২৯ মার্চ, ২০১৭ ১০:৫৯ এএম

মানসিক রোগীর অভিভাবকদের করণীয়

মানসিক রোগীর অভিভাবকদের করণীয়

মানসিক রোগ শারীরিক রোগের মতোই বহুলাংশে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে আছে। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক তারতম্য বিদ্যমান। সব পার্থক্য এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যতটুকু আলোচনায় উঠে এসেছে তার মধ্যে রোগীর অভিভাবকদের এসব মানসিক রোগ ও রোগীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার প্রেক্ষিতে তাদের আচরণ অন্যতম। অধিকাংশ মানসিক রোগই দীর্ঘদিন চিকিৎসার দাবি রাখে। তাই এসব রোগীর ক্ষেত্রে বাবা মা ভাইবোনসহ অন্য আত্মীয়স্বজনদের করণীয় সম্পর্কে মনোবার্তায় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মডার্ন সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব।

মনোবার্তা: মানসিক রোগীর চিকিৎসায় বাবা, মা, ভাইবোনসহ আত্বীয়স্বজনদের প্রথমেই কি করা উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : মানসিক রোগ শারীরিক রোগের মতোই একটা রোগ। যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে এবং চিকিৎসায় এ রোগ যে ভালো হয় তা আজ বাংলাদেশেই প্রমাণিত সত্য। সুতরাং জিন-ভূতের আছর কিংবা বাতাস লাগা বলে অহেতুক এসব রোগীকে অযত্ন-অবহেলা বা রোগকে উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। রোগী কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের পাপ কিংবা কু-কর্মের ফসলও এ রোগ নয়। অতএব, এসব কুসংস্কার পরিহার করে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসাটাই রোগীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

মনোবার্তা : মানসিক রোগীরা যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কি করণীয়? তাদের প্রতি কি ধরনের আচরণ করা উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : বিষণ্ন, সন্দেহপ্রবণ বা মাদকসেবী রোগীদের অনেকেরই আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আসল সতর্কতা হচ্ছে চিকিৎসা করানো, নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো। যাদের আত্মহত্যার প্রবণতা আছে তাদের নিত্যদিনের ওষুধ বাসায় কাউকে খাইয়ে দিতে হবে, আত্মহত্যা করার পরিবেশ যাতে না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

মনোবার্তা : মানসিক রোগীরা নিয়মিত ওষুধও খেতে চান না এক্ষেত্রে কি করণীয়?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : মানসিক রোগীদের মধ্যে যারা নিজেদের রোগীই মনে করেন না তারা ওষুধও খেতে চান না। তাদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে। অনেক রোগী একটু সুস্থতার পথে পা দিলেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়, অভিভাবকরাও আর খোঁজ রাখেন না। এটা মারাত্মক ভুল। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

মনোবার্তা : মানসিক রোগীদের প্রতি কি ধরনের আচরণ করা উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : মানসিক রোগীকে বাসায় গালমন্দ করা যাবে না। সে পাগল হয়ে গেছে বিবেচনা করে তার ব্যাপারে অসচেতনতা, যে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য তার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা তার রোগকে পক্ষান্তরে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই বিবেচনা করতে হবে এবং তার সঙ্গে তার যোগ্যতা অনুযায়ী শলাপরামর্শ করতে হবে। সে যেন কখনোই নিজেকে অবহেলিত মনে না করে।

মনোবার্তা : ছাত্র কিংবা চাকরি অবস্থায় মানসিক রোগ হলে তাদের ছাত্রত্ব এবং চাকরি হারায়। এক্ষেত্রে পরিবারের স্বজনদের কি করা উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : এটি ঠিক যে মানসিক রোগ হলে মানসিক রোগীদের পেশাগত দক্ষতা লোপ পায়। ছাত্রছাত্রীরা স্কুল কলেজের ক্লাসে ভালো করে না, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। চাকরিজীবী তার অফিসে সুনাম হারায়, অফিসে যেতে চায় না। একসময় চাকরি হারিয়ে বেকার হয় এবং ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রত্ব হারিয়ে বাসায় বসে থাকে। এসব রোগীর চিকিৎসা করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা তখন তাদের পূর্ব পেশায় ফেরত যেতে চায়। এসময় অবশ্যই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দিতে হবে। এ কাজটা পারিবারিকভাবেই করতে হবে। এজন্য সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব রোগীর পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা এখনও আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। তবে আশা করি অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয়ভাবে রোগীদের জন্য যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

মনোবার্তা : মানসিক রোগীরা তো নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না। এ ব্যাপারে করণীয় কি?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : মানসিক রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসালয়ে অথবা চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যেতে হবে। তার উপর ছেড়ে দিলে সে একাকী এ কাজটা করতে পারবে না। বাবা মা অন্য সন্তানদের সহযোগিতা পাবার মানসে রোগীর ব্যাপারে, রোগের ব্যাপারে তাদের জানাবে। এটা পরিবারের একটা সমস্যা এবং সমাধানে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এমনটাই ফুটিয়ে তুলতে হবে সকলের সামনে, যাতে সকলেই চিকিৎসা ও যত নেয়ার ক্ষেত্রে সমভাবে সম্পৃক্ত হয়।

মনোবার্তা : অনেক মানসিক রোগীকেই পরিবারের সদস্যরা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। এটা কি ঠিক?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : রোগীকে শিকল বা রশি দিয়ে বাঁধা যাবে না। এটা খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে রোগীর উপর। এছাড়া এদেরকে যেমন বলা যাবে না ‘পাগল’। রোগী মারমুখী কিংবা হিংস্র হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র থেকে ইনজেকশন পুশ করলেই থেমে যাবে। জরুরি সেবা পাওয়া যাবে এমন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর টেলিফোন নম্বর কাছে রাখতে হবে।

মনোবার্তা : চিকিৎসকের কাছে রোগীর রোগ সম্পর্কে কি কি জেনে নেয়া উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : আপনার রোগীর রোগটা কি, এ বিষয়ে বিস্তারিত চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। সুস্থ হতে কত দিন লাগবে, আপনার করণীয় কি এসব প্রশ্ন চিকিৎসককে করলে চিকিৎসক আপনাকে রোগ ও রোগীর বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। এটাকে সাইকো এডুকেশন বলে।

মনোবার্তা : মাদকসেবীদের ক্ষেত্রে কি করা উচিত?

ডা. মেজর (অব) আব্দুল ওহাব : মাদকসেবী রোগীরা বাসায় খুবই ঝামেলা করে। হঠাৎ করেই পরিবারের ভদ্র ও মেধাবী ছেলেটি মাদক নেবার কারণে উচ্ছৃঙ্খল, মেজাজী ও বেয়াড়া আচরণ শুরু করে। শেষতক অবাধ্য সন্তানদের সব উপসর্গ তার মধ্যে দেখা দেয়। সে ক্রমশ অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। এহেন অবস্থায় পরিবারের অভিভাবকদের স্থির থাকা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে মাদকসেবীদের বৈরী আচরণের মোকাবিলা করতে হবে। রাগ করে ঘর থেকে বের করে দেয়া, উত্তেজিত হয়ে মারধর করা কিংবা পুলিশে দেয়া কোনো সমাধান নয়। সমাধানের পথ বন্ধুর। ধৈর্য ধরে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে রোগীর চিকিৎসা করাতে হবে এটাই সমাধান। সর্বোপরি এ কথা বলা চলে, আপনার পরিবারের সদস্যটির রোগমুক্তি, আপনার এ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা, বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নেয়া ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের মাধ্যমে সেবা করার উপর নির্ভর করে।

– ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার
অধ্যাপক, মুন্নু মেডিকেল কলেজ।

সৌজন্যেঃ মনোবার্তা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স