ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


১৭ মার্চ, ২০১৭ ২২:০৬

সিজারিয়ান সেকশন : গাইনি বিশেষজ্ঞের দায়

সিজারিয়ান সেকশন : গাইনি বিশেষজ্ঞের দায়

সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ২০০৪ সালে এই হার ছিলো বছরে মোট ডেলিভারীর ৫ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৯ শতাংশ, ২০১১ তে ১৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ২৩ শতাংশ।সন্দেহ নেই সিজারিয়ান সেকশনের এই উচ্চ হার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চাইতে বেশী। অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীরাও সিজারিয়ান সেকশনের উচ্চহারে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এর জন্য গনহারে চিকিৎসকদের দায়ী করে থাকেন। এমনকি অনেক চিকিৎসকও মনে করেন গাইনোকলজিস্টদের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা এই সিজারিয়ান সেকশনের প্রবনতার জন্য দায়ী। ফেসবুকে একটা পোস্ট ভাইরাল হতে দেখেছি, কোনো এক অখ্যাত অনলাইন নিউজপেপারের। ওখানে দাবী করা হয়েছে, বাংলাদেশে সিজার করা হয় দুটি কারণে। টাকার জন্যে, গাইনির ডাক্তারদের শেখার জন্য। এই নিউজ বাংলাদেশের অনেক সচেতন লোকও বিশ্বাস করেন। তাই আসলে বাংলাদেশে সিজারিয়ান সেকশন বেশী কেনো তা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি।

বাংলাদেশে সিজার বেশী হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে-

প্রথমতঃ গর্ভকালীন মায়ের যে পরিমাণ যত্ন নেয়া দরকার তা নেয়া হয়না।এর ফলে প্রসবের জন্য ডাক্তারের কাছে আসে হাই রিস্ক অবস্থায়। সিজার করানো ছাড়া উপায় থাকেনা।

দ্বিতীয়তঃ আমাদের উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং কর্মজীবী মায়েরা ডেলিভারীর পেইন সহ্য করতে রাজিনা। ব্যাথাবিহীন নরমাল ডেলিভারীর জন্য এপিডুরাল দেয়ার ব্যবস্থা বাংলাদেশে এভেইলেবল না।আমার পরিচিত ডাক্তার দম্পতির কয়েকজন কোনো রকম ইন্ডিকেশন ছাড়াই সিজার করানোর জন্য ডাক্তারকে অনুরোধ করেছেন।

তৃতীয়তঃ অধিকাংশ পরিবার বিন্দুমাত্র ঝুকি নিতে রাজিনা। নর্মাল ডেলিভারিতে নবজাতক এবং মায়ের মৃত্যুঝুঁকি একটু বেশী।

চতুর্থতঃ ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ব। দালাল ডাইরেক্ট রোগী এনে ক্লিনিকে রাখে। ওটি টেবিলে নেয়ার আগে ক্লিনিকের ম্যানেজার সার্জনকে ফোন দেয়।

পঞ্চমতঃ গাইনোকলজিস্টের একটা অংশের ব্যস্ততা এবং টাকার লোভ। নর্মাল ডেলিভারীর জন্য যে সময় দরকার, সে সময় রোগীকে দেয়া উনাদের পক্ষে সম্ভব হয়না এবং সম্ভব হলেও রোগীর পার্টি সেই সময়ের টাকা দিতে রাজি হয় না।

ষষ্ঠতঃ জাতিগত ভাবে আমাদের এই অঞ্চলের মায়েদের short stature narrow pelvis বেশি থাকে।তাই অবস্ট্রাক্টেড লেবারের হার এই অঞ্চলে বেশী। এজন্য তুলনামূলকভাবে বেশী সিজার দরকার হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত সিজারের জন্য যেভাবে ঢালাওভাবে গাইনোকলজিস্টদের দায়ী করা হয়, তা পুরোপুরি ঠিক না। এবং গাইনোকলজিস্টরা শুধু সৎ হলেই এ সমস্যার সমাধান হবেনা।সবার সম্মিলিত সচেতনতাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।এজন্য প্রথমেই আমাদের মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া এবং গর্ভকালীন পরিচর্যা বাড়াতে হবে। নিজেদের সমস্যা নিয়ে সচেতন হওয়া উচিত। চিকিৎসকের প্রতি আস্থার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

বৈশ্বিক ভাবে স্বীকৃত ক্ষতির সম্ভাবনা মেনে নিতে হবে। দালাল এবং ক্লিনিক নির্ভর না হয়ে সরাসরি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আসতে হবে। অতিরিক্ত ব্যস্ত ডাক্তার পরিহার করতে হবে। সবার এ বিষয়টি বুঝতে হবে, গর্ভকালীন এবং পরবর্তী সমস্যার সমাধান যেকোনো গাইনি বিশেষজ্ঞই ভালোভাবে করতে পারেন, প্রফেসরের দরকার হয়না। এবং অবশ্যই আমাদের চিকিৎসকদের অর্থলিপ্সার প্রবনতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, চিকিৎসা পেশার ডিগনিটির কথা ভাবতে হবে। এবং অতি অবশ্যই ভুল চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে, প্রশাসনের অতি উৎসাহ কমাতে হবে। বদনাম আর জেল জুলুমের ভয় নিয়ে এথিক্যাল প্র্যাকটিস একটু কঠিন।

এর পাশাপাশি এই ধারণা থেকেও বের হয়েও আসা উচিৎ যে, সিজারিয়ান সেকশন মানে খারাপ আর নরমাল ডেলিভারী মানে খারাপ। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অপ্রয়োজনীয় সিজার যেমন হয়, তেমনি সিজারের ইন্ডিকেশন থাকার পরেও নরমাল ডেলিভারী করতে গিয়ে বাচ্চা এবং নবজাতক দুটোই সংকটাপন্ন হয়েছে। তাই এ সিদ্ধান্ত ডাক্তারদের হাতেই ছেড়ে দিন।
নবজাতক এবং প্রসুতি মা উভয়েই ভালো থাকুক। জাতীয় শিশু দিবসের শুভেচ্ছা।

অফটপিকঃ এই তথ্যটুকু শ্রদ্ধেয় Pinaki Bhattacharya ব্লগ থেকে নেয়া। ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৩৭ টা দেশের উপর অনাবশ্যক সিজারের হারের উপর চালানো গবেষণার উপর ভিত্তি করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যার শিরোনাম The Global Numbers and Costs of Additionally Needed and Unnecessary Caesarean Sections Performed per Year: Overuse as a Barrier to Universal Coverage এই রিপোর্টের প্রথমেই বলে নেয়া হয়েছে সিজারের হার স্বাভাবিক ভাবে কত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০-১৫% ক্ষেত্রে সিজার করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে এবং এই পরিমাণটা মা ও অনাগত শিশুর জীবন ঝুঁকি মুক্ত রাখার জন্য জরুরী। এই রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশের সিজারের হার ৭.৫ %, ভারতে ৮.৫%, আমেরিকায় ৩০.৩%, ইংল্যান্ডে ২২%। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে অ্যামেরিকায় অনাবশ্যক সিজারের হার ১০.৮% এবং ইংল্যান্ডে ০.৮%। সিজারের হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ব্রাজিলে ৪৫.৯%। আমরা কিউবার স্বাস্থ্য সেবার প্রশংসা করে থাকি সেখানেও সিজারের হার ৩৫.৬%।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত