ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


২২ মার্চ, ২০১৭ ১০:০৩

হেপাটাইটিস বি চিকিৎসার নামে হোমিও, আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি চিকিৎসকদের ধান্দাবাজি

হেপাটাইটিস বি চিকিৎসার নামে হোমিও, আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি চিকিৎসকদের ধান্দাবাজি

আয়ুর্বেদিক এবং হোমিও চিকিৎসার নামে বাংলাদেশে যাবতীয় ধান্দাবাজি চলতেছে আবহমান কাল থেকে। বাংলাদেশে হাজার হাজার ভুল চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক আছে। অথচ এ ব্যাপারগুলো নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয়না।

বরং পত্রিকার বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বড় স্পেস নিয়ে এসব চিকিৎসার বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। ক্যান্সার থেকে শুরু করে বন্ধ্যা নারীর সন্তানলাভ - সব ধরনের চিকিৎসা দিতে অভ্যস্ত এই ধান্দাবাজরা। এরকম ধান্দাবাজির একটা চমৎকার নমুনা হচ্ছে হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা।

গত ঈদে গ্রামে গিয়ে গ্রামের বাজারে পরিচিত একজনের সাথে কথা বলছিলাম। তিনি একটু উশখুস করে জানালেন, তিনি আমার সাথে একটু প্রাইভেট কথা বলতে চান। প্রাইভেটে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম ভদ্রলোক হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত। এখন এই রোগ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা জানতে চান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশে যাওয়ার জন্য দুইবছর আগে কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছিলেন। তাতে তার হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে এবং যাওয়া আটকে যায়।

তিনি এ বছর আবার চেষ্টা করেন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার মুখোমুখি হন। আবার তার হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে এবং বিদেশ গমন আটকে গেছে। এখন তিনি আমার কাছে জানতে চান, তার ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি নেগেটিভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা? আমি উনাকে মোটামুটি বুঝিয়ে বললাম যে, তিনি ক্রোনিক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত এবং উনার ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি নেগেটিভ হওয়ার সম্ভাবনা নাই। তবে হেপাটাইটিস বাড়ছে কিনা, তা জানার জন্য নিয়মিত চেক আপ জরুরী।

ভদ্রলোক গত কয়েকদিন আগে আমাকে ফোন দিলেন। এতদিন আয়ুর্বেদিক ঔষধ খেয়ে উনি হেপাটাইটিস বি নেগেটিভ করার চেষ্টা করেছেন। এখন ব্যর্থ হয়ে কি করা যায়, আবার পরামর্শ চাচ্ছেন। আমি পরিচিত একজন হেপাটোলজিস্টের ঠিকানা দিয়ে উনাকে পাঠালাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, বিদেশ গমনেচ্ছু অনেক হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগী হোমিও এবং আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে এটা নেগেটিভ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এ প্রেক্ষাপটে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু তথ্য শেয়ার করার চেষ্টা করবো। হেপাটাইটিস হলো লিভারের এক ধরনের প্রদাহ যেটা প্রধানত হেপাটাইটিস এ,বি,সি, ডি এবং ই ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে। এরমধ্যে হেপাটাইটিস এ এবং ই শুধুমাত্র একিউট বা সাময়িক প্রদাহ ঘটায় যেটা সাধারণ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস এবং বি এর সাথে মিলে ডি ভাইরাস একিউট বা সাময়িক প্রদাহের পাশাপাশি ক্রনিক বা স্থায়ী প্রদাহও ঘটায়।

এরমধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসটাই সাধারণত আমাদের দেশে বেশি ছড়ায়।হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রথমে একিউট ইনফেকশন করে। এর মধ্যে নব্বই থেকে পচাঁনব্বই ভাগ নিজে নিজেই ছয় মাসের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। বাকি পাঁচ থেকে দশভাগ ছয় মাসের পরেও থেকে যায় এবং ক্রনিক ইনফেকশনের রুপ ধারণ করে। এটা আর ভালো হয়না এবং এই ধরনের রোগী আজীবন হেপাটাইটিস বি এর বাহক হিসাবে কাজ করে। এদের মধ্যে সামান্য অংশ লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সার করে থাকে।

আমাদের দেশে অনেকে রক্তদান বা বিদেশগমনের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় জানতে পারেন তিনি হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত। এদের মধ্যে একটা অংশ একিউট অবস্থায় থাকে যাদের অধিকাংশ এমনিতে ভালো হয়ে যেতো। এদের একটা অংশ কবিরাজি, আয়ুর্বেদিক, হোমিও ঔষধ খায়। এদের ভালো হয়ে যাওয়ার পিছনে এই ঔষধের কোনো ভুমিকা নাই। কিন্তু এদেরকে নিজেদের সফলতা হিসেবে প্রচার করে বিপুল সংখ্যক রোগীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এসব অপচিকিৎসকরা।

এরা দাবী করতে থাকে তাদের কাছে হেপাটাইটিস বি রোগের চিকিৎসা আছে।বিপুল সংখ্যক রোগী আশায় বুক বেঁধে এদের কাছে যায় এবং সময় ও অর্থের অপচয় করে। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা জরুরী। সবাইকে এ বিষয়গুলো জানা এবং আশেপাশের লোকদের জানানো জরুরী:

# হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত সব রোগী লিভার সিরোসিস বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়না।

# হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত হলে ছয়মাসের মধ্যে অধিকাংশ রোগী ভালো হয়ে যায়। ছয়মাস পরেও হেপাটাইটিস বি পজেটিভ থাকলে এটা আর নেগেটিভ হয়না। ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে কোনো ঔষধেই হেপাটাইটিস বি পজেটিভ থেকে নেগেটিভ হবেনা।

# যাদের ক্রনিক হেপাটাইটিস হয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি-এর জীবাণু বাড়ছে কিনা তা পরীক্ষা করা জরুরী। একজন হেপাটোলজিস্টের আন্ডারে থেকে নিয়মিত বিরতিতে HBeAg এবং HBV DNA পরীক্ষা করতে হবে। এগু লো সিগনিফিক্যান্ট হলে এন্টিভাইরাল ঔষধ খেতে হয়। তবে মনে রাখতে হবে এন্টিভাইরাল জীবানুর বংশবৃদ্ধি কমায় কিন্তু পজিটিভ হেপাটাইটিস বি - কে নেগেটিভ করতে পারেনা।

# যারা হেপাটাইটিস বি দ্বারা আক্রান্ত নন, তাদের সবারই হেপাটাইটিস বি টিকা দেয়া জরুরী।

# একই সিরিঞ্জ, ব্লেড ব্যবহার করলে বা অনিরাপদ যৌন মিলনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ছড়ায়। এগুলো থেকে দূরে থাকা জরুরী।

# বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এখন ইপিআই সিডিউলে হেপাটাইটিস বি এর টিকা দেয়া হয়। তাই আলাদা করে দিতে হয়না।

# আয়ুর্বেদিক, হোমিও, কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক হেপাটাইটিস ভালো করতে পারেনা। বরং এগুলোর বেহুদা উল্টাপাল্টা চিকিৎসা পদ্ধতি নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। নিজে এগুলো থেকে দূরে থাকুন। আশেপাশের লোকজনকে এসব ব্যাপারে সচেতন করুন।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত