ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


২৪ মার্চ, ২০১৭ ১১:৩৪ পিএম

বন্ধ হোক ফ্রী হেলথ ক্যাম্প

বন্ধ হোক ফ্রী হেলথ ক্যাম্প

প্রিয় ডাক্তারসমাজ, হালকা শীতের আমেজে বসন্তের চমৎকার রাত। এই অপূর্ব রাত্রিতে কিছু অপ্রিয় কথা বলি। আসছে স্বাধীনতা দিবসে আপনারা অনেকেই ফ্রী ক্যাম্প করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আপনাদের ফ্রী ক্যাম্পের প্রচার প্রচারনায় চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। এই উৎকট প্রচারণা আর জনসেবার অদ্ভুত লিগেসিতে বড়ই বিব্রতবোধ করছি। এই সামষ্টিক ফাজলামো থেকে বিরত থাকা যায় না? আর কেউ না জানুক, আপনারাতো নিশ্চিত জানেন, এতে জনসাধারণের কতটুকু লাভ হয়।

প্রতিটি ফ্রী হেলথ ক্যাম্পে ডাক্তারপ্রতি একশত জনের বেশি রোগী দেখতে হয়। এই বিপুল সংখ্যক রোগীর না হয় কোনো ডায়াগনোসিস, না হয় কোনো ম্যানেজমেন্ট। স্রেফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রচারণা, মানহীন ঔষধ কোম্পানির ময়দা বানিজ্য আর এলাকার স্বঘোষিত কিছু সমাজসেবকদের সমাজসেবার অভিনয় ছাড়া এই ফ্রী ক্যাম্পগুলো থেকে কিছুই আদায় হয়না।চিকিৎসা একটি সমন্বিত বিষয়। রোগীর যথাযথ হিস্ট্রি নেয়া, যথাযথভাবে এক্সামিনেশন করা, সঠিক ইনভেস্টিগেশন - এসব মিলিয়ে হয় ডায়াগনোসিস এবং তার ভিত্তিতে উপযুক্ত চিকিৎসা।

মাইক দিয়ে পুরো গ্রাম ডেকে এনে মেজবান খাওয়ানোর মতো করে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। সঠিক রোগ নির্ণয় না করে সিম্পটোম্যাটিক চিকিৎসা দেয়া একজন কোয়াকের কাজ, রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট চিকিৎসকের সাথে এই কাজ যায় না। সিম্পটোম্যাটিক চিকিৎসা তাই উপযুক্ত চিকিৎসকের কাছে রোগীর রোগযাত্রাকে বিলম্বিত করে মাত্র। তাই শেষ বিচারে এই ফ্রী চিকিৎসা ক্যাম্পগুলোতে স্ট্যান্টবাজি ছাড়া আর কোনো গুরুত্ব বহন করেনা।

আপনার মহান পেশার শপথ, জেনে বা না জেনে এই স্ট্যান্টবাজির প্রক্রিয়ায় আপনি যাবেন না। এইতো গেলো একটা দিক। আরেকটা দিকের কথা বলি। একসময় আপনার পেশা খুব সন্মান বহন করতো। ধর্মপালন আর রোগীর চিকিৎসা প্রায় সমান অর্থ বহন করতো। এজন্য সব নবীরাই রোগীর রোগ মুক্তির প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতেন। ডাক্তাররা তাই দুই অর্থেই স্রস্টার পরের আসনটুকু লাভ করতেন। এখন সময় বদলেছে অনেক। এই হরিৎ চামড়াওয়ালা গ্রহটির বয়স বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কনজুমারিজম আর কর্পোরেট দৌরাত্ম্য।

ডাক্তার এখন একজন সেবা বিক্রির কারিগর আর কর্পোরেট দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ একজন চাকুরিজীবী মাত্র যার কাছে রোগী শুধু ক্রেতা। বাকি দুনিয়া এই সত্য মেনে নিয়েছে। পারিনা আমরা আর আমাদের রোগীসমাজ। তাই আমরা রোগীকে রক্ত দেয়ার জন্য ছুটাছুটি করি, ফ্রী ক্যাম্প করি এবং রোগীর মুখে স্যার ডাক না শুনলে কিছুটা ক্ষুদ্ধও হই। আর রোগীরাও মামার বাড়ির আবদার হিসেবে ফ্রী চিকিৎসার প্রত্যাশী হয়, মিনিট দিয়ে ডাক্তারের পারিশ্রমিক হিসেব করে।

তাই চলমান ডাক্তার - রোগী দ্বন্দ্বে এই ফ্রী হেলথ ক্যাম্পগুলো অবদান রেখে যাচ্ছে। আমি জানি, কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছেন। আমি জানি, এর বাইরেও কিছু বিষয় আছে। ফ্রী হেলথ ক্যাম্পের বদৌলতে রোগী দেখে ইনভেস্টিগেশনের লিস্ট ধরিয়ে দেয়ার জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চাপ এবং ডাক্তারের পশার বৃদ্ধিরও একটা বিষয় আছে।

তারপরও আর্তি জানাই, আপনার মহান পেশার শপথ, এই সম্মিলিত স্ট্যান্টবাজির মহড়া থেকে আপনি সরে দাড়ান। মেরুদণ্ড সোজা রেখে শ্বাস নিন। চারদিকে কি আনন্দ। অতি তুচ্ছ পতংগেরও অপুর্ব জীবন। হয়তো শিশির কণারও আছে একান্ত একা, আনন্দেরই ক্ষণ। আপনার কেনো থাকেনা??

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত