ডা. নাজিরুম মুবিন

ডা. নাজিরুম মুবিন

মেডিকেল অফিসার, মিনিস্ট্রি অব হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার


২৪ মার্চ, ২০১৭ ০৪:১১ পিএম

ত্রি ভুবনে কেউ না থাকা রোগিদের লইয়া আমরা ডাক্তাররা কী করিব ?

ত্রি ভুবনে কেউ না থাকা রোগিদের লইয়া আমরা ডাক্তাররা কী করিব ?

বিসিএস হওয়ার পরে ডা. প্রশান্ত'র প্রথম পোস্টিং ছিল সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায়। বেশ দুর্গম এলাকা। কথিত আছে, 'যার নাই কোন আশা হে যায় ধরমপাশা।' ধর্মপাশাকে ঐ এলাকার লোকজন ধরমপাশা বলে।

সেদিন উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে ডা. প্রশান্তর ডিউটি ছিল। পুরোদিন ভালোই গেল। রাতে অবস্ট্রাক্টেড লেবারের একজন রোগিকে ইমার্জেন্সিতে আনা হলো। সারাদিন বাড়িতে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করা হয়েছে। প্রচুর ব্লিডিং হওয়ার পরে রোগি যখন যায় যায় অবস্থা তখন হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।

যত তাড়াতাড়ি পারা যায় এই রোগির সিজার করতে হবে। কিন্তু ধর্মপাশা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে তখন কোন গাইনি কনসালটেন্টের পোস্ট ছিল না। এনেস্থেটিস্ট ছিল না। ডা. প্রশান্ত হাইপোভলিউমিক শক ম্যানেজমেন্টের জন্য দুই হাতে আইভি চ্যানেল ওপেন করে ফ্লুইড ইনফিউশন শুরু করলেন। রোগির সাথে আসা লোকদের বললেন, "রোগিকে এখনই সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া রোগিকে বাঁচানো সম্ভব না।"

"ডাক্তার সাব, আমরা গরীব মানুষ। উফরে আল্লাহ্‌। নীচে আফনে। ত্রি ভুবনে আমরার আর কেউ নাই। রোগি বাঁচলে এইনে বাঁচবো। মরলে এইনেই মরবে। রোগিরে সুনামগঞ্জো লইয়া যাওয়ার সামর্থ আমরার নাই।" ডাক্তারের পরামর্শের প্রতিউত্তর দিলো রোগির সাথে আসা এক লোক।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগি মারা গেল। ডা. প্রশান্ত ইমার্জেন্সির রুমে বসে আছেন। তার মন খারাপ। এতো কম বয়সে একটা মেয়ে মা হতে গিয়ে মারা গেল। বাচ্চাটাকেও রক্ষা করা গেল না। বাড়িতে চেষ্টা না করে ব্যথা শুরু হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে গেলে দুটো প্রাণই বেঁচে যেত। ইমার্জেন্সির জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তাটা দেখা যায়। অন্ধকারে কতগুলো আলো এগিয়ে আসছে।

আলোর মিছিল নামে একটা বাংলা চলচ্চিত্র আছে। ববিতা, রাজ্জাক আর কে কে যেন আছে? মনে করার চেষ্টা করে ডা. প্রশান্ত। আলোর মিছিল ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। লাঠি, ট্যাঁটা, মশাল নিয়ে গ্রাম ভেঙ্গে লোক আসছে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের দিকে।

"স্যার, তাড়াতাড়ি পালান। আপনাকে মারার জন্য শ' খানেক লোক আসতেছে।" মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট হাঁপাতে হাঁপাতে ডা. প্রশান্তকে বললো। "কেন? আমাকে মারতে আসবে কেন?" সরল জিজ্ঞাসা ডাক্তারের। "আপনি ওই প্রেগনেন্ট মহিলাকে মেরে ফেলেছেন। তাই গ্রামের সবাই আপনাকে মারতে আসছে।" জবাব দিলো মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট।
এবার হুঁশ ফিরলো ডাক্তারের। "তুমি কী করবা?"

"আমাকে ওরা কিছু বলবে না। আমি এলাকার ছেলে। আপনি তাড়াতাড়ি পালান" মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট ডাক্তারকে প্রায় ঠেলেই হেলথ কমপ্লেক্সের পিছন দিক দিয়ে বের করে দিলো।

মধ্যরাতে ক্ষেত, জঙ্গল, খাল, বিল সব দৌড়িয়ে পার হচ্ছেন ডা. প্রশান্ত। ত্রি ভুবনে কেউ না থাকা মানুষের মৃত্যুর জন্য এই মাঝরাতে পুরো গ্রাম থেকে লোক চলে আসবে বিষয়টা কোনভাবেই মিলাতে পারছেন না তিনি। দৌড়ের মধ্যেই আলোর মিছিলের বাকি অভিনেতা অভিনেত্রীর নাম পড়ে যায় তার। ফারুক, সুজাতা, খলিল, রোজী আফসারী। পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা। বিসিএসের জন্য পড়া হয়েছিল।

একদিন পর সংবাদপত্রের পাতায় একটা শিরোনামে চোখ আটকে যায় ডা. প্রশান্ত'র। "ধর্মপাশায় চিকিৎসায় অবহেলায় গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু, চিকিৎসক পলাতক।"

[ফোর্থ ইয়ারে ফিজিক্যাল মেডিসিনে আমাদের ১ সপ্তাহ প্লেসমেন্ট ছিল। ডা. প্রশান্ত তখন ফিজিক্যাল মেডিসিনের মেডিকেল অফিসার ছিলেন। ছোটখাট মানুষ। এখন কোথায় আছেন জানি না।]

[ধর্মপাশার লোকেরা আবার আমার উপর রেগে যাবেন না প্লিজ। বাংলাদেশের সব উপজেলাতেই এরকম ঘটনা ঘটে। তাছাড়া আমার খুব প্রিয় এক বড় ভাইয়ের বাড়ি ধর্মপাশায়। উনি অতি সজ্জন।]

'আমরা ডাক্তাররা কী করিব' সিরিজের আজকের প্রশ্ন, ত্রি ভুবনে কেউ না থাকা রোগিদের লইয়া আমরা ডাক্তাররা কী করিব?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত