ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


২৩ মার্চ, ২০১৭ ০৫:৩৭ পিএম

ডিপ্লোমা পরীক্ষাঃ শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি

ডিপ্লোমা পরীক্ষাঃ শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি

আগামী ১৬মার্চ ডিপ্লোমা, এমফিল পরীক্ষা। যারা এই পরীক্ষা দিবেন, তারা ইতোমধ্যে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। তাদের প্রস্তুতির কিছুটা সহযোগিতার জন্য এই লেখা। ডিপ্লোমা এবং এমফিল একই সময়ে পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ধরন রেসিডেন্সি পরীক্ষার মতোই। তবে রেসিডেন্সি পরীক্ষা হয় দুই ঘন্টায়, দুইশত নাম্বারের। ডিপ্লোমা, এমফিল পরীক্ষা হয় দেড় ঘন্টায়, একশো নাম্বারের। নাম্বার বন্টনও রেসিডেন্সির মতো একই ধারাক্রম অনুসরণ করে হয়। রেসিডেন্সি পরীক্ষার মতো ডিপ্লোমা পরীক্ষায়ও কোনো সিলেবাস নাই। পুরো মেডিকেল সাইন্সই সিলেবাস। তবে বিগত বছরের প্রশ্নগুলোর প্যাটার্ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রেসিডেন্সি ,ডিপ্লোমা, এমফিল পরীক্ষার প্রশ্নে একটা নির্দিষ্ট ধারাক্রম অনুসরণ করা হয়। সেই আলোকে এই লেখায় ডিপ্লোমা, এমফিল পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

যেভাবে প্রশ্ন আসে :

ডিপ্লোমা, এমফিল পরীক্ষায় অধিকাংশ প্রশ্ন বেসিক বিষয়গুলো থেকে আসে। মোটামুটি ৬০-৭০টি প্রশ্ন বেসিক বিষয়গুলো যেমনঃ এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমেস্ট্রি, প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি থেকে আসে। বাকী প্রশ্নগুলো ক্লিনিক্যাল এবং সাবজেক্ট রিলেটেড। মোটামূটি ৭০-৮০টি প্রশ্ন সবার জন্যই একইরকম। বাকীগুলো অনূষদ ভিত্তিক আলাদা হয়। বিগত বছরের প্রশ্ন পর্যালোচনায় দেখা যায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসেপ্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি এবং ফিজিওলজি থেকে। এনাটমি, বায়োকেমেস্ট্রি, ফার্মাকোলজি থেকে কিছুটা কম প্রশ্ন থাকে। তাই প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োজি, ফিজিওলজির প্রস্তুতির মধ্যে লুকিয়ে আছে এমফিল/ডিপ্লোমায় চান্স পাওয়ার প্রাণভোমরা। তবে অন্যবিষয়গুলোকে কম গুরুত্ব দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাত্র .২ ও অনেক সময় ব্যবধান গড়ে দেয়।

যেভাবে প্রিপারেশন নিবেন :

আগেই বলা হয়েছে অধিকাংশ প্রশ্ন আসে বেসিক বিষয়গুলো থেকে। তাই বেসিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফিজিওলজি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্যাথলজির ক্ষেত্রে এখন রবিনসের বাইরে প্রশ্ন বেশি একটা আসেনা। মাইক্রো লেঞ্জের চার্টগুলো থেকে অনেক প্রশ্ন কাভার করে। ফিজিওলজির জন্য আপাতত ভিশন ফিজিওলজি পড়লে চলবে। সার্জারি ফ্যাকাল্টি ছাড়া এনাটমি বিডি চৌরাসিয়ার বাইরে পড়া লাগেনা তেমন একটা। বায়োকেমেস্ট্রির জন্য মোজাম্মেল স্যারের এবিসি বায়োকেমেস্ট্রি থেকে পড়তে হবে।

এই কথাগুলো পড়ার সময় আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে উপরে যে সিলেবাস দেয়া হলো তা একটি আদর্শ সিলেবাস। বেসিক থেকে এর বাইরে প্রশ্ন থাকবেনা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই সিলেবাস শেষ করতে আপনার এমবিবিএস পর্যায়ে আপনার চার বছরের কাছাকাছি সময় লেগেছিল। কিন্তু আপনার হাতে সময় আছে আর মাত্র অল্প কয়েক দিন। তাহলে? তাদের জন্য শর্টকাট সাজেশানের আগে বলি, আপনার সাথে যারা পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদের সবার হাতেই কিন্তু সময় বেশ কম।

সুতরাং হতাশ হবেন না। কেউই পুরোপুরি প্রিপারেশন শেষ করে পরীক্ষা দিতে পারেনা। আপনার এবং অন্য সবার অবস্থা মোটামুটি একইরকম। কাজেই এখন থেকে আপনি যদি পুর্নোদ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন, তাহলে আপনিই এগিয়ে থাকবেন।

প্রথমেই বাকী দিনগুলোর জন্য একটা রুটিন ঠিক করে নিন।আগেই বলেছি, ফিজিওলজি,প্যাথলজি,মাইক্রোবায়োলজি থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে।এর পাশাপাশি আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আপনার মস্তিষ্ক এই বিষয়গুলোকে দীর্ঘসময় স্মৃতি হিসেবে জমা রাখতে পারে।তাই এই বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে বেশি।রুটিনে এই বিষয়গুলোর প্রস্তুতির জন্য সময়ও রাখতে হবে বেশি।ফার্মাকোলজি, এনাটমি থেকেও প্রশ্ন আসে অনেক।কিন্তু এই বিষয়গুলোর সিলেবাস অনেক বড় এবং এই বিষয়গুলো মনে রাখাও অনেক কঠিন।তাই এই বিষয়গুলোতে সময় তুলনামূলকভাবে কম হলেও ক্ষতি নেই।মনে রাখতে হবে, আপনাকে আলাদা করে করে সব বিষয় পাশ করতে হবেনা, সব মিলিয়ে বেশি নাম্বার পেতে হবে।

এরপর গত দুইবারের রেসিডেন্সি প্রশ্ন খুব ভালোভাবে সমাধান করুন।অভিজ্ঞতা বলে, এখান থেকে পঞ্চাশের কাছাকাছি প্রশ্ন থাকে।বিগত বছরগুলোতে প্রশ্ন রিপিটের হার আস্তে আস্তে কমে এসেছে।তবে হুবহু প্রশ্ন রিপিট বেশি না হলেও টপিক্স রিপিট হচ্ছে, স্টেমগুলো আলাদা হচ্ছে।তাই প্রশ্নগুলো সমাধান করার সময় শুধু স্টেমগুলোর পাশে ট্রু ফলস মুখস্থ না করে বুঝে পড়ুন। না বুঝে পড়লে পরীক্ষার হলে গিয়ে অনেক স্টেমই আপনার কাছে অপরিচিত মনে হবে।

এখন প্রশ্ন ব্যাঙ্কওয়ালা একটা গাইড নিন। খুব ভালো হয় ম্যাট্রিক্স সিরিজ অথবা Genesis Last hour সলভ করে যেতে পারলে। এখান থেকে সত্তর থেকে আশিটা প্রশ্ন থাকেই। তবে এই বই দুইটার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাবেনা। দুইটা বইই খুব উপকারী কিন্তু শতভাগ ক্রুটিমুক্ত নয়।তাই এই বইগুলো সলভ করার সময় মুল বই থেকে মিলিয়ে বুঝে পড়তে হবে। মুল বইয়ের পাশাপাশি জেনেসিসের শিটগুলো ফলো করতে পারলে চমৎকার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব। প্রশ্ন সলভ করার সময় দেখবেন, কিছু টপিক্স বার বার এসেছে। সেগুলো আলাদা করে শিট থেকে পড়ে নিতে হবে।

কোনো ইনফরমেশন খুব বেশি কনফিউশান সৃষ্টি করলে তা মুল বই থেকে পড়ে নিবেন। কিন্তু বাকি সময়টুকু খুব বেশি গবেষণা করা যাবেনা। মনে রাখতে হবে আট দশটা প্রশ্ন কঠিন এবং কনফিউজিং আসবে। ওগুলো জানা না থাকলে সব ট্রু ফলস দিয়ে আসলেও অর্ধেকের কাছাকাছি নাম্বার পাওয়া যাবে। কিন্তু সহজ প্রশ্ন ভুল করা যাবেনা। আগামী দুই সপ্তাহে যতটুকু সম্ভব প্রস্তুতি শেষ করতে হবে।

কিছু অবশ্য পালনীয় কাজ :

# এখন থেকে যাবতীয় ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পত্রিকা পড়াসহ যাবতীয় এক্সট্রাকারিকুলার এক্টিভেটিজ থেকে দূরে থাকতে হবে। যদি সম্ভব হয়, এই লেখা পড়া শেষ করেই ইন্টারনেট কানেকশান অফ করে দিন। আগামীকাল সকাল থেকে আর ফেসবুকে না ঢুকার প্রতিজ্ঞা নিবেন না। সে আগামীকাল কখনোই আসেনা। এখন না হলে এই সিদ্ধান্ত আর নিতে পারবেন না।
# দিনে কয় ঘন্টা পড়বেন তার কোনো হিসেব করতে যাবেন না। খাওয়া এবং ঘুমের বাইরে সারাক্ষণই পড়বেন।
# টিভি রুম থেকে শত হস্ত দূরে থাকবেন।
# শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশ দলের খেলা, রিয়েল মাদ্রিদের সাথে বার্সেলোনা বা পিএসজির খেলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপনার জীবনে এই ডিপ্লোমা পরীক্ষা অবশ্যই তার চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। খেলার খবর রাখতে পারেন সর্বোচ্চ। টিভিতে বা নেটে খেলা দেখার চেষ্টা করার দরকার নাই।
# সহজ মনে করে কোনো টপিক্স ফেলে রাখবেন না। হুটহাট এই টপিক্স ওই টপিক্স পড়া শুরু করবেন না।
# অবশ্যই গত দুই বছরের রেসিডেন্সির প্রশ্ন বুঝে সলভ করবেন।
# খুব বেশি দুশ্চিন্তা করবেন না। স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখুন। দিনে কমপক্ষে পাঁচ ঘন্টা ঘুমাবেন।
# ম্যাট্রিক্স, লাস্ট আওয়ার আর ইমপালসের ভুল নিয়ে মাথা গরম করবেন না। ভুল থাকে। ভুল ধরতে পারছেন মানে আপনার প্রিপারেশন ভালো।
# নিজ নিজ ধর্মের সৃষ্টিকর্তার কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করুন। প্রার্থনার শক্তি অসামান্য। আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টার পর এই চাওয়া পরম করুনাময় বিফল করবেন না।

পরীক্ষার হলে করণীয় :

# সময় নষ্ট করবেন না। যেটা পারেন না, ওটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নাই। ওই প্রশ্নের বাকী স্টেমগুলোর মধ্যে ট্রু বেশি হলে ফলস দাগান, ফলস হলে ট্রু।
# যে প্রশ্ন দেখে বুঝতে পারছেন না, সেটায় সব স্টেম ট্রু অথবা সব ফলস দাগান।
# অবশ্যই সব প্রশ্ন উত্তর দিয়ে আসবেন। প্রতি সঠিক উত্তরের জন্য আপনি পাবেন .2, ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে. 05। তাই অবশ্যই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আসবেন। পরীক্ষার হল ত্যাগ করার আগে আপনি একশোটা প্রশ্নের পাঁচশো স্টেম দাগিয়েছেন, তা নিশ্চিত করুন।

শেষকথা : বাংলাদেশে এখন বিএমডিসি রেজিস্টার্ড ডাক্তার প্রায় একানব্বুই হাজারের কাছাকাছি। প্রতিবছর প্রায় সাতহাজার করে নতুন ডাক্তার বের হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছর পর ডাক্তার সংখ্যা লাখ পেরোবে। তাই পোস্ট গ্রাজুয়েশন ছাড়া চলাটাই খুব দুষ্কর হবে। তাই যারা ডিপ্লোমা /এমফিল পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের জন্য এই পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের কথা চিন্তা করে এই বিষয়ের অবতারণা। এখানকার কথাগুলোকে উপদেশ হিসেবে না নিয়ে আমার ব্যক্তিগত রোজনামচা হিসেবেও নিতে পারেন। রেসিডেন্সিকে লক্ষ করে আমি যেভাবে এগিয়েছি, তাই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সবার চেষ্টা সফল হোক।। আগামী দিনের কনসালটেন্টদের অভিনন্দন।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত