১৩ মার্চ, ২০১৭ ১১:৩২ এএম

চিকিৎসকদের পদোন্নতি পদায়ন তদবিরনির্ভর!

চিকিৎসকদের পদোন্নতি পদায়ন তদবিরনির্ভর!

সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রয়েছে মারাত্মক বৈষম্য। অনেক ক্ষেত্রেই পদোন্নতি ও পদায়ন তদবিরনির্ভর। ফলে অনেক মেধাবী চিকিৎসক চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন বলে মনে করে আইন কমিশন। কমিশন বলছে, সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে এমন একটি ধারণা জন্মেছে যে, কোন বিশেষ দল না করলে ভাল পদায়ন ও পদোন্নতি হয় না। এমনকি পোস্ট গ্রাজুয়েশন বা সাব স্পেশালিটি পড়াশোনা করতে চাইলে তার জন্যও সুযোগ মেলে না।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে একই মানদণ্ড অনুসরণ করে মেধার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদানের সুপারিশ করেছে কমিশন। এক বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের আলোকে আইন কমিশন এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে হাসাপাতালের চিকিৎসার মান সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানে এক গুচ্ছ সুপারিশ করেছে কমিশন। কমিশনের এই প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, সদস্য বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর ও ড. এম শাহ আলম এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন। এই গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মত বিনিময় ও স্বনামধন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে একাধিক কর্মশালা পরিচালনা করে কমিশন।

কমিশনের গবেষণা প্রতিবেদন: জরুরি বিভাগের চিকিৎসা সেবা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য কোন অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, কনসালট্যন্ট বা সহকারি অধ্যাপক পদায়ন করা হয় না। অথচ ২৪ ঘন্টাই দুর্ঘটনাসহ মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে রোগীরা ক্রমাগত জরুরি বিভাগে এসে থাকে। অনেক সময় ওয়ার্ড বয় কিংবা আয়ারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকে। জরুরি অপারেশনের জন্য অপারেশন থিয়েটার ও পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট নেই। নেই প্যাথলজিক্যাল ও অন্যান্য ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা। নেই জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ও ব্লাড ব্যাংক।

দরিদ্র হলে অনেক সময়েই বিনা চিকিৎসায় রোগীকে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকতে হয়। আত্মহত্যা বা এই ধরনের রোগীদের জরুরি চিকিৎসার আগেই থানা পুলিশের ঝমেলায় পড়তে হয়। এসব সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্য জরুরি বিভাগে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যাপ্ত সংখ্যক কনসালট্যান্টসহ পর্যায়ক্রমে ডাক্তার ও নার্সের পদায়ন ও তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত এলাউন্স প্রদান করতে হবে। এছাড়া চিকিৎসা সেবা প্রদান সহজলভ্য করতে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে ওষুধ, রক্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বস্তুর সরবরাহ।

চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিষয় তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অনেক চিকিৎসক আছেন যারা বিকাল থেকে রোগী দেখে রাত সাড়ে ৩টায় বাড়ি ফেরেন। আবার কয়েক ঘন্টা পরে, পরের দিন সকালে হাসপাতালে রোগী দেখা ও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। সবাই না হলেও অনেক অধ্যাপক টাকা আয়ের যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস অত্যন্ত সীমিত আকারে অনুমোদিত। লন্ডনের হারলে স্ট্রিট এ ইংল্যান্ড তথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে থাকেন।

কিন্তু তারা প্রতি সন্ধ্যায় ১০ জনের বেশি রোগী দেখেন না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস সীমিতকরন ও রেফারেল পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করেছে কমিশন। যাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপর চাপ কমানো যায়। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার উন্নতি হলে চাপ কমবে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ওপর। এছাড়া প্রতি চার বা পাঁচ বছর পরে প্রত্যেক চিকিৎসকের পেশাগত দক্ষতার যাচাইমূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মত দেয় কমিশন।

কর্মচারী সংক্রান্ত সমস্যাবলী নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, সরকারি হাসপাতালে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কোন ইউনিয়ন না থাকলেও বিভিন্ন সমিতির নামে হাসপাতালে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। এমনকি ডাক্তার, নার্স, রোগী বাস্তবে তাদের হাতে জিম্মি। গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ থাকলেও কর্তৃপক্ষ এই শ্রেণির কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারে না। এ থেকে উত্তরণের প্রত্যেকটি সরকারি হাসপাতালে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দক্ষ প্রশাসনিক কাঠমো নিশ্চিত করা এবং কর্মচারীদের ইউনিয়ন ও সমিতির নামে রাজনৈতিক অপতৎপরতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের নিরাপত্ত নিয়েও উদ্বিগ্ন কমিশন। কমিশন বলেছে, চাপের মুখে পড়ে অনেক সময়ই উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকরা মিথ্যা মেডিকেল সার্টিফিকেট দিতে বাধ্য হন। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকরা প্রায়শই স্থানীয় জনসাধারণ হাতে লাঞ্ছিত হয়ে থাকে। এ ধরনের অনভিপ্রেত অবস্থা সার্বিকভাবে চিকিৎসকদের মাঝে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে। 

এছাড়া আইন কমিশন হাসপাতালগুলোতে বেড এর সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি, আইসিইউ ও সিসিইউর ইউনিটগুলোর সেবা সাশ্রয়ী ও জরুরি প্রাণরক্ষাকারী ওষুধ সহজলভ্য করা, প্রতিটি রোগের জন্য একটি করে বেস্ট  প্র্যাকটিস গাইডলাইন তৈরি ও তা বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করা এবং এটি ভঙ্গ করলে অপরাধ হিসাবে গণ্য করার বিধান প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই পদোন্নতি:স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই সরকারি চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তি কিংবা তদবিরের সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জরুরি বিভাগের সংকটাপন্ন রোগীদের তাত্ক্ষনিক চিকিৎসা সেবা ওই বিভাগেই প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে পর্যায়ক্রমে অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সংযুক্ত হচ্ছে। ঢাকার বাইরে জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ও সিসিইউ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। চালু করা হচ্ছে কিডনি ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডাক্তারদের পদোন্নতি আগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে হত। বর্তমানে ডিপিসি ও এসএসবির মাধ্যমে হচ্ছে। ডিপিসি হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রিত কমিটি হলেও পদোন্নতির সময় অর্থ ও জনপ্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকেন। আর এসএসবি হলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেখানে জনপ্রশাসন, অর্থসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখানে কে কোন দলের এই বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সরকারি সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে সেখানকার জরুরি বিভাগের অবস্থা কেমন হবে। জরুরি চিকিৎসা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাসমূহ সেখানে রয়েছে বলে জানান তিনি।

অধিদপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, চিকিৎসকের পদোন্নতির যে বেহাল দশা ছিলো বর্তমানে সেটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আর এই পদোন্নতির ক্ষেত্রে সকল সরকারের আমলেই কিছু চিকিৎসক তদবির সুবিধা পেয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও এই প্রথা থাকবে। এটা শুধু এ দেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বিদ্যমান।

সৌজন্যেঃ ইত্তেফাক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি