যোবায়ের মাহমুদ

যোবায়ের মাহমুদ

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। 


২৭ মার্চ, ২০১৭ ১০:০৮ পিএম

একটা সাইকেলের গল্প

একটা সাইকেলের গল্প

.....বাবা বাসায় আসা মানেই ঝড়ের আগমন। ঝড় হওয়ার আগ-মুহূর্তে আশপাশের পরিবেশ কেমন অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা হয়ে যায় না? তার কিছুক্ষণ পরেই তো শুরু হয় আসল ঘটনা। ধুলো উড়তে থাকে পাক দিয়ে, বাতাস বাড়ে ক্রমাগত, আকাশ কালো করে জমা মেঘেরা ভেঙে পড়ে প্রকৃতির বুকে। অনেকটা ওইরকম ব্যাপার স্যাপার। বাবা বাসায় ঢোকার খবর পেলে আমরাও ঠান্ডা হয়ে যাই, কিছুক্ষণ আগে ঘটা পৃথিবীর সবচাইতে মজার ঘটনাটা ভুলে যাই, তার বদলে কানের মধ্যে বাজতে থাকে সাত নম্বর বিপদ সংকেত, অনবরত।

আমি নাবিল। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। আমার তুলনায় বড় দুইবোন আর ভাই পড়াশোনায় ভালো; তাই বলে বাবার সাথে যে তাদের সম্পর্ক খুব ভালো, তেমনটা নয়। বরং বাবার সাথে সবার সম্পর্কই একরকম। এই পরিবারে বাবার আচরণে কোন রিএ্যাকশন দেখানোর অধিকার একজনেরই আছে, মা। আমরা সেখানে গোণার মধ্যে নেই।

বাবা একজন নামকরা ডাক্তার। পেডিয়াট্রিক্সের। বাবাই একদিন বলেছিল, 'পেইস' মানে বাচ্চা, 'আয়্যাট্রস' মানে ডাক্তার। সবমিলিয়ে বাচ্চাদের ডাক্তার। তার চেম্বারের সামনে সাইনবোর্ডে কি সব ডিগ্রীর নাম লেখা মনেই থাকে না। কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে ভাবি, বাবার কাছে যেসব রোগীরা আসে, কখনো বুঝতে পারে না বাবা একজন রাগী মানুষ? টাকা খরচ করে যেসব মানুষ আসবে, তারা তো আর আমাদের মত না। তাদের সাথে রাগ করলে তো তারা দ্বিতীয়বার আসার কথা না! আমি বারবার বাবার জন্য দুআ করি, আল্লাহ যেন তার কাছে আসা রোগীর সংখ্যা কমিয়ে দেন। খেয়াল করে দেখেছি, বেশি রোগী দেখলে বাড়িতে এসে বাবার মেজাজ একটু বেশি খারাপ থাকে। তারচে রোগীর সংখ্যা একটু কমলেই হয়! আমি শুনেছি আল্লাহ নাকি সব দুআই কবুল করেন, কোনটা আগে, কোনটা পরে। মাঝেমধ্যে চিন্তা হয় আল্লাহ মনে হয় আমার দুআটা পরে কবুল করবেন বলে ঠিক করে ফেলেছেন! আমি তবু বিপুল উৎসাহে দুআ চালিয়ে যাচ্ছি। কখন কবুল হয়ে যায়,বলা তো যায় না!

বাড়িতে আমার প্রিয় জিনিসগুলোর একটা লিস্ট আছে। তার মধ্যে এক নম্বরে মা, দুই নম্বরে আমার সাইকেল, আর তিন নম্বরে কিছু নেই।
আবার একই রকম করে আমার অপছন্দের জিনিসগুলোরও একটা লিস্ট আছে। সেই অপছন্দগুলোর এক নম্বরে, পড়াশুনা।
যখনই সময় পাই সাইকেলটা নিয়ে হারিয়ে যাই আমি। সাইকেলে প্যাডেল চাপার আগে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা মনে মনে দুবার বলি,
'আজ আমাদের ছুটি ও ভাই
আজ আমাদের ছুটি
মেঘের কোলে রোদ হেসেছে
বাদল গেছে টুটি '

বাদল কিভাবে টুটে গেছে সেইটা আমার জন্য কোন ব্যাপার না। এইটা আমার সাইকেল শুরুর মন্ত্র। অবশ্য দাদু একবার বলেছিলো, যে কোন কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে। এই কথাটা প্রায়ই আমার মনে থাকে না । খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে আরেকটা দুআ আছে 'বিসমিল্লাহি আওওলাহু ওয়া আখিরহু', সাইকেলে উঠে যদি বিসমিল্লাহ পড়তে ভুলে যাই, এই দুআটা পড়লে হবে? জানি না। এই কথাটা দাদুকে জিজ্ঞেস করা হয় নি। 

শেষমেষ আমার কোনটাই পড়া হয় না। তবে ঘোরাঘুরি হয়, প্রচুর হয়।

স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে দেয়ে গোসল করে মা বিছানা ঠিক করে দেয়, ঘুমাতে হবে। দুপুরের এই ঘুমটা নাকি শরীরের জন্য ভালো। রাতে পড়াশোনা ভালো হয়।কিন্তু আমার তো ভালো লাগে না। কাথাটা মুড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকি। পাশে মা ঘুমায়। মায়ের ঘুমটা একটু গাঢ় হলেই আমি চুপিসারে উঠে সাইকেলটা নিয়ে পগার পার হয়ে যাই।

এদিক সেদিক ঘুরে খেলার মাঠে যাই। সবাই আসে, মন দিয়ে খেলা করি। মা প্রায়ই বলে,'পড়াশুনায় তোর তো মোটেও মন নেই, মন কোথায় থাকে'?

মা যদি আসলেই জানতো, খেলাধূলায় কত মনোযোগ আমার! 

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরি। মা রাগী রাগী গলায় বলেন, 'হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস। সারাদিন টইটই করে ঘুরলে পড়াশুনা করবি কখন'? 

আমি জানি এইসব কথা মা কোনকিছু ভেবে বলেন না। খুব সম্ভবত এসব কথা বলা একটা অভ্যাস। দেখা যাবে, কোন একদিন আমি খুব ভালো ছেলে হয়ে গেছি। সময়মত পড়ছি, লিখছি; আর মা তখন কষ্ট পাচ্ছেন এইসব কথা না বলতে পেরে। এইসব কথায় তাই আমি 'গা' করি না। আস্তে আস্তে কলপাড়ে যাই। হাত- মুখ ধুয়ে ওজু করি। নামাজ পড়ে নিই।

এইসব আমার প্রতিদিনের রুটিন। এরমাঝে সপ্তাহে এক-দুইবার বাবার ঝাড়ি খাই। বাবার সবচেয়ে ফেভারিট ডায়লগ হচ্ছে, লাথি মেরে ব্যাঙ করে দেব! লাথি আমি খাইনি তা না, কিন্তু এই ডায়লগ দেবার আগ মুহূর্তে বাবার চোখেমুখে যে আত্মবিশ্বাস দেখি, মনে হয় সকাল বিকেল এভাবেই তিনি দুতিনটে লোক ব্যাঙ করে দিয়ে থাকেন। এবং এইভাবে লাথি দিয়ে ব্যাঙ বানানোর ব্যাপারটা তার কাছে ডাল-ভাত অথবা ক্ষেত্রবিশেষে ডাল-ভাতের চাইতেও কম কিছু! 

আমার সাথে বাবার রাগারাগির একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

-'ওই কি করিস?'
-'এইতো পানি খাচ্ছি বাবা'
-'পড়াশুনা বাদ দিয়ে এইসব করে বেড়াস কেন?'
-'যাচ্ছি বাবা'
-'মাথার মধ্যে ঘিলু বলে কি কিছু আছে?'
-(চুপ)
-'মাথাটা যদি কাটা হয় দেখা যাবে গোবর পোরা'
-(চুপ)
-'পড়াশুনা করতে ইচ্ছে হয় না?'
-(চুপ)
-'সারাদিন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কি এমন মহার্ঘ তোমায় দিয়ে হয়?'
-(চুপ)
-'ইচ্ছে হয় সাইকেলটা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিই'
-(চুপ)
-'দূর হ চোখের সামনে থেকে'

আমি দূর হই। কোনভাবেই এই রাগারাগির পেছনের কোন কারণ খুজে পাই না। গতবার বার্ষিক পরীক্ষায় রোল নম্বর দশের বাইরে চলে গিয়েছে, এটা একটা কারণ হতে পারে। অথবা তার মেজাজ খারাপ অথবা এমনিতেই।

আমার দুআ করার হার বেড়ে যায়। দুআর বদৌলতে হোক, আর অন্য কিছুতে হোক, বাবা কয়েকদিন রাগ করেন না। খুব ভালো থাকেন।

আবার কয়েকদিন পর ঝড় ওঠে। পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়। তারপর চারপাশ কালো করে জমা মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে প্রকৃতির কোলে। রাগারাগি শুরু হয়।

দিনগুলো খুব দ্রুত গেল। ক্যালেন্ডারে যেমন সহজেই এক তারিখ থেকে দুই তারিখ,দুই থেকে তিন,তিন থেকে চারে যাওয়া যায়, এমন করেই যেন গেল দিনগুলো। বার্ষিক পরীক্ষার সময় এসে গেল।

হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়লাম। জ্বর এলো একদম বিছানায় পড়ে থাকার মত। পড়াশুনা দূরে থাক, উঠতেই পারলাম না। ডাক্তারেরা বাড়ির বাইরের লোকের রোগ খুব গুরুত্ব নিয়ে দেখে, সেই তুলনায় নিজের বাড়ির লোকজন সিকিভাগ গুরুত্বও পায় না। যাই হোক,পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে পড়তে বসলাম। পড়াশুনার যে অবস্থা, টেনেটুনে কোনরকমে পাশ করলেই খুশি আমি।

রেজাল্টের দিন বসে আছি। একটু পরেই নবম শ্রেণীর ফলাফল ঘোষণা হবে।
আমাদের স্কুলে নাম ঘোষণা করে দশ-নয়-আট-সাত.... এভাবে। বলতে বলতে
শেষমেশ একদম এক নম্বরে বললো আমার নাম!

চোখে অবিশ্বাস নিয়ে আমি তাকিয়ে আছি ঘোষকের দিকে। আরও একবার শুনলাম নামটা। আসলেই কি আমি!

পুরষ্কার নিয়ে এসে অন্য সবার সাথে খুশিতে মেতে উঠলাম। পড়াশুনা না করা আমার জন্য অসাধারণ এক অর্জন। সেই মুহূর্তে মনে হলো, ইশ! বাড়ি থেকে কেউ যদি আজকে সাথে আসতো! বাবার কথা ভেবে একটু সুখ লাগলো বুকের মধ্যে। লোকটা সারাজীবন বলে গেছে আমার মাথায় গোবর পোরা।

খুশি মনে গ্যারেজের দিকে গেলাম।বন্ধুদের অধিকাংশই বাড়ি চলে গেছে। আমরা কয়েকজনই কেবল আছি। চাবিটা হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে কোন সাইকেল দেখলাম না। অবাক হলাম। দ্রুত চাইলাম চারপাশে। 

কোথাও নেই। দৌড়ে গেলাম দারোয়ানের কাছে।

'চাচা,একটা লাল রঙা সাইকেল ছিলো আমার।'
পানের পিক ফেলতে ফেলতে চাচা বললেন, 'হ্যা, ছিলো তো'।
'ওই সাইকেলটা.. পাচ্ছি না' 
'কেন পাচ্ছো না? তালা দেওয়া ছিলো না?'
'ছিলো'
'আহারে.. তাই নাকি? কেউ চুরি করলো নাকি'?
'আচ্ছা,আপনি কাউকে সাইকেলটা নিয়ে যেতে দেখেছেন'?
'খেয়াল করিনি তো। রেজাল্টের দিন অনেকেই তো আসে। কজনের দিকে খেয়াল রাখা যায়'?

সত্য কথা।খেয়াল রাখা যায় না। কিন্তু তখনও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, সাইকেলটা নেই। স্কুলের সামনের রাস্তায় হাটাহাটি করলাম কিছুক্ষণ। পেলাম না।

বাড়ির দিকে হাটছি। ধীর পদক্ষেপ, ঘোলা দৃষ্টি।

মনটা প্রচন্ড খারাপ। বাবা এতদিন বকাবকি করেছে,আমার মন এতটা খারাপ হয় নি। সাইকেলটা আসলেই নেই?

বাড়িতে পৌছানোর পরবর্তী ঘটনার কথা ভাবছি।
আমার কাছে দুটো সংবাদ আছে।
একটা প্রচন্ড সুখের, আরেকটা প্রচন্ড দুঃখের।
কোনটা আগে দেবো?

আমার কাছে যে খবরটা জরুরী, সে খবরটা কি সবার কাছেই জরুরী?

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না