন : সিএমএইচ কুমিল্লা, ১৯৭১-এর ৩০ মার্চ পর্যন্ত নিহত হওয়ার তারিখ : ৩০ মার্চ ১৯৭১

 

মরদেহ

  • প্রাপ্তি স্থান : কুমিল্লা সেনানিবাস
  • প্রাপ্তি তারিখ : জানুয়ারি, ১৯৭২
  • সন্ধানদানকারী পরিচয় : মেজর (তৎকালীন) হায়দার
  • কবরস্থান ; কুমিল্লা সেনানিবাস ইস্পাহানী পাবলিক স্কুলের সামনে।
  • স্মৃতিফলক/স্মৃতিসৌধ : কুমিল্লা সেনানিবাসস্থ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স ইউনিট, ঢাকা সেনানিবাসের স্টাফ রোড তোরণ এবং সরকারি মেডিকেল কলেজের স্মৃতিফলকে নামাঙ্কিত
  • মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে পুরস্কার : পাননি।
  • স্ত্রীর নাম : মনোয়ারা বেগম (মরহুমা)
  • বিয়ে ; ৩১ অক্টোবর, ১৯৬৮

 

সন্তান-সন্ততি : দুই পুত্র

  • একেএম তারেক : এমকম (হিসাব বিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • একেএম আরিফ : বিএসএস, ব্রিগেড মেজর, গুইমারা সেনানিবাস, খাগড়াছড়ি

 

আ মা র স্বামী

শহীদ ডা. ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম মো. ফারুক

মনোয়ারা ফারুক

কথা ও কাব্য বা সাহিত্য প্রায়ই বলা হয় স্মৃতি রোমস্থন করে; সুখকর অনুভূতিতে মানবমন হয় আপ্লুত। হ্যাঁ, কথাটা সত্যি—যদি সে স্মৃতির অন্তরালে ঘটনাপরম্পরা আবহমানকালে জাগতিক নিয়মে সাবলীল সাবলীল ক্ৰমবিকাশে সহজে সবকিছু সংগঠিত হয়। আর এর কোনারূপ ব্যত্যয় ঘটলেই সে স্মৃতি হয় বিদগ্ধ, যার ক্রমবর্ধমান দহনে স্মৃতিকেন্দ্রিক সবাই তিলে তিলে নিঃশেষিত হয় সারাজীবন। আর এই অভাগাদের মধ্যে আমিও একজন ।

আমার স্মৃতিসত্তায় আমার প্রিয়তম সেই ব্যক্তিটিকে আমি হারিয়েছি দেশমাতৃকার স্বাধীনতার প্রয়োজনে ১৯৭১ সালে। ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমার বিয়ে দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের বিশিষ্ট ব্যাংক অফিসার মরহুম আবু তালেব ভূঁইয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র এ কে এম ফারুকের সাথে। আমার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী দাদা মরহুম হাজী মোজাফ্ফর আহমেদ সেদিন যে জাকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন করেছিলেন, তাও আজ আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সদা এক অসহনীয় বেদনাদায়ক প্রতিবিম্ব তৈরি করছে অহরহ। বিয়ের দিনটি ছিল ৩১ অক্টোবর, ১৯৬৮। আমি তখন ভৈরবের হাজী আছমত কলেজে দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্রী । ছাত্রী হিসেবেও ভালো ছিলাম। কিন্তু দাদার ওপরে কথা বলবেন কে? আমার বিয়ে হয়ে গেল।

আমার প্রিয় ব্যক্তিটি তখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের এমবিবিএসের শেষ পর্যায়ের ছাত্র। ডাক্তারি পাস করলো। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান হেলথ সার্ভিসে চাকরি পেয়ে ফরিদপুর বদলি হলো। গেল না। এর আগে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে বিএসসি পড়ার সময়ই সে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কমিশন পেয়েও স্নেহময়ী মায়ের আবদার ও আপত্তির মুখে যোগদান করেনি। মেডিকেল কোরে (এ.এম.সি.); নিয়োগ পাওয়ার সাথে সাথে যোগদান করলো। কী আনন্দ আমার! আমার স্বামী লে. এ কে এম ফারুক এ.এম.সি! কিন্তু এ সুখানুভূতি ছিল নিতান্তই সাময়িক ।

তখন সে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে ৪০তম ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সে কর্মরত। চারদিকে মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সে এক অভাবনীয় আতঙ্ক । ইতোমধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালিদের বিশ্বাস করছে না। আর বাঙালিরা তো মনে মনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছিল ইতোমধ্যে ২৭ মার্চ বাঙালি সেনাদের হাতে কর্নেল শাহানুর নিহত হলেন চট্টগ্রামের কুমিরায়। তারই প্রতিক্রিয় ও প্রতিশোধ হিসেবে কুমিল্লা সেনানিবাসেও বাঙালি-পাঞ্জাবি সম্পর্কের অবনতি ঘটল অতি দ্রুতগতিতে।

৩০ মার্চ ১৯৭১ সাল । ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের আমাদের বাসায় আমি, আমার স্বামী ও আমাদের ৬ মাসের ছেলে এ কে এম তারেক । শখ করে ও তার নাম রেখেছিল সোহাগ | সকালের নাশতা টেবিলে দেয়া হঠাৎ একটি জলপাই রঙের জিপ এসে অন্যান্য বাঙালি অফিসারদের সাথে ওকেও তুলে নিয়ে গেল। দুপুরের দিকে আমার সাথে তার শেষ কথা হয় টেলিফোনে। বললো, ‘ভালো থেকে, আমরা ভালো।” মনে হলো তাদের বাকস্বাধীনতা ততক্ষণে শেষ। কিন্তু অসহায়ত্বের নির্মম কশাঘাতে আমরাও সেদিন বাকরুদ্ধ, নির্বিকার আমাদের বাসায় চারদিকে পাঞ্জাবি সেনারা প্রতিনিয়ত নজর রাখছে। কোথাও বেরুবার উপায় নেই। পরে জানলাম, ঐ দিনই বিকেল চারটার পরে কর্নেল ডা. জাহাঙ্গীর, মেজর খালেকসহ আরো অনেক বাঙালি অফিসারদের সাথে আমার প্রিয়তম স্বামী ডা. ক্যাপ্টেন এ কে এম ফারুককেও ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় এবং নিকটস্থ এক গণকবরে মাটি চাপা দেয়া হয়।

এই হত্যাকাণ্ডের পাঁচদিন পরে আমাকে, আমার ছয় মাসের শিশুপুত্র সোহাগকে অন্যান্য বাঙালি অফিসারদের পরিবার-পরিজনদের সাথে ময়নামতির ইস্পাহানী স্কুলে আটক রাখা হয়। পরবর্তীকালে মুক্তিসংগ্রামের তীব্ৰতা ক্ৰমান্বয়ে বেড়ে গেল। জুলাই মাসে অন্যান্য বাঙালি পরিবারের সাথে আমাকেও ছেড়ে দেয়া হয়। চারদিকে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞের বেহায়াপনায় তখন লিপ্ত। তাই কোথায় যাই, কেমন করে ঢাকা পৌছবো এসব ভাবতে ভাবতে দেখি আমার ছােট বোনের স্বামী এসেছেন। তাই শত দুঃখেও কিছুটা স্বস্তির স্বাদ পেলাম। এরপরে কুমিল্লায় নিরাপদ না ভেবে, তাৎক্ষণিকভাবে হাকিমকে নিয়ে বাসে করে ব্ৰাক্ষ্মণবাড়িয়া এবং ট্রেনে চড়ে ভৈরবে বাবার বাড়ি চলে এলাম। ট্রেনে অসংখ্য পাঞ্জাবি সেনা সবাইকে তল্লাশি চালিয়ে অনেককেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং হায়েনার দল হয়তো সবাইকেই হত্যা করেছিল। আমাকে প্রশ্ন করাতে আমার সাথের হাকিম তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে পাঞ্জাবি হায়েনাদের বুঝিয়ে বললো যে, “আমি ওদের মেডিকেল কোরের ডাক্তারের স্ত্রী, ডাক্তার ফিল্ডে গেছেন, তাই ফ্যামিলি বাড়ি পাঠাচ্ছেন।” এভাবে ছলনার আশ্রয় নিয়ে কোনোরকমে সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম।

সবচেয়ে দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে, ওর মৃত্যু সংবাদ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না। তাই প্রতিনিয়ত অপেক্ষায় থেকেছি। ওর প্রত্যাশিত প্রত্যাগমনের আকাজক্ষায়... ৷ ও আর আসেনি। এলো ওর প্রতিভূ। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই আমার আর এক পুত্র সন্তানের জন্ম হলো। তাই কনিষ্ঠ পুত্রের নিরানন্দ জন্মদিনেও সবাই ছিল ওদের বাবার নিরুদ্দেশের শোকে মুহ্যমান। আজ আমার দুই ছেলেই পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কিন্তু যা ওরা পায়নি, তা আর পাওয়ার নয়। সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মে ওরা ওদের মুখে আব্ব’ ডাক আর উচ্চারণ করতে পারেনি। আমার স্বামীর মৃত্যুর সময় বড় ছেলে এ কে এম তারেক সোহাগের বয়স ছয় মাস, আর ছোট ছেলে এ কে এম আরিফ পরাগের জন্ম ওর মৃত্যুর পরে। সোহাগ আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম (হিসাব বিজ্ঞান), বিকম (সম্মান) পড়াশোনা করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত আছে। ছোট ছেলে একেএম আরিফ পরাগ কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে স্টার মার্কসসহ বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করে ২৯তম বিএমএ লং কোর্সে কমিশন পেয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত আছে।

আর আমি? আমার চাচা ভৈরব কলেজের প্রবীণতম অধ্যাপক আতাউর রহমান ও আমার অনুজ অধ্যাপক আহমেদ আলীর অনুপ্রেরণা ও পীড়াপীড়িতে ভৈরব কলেজ থেকেই পরবর্তীকালে কৃতিত্বের সাথেই স্নাতক ডিগ্রি লাভ করি। তারপর ভৈরবের বিখ্যাত এমপি গার্লস হাইস্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পরে ১৯৮০ সালে আমি

পেট্রোবাংলার অঙ্গ সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে সরাসরি অফিসার হিসেবে যোগদান করি। যথারীতি দু’বার পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে আমি সংস্থাপন বিভাগের ব্যবস্থাপক। ঢাকা সেনানিবাসে নিজস্ব বাড়িও হয়েছে এবং স্থায়ীভাবে আমি বাস করছি সেখানে ।

কিন্তু আমার স্মৃতিসত্তায় দেদীপ্যমান আগুন আজও আমায় তিলে তিলে দগ্ধ করছে প্রতিনিয়ত।

সংকলনে : মেডিভয়েস।

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) 

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ।

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
বাংলাদেশের গাইনী এবং অবসের জীবন্ত কিংবদন্তী

স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী