১৩ মার্চ, ২০১৭ ১০:৪২ এএম

কর সুবিধা নিলেও বন্ধ হচ্ছে না শব্দদূষণ

কর সুবিধা নিলেও বন্ধ হচ্ছে না শব্দদূষণ

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার কয়লা ও জ্বালানি তেলের তুলনায় বেশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। তবে এতে শব্দদূষণ হয় কয়লা ও জ্বালানি তেলের তুলনায় বেশি।

এজন্য গ্যাসভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অনুমোদন দেয়ার সময়ই কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, যার ভিত্তিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর রেয়াতও দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু অনুমোদন ও কর রেয়াত নেয়ার পরও এসব শর্ত পালন করা হচ্ছে না।

সাধারণত কয়লা ও জ্বালানি তেল পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে দূষণ ঘটে, তা গ্যাসের ক্ষেত্রে হয় না। তবে এতে শব্দদূষণের মাত্রা ও সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। এ কারণে শব্দদূষণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের শর্তেই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু সিলেট বিভাগের ফেঞ্চুগঞ্জ ও হবিগঞ্জের প্রায় সব ক’টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শব্দ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র ব্যবহার না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ফলে শব্দদূষণও হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। ফলে শব্দদূষণের ভোগান্তিতে দিনাতিপাত করছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। এরই মধ্যে টিকতে না পেরে এলাকা ত্যাগ করেছে অনেকেই; ছাড়ার পরিকল্পনা করছে আরো অনেকে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহূত ঘূর্ণায়মান যন্ত্রপাতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকালে অতিমাত্রায় শব্দ সৃষ্টি হয়। এসব শব্দের কারণে শ্রবণশক্তি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ, মাথাব্যথা ও  মাথাধরা বাড়তে থাকে। এ দূষণ রোধের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক জেনারেটর ব্যবহারের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন, পাম্প ও ফ্যান ঢেকে রাখতে হয় শব্দ প্রতিরোধী ড্যাম্পার দিয়ে। অত্যাধুনিক জেনারেটর এবং কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় ড্যাম্পার নির্মাণের শর্তেই সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। এজন্য এনবিআরের পক্ষ থেকে কর রেয়াতও নিয়ে থাকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু অনুমোদন পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠানই শব্দ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ড্যাম্পার নির্মাণ করে না। এছাড়া ড্যাম্পার নির্মাণের পরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারদিকে গ্রিন বেল্ট তথা সবুজ বেষ্টনী নির্মাণেরও শর্ত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই এসব শর্ত মানছে না।

তবে শব্দদূষণের জন্য শুধু বেসরকারি মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোই দায়ী বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আশপাশে শব্দদূষণ প্রায় নেই বললেই চলে। আমরাও এ বিষয়ে খুবই সতর্ক ও আন্তরিক। তবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যাতে পরিবেশনীতি ও বিধি মোতাবেক শব্দ নিয়ন্ত্রণ করে, সে বিষয়টি গুরুত্ব সহযোগে দেখা হচ্ছে।

সরেজমিন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের ২ নং মাইঝগাঁও এলাকার ভারাউট গ্রামে দেখা যায়, বর্তমানে সেখানে পিডিবির দুটি কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট রয়েছে। এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২০১ মেগাওয়াট। এর পাশেই রয়েছে এনার্জিপ্রিমা ও বরকতুল্লাহ নামে দুটি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ দুটির উৎপাদন সক্ষমতা ৯৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বরকতুল্লাহ চালু হয় ২০০৯ সালে আর এনার্জিপ্র্রিমা চালু হয় ২০১২ সালে। পিডিবির প্লান্ট দুটি আবাসিক এলাকা থেকে তুলনামূলক দূরে এবং এগুলোর ড্যাম্পারও বেশ উঁচুতে। কিন্তু ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট দুটি অবস্থিত স্থানীয় আদি বাসিন্দাদের ঘরবাড়ির একেবারে সন্নিকটে। শুধু তাই নয়, এগুলোর ড্যাম্পারও অত্যন্ত নিচু। সার্বিকভাবে এ দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মারাত্মক শব্দে প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন আশপাশের মানুষ।

স্থানীয় গৃহিণী লুত্ফা বেগমের বাড়ি বরকতুল্লাহ ও এনার্জিপ্রিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছেই। তিনি জানান, শব্দের কারণে বাসায় কথা বলা যায় না। সেলফোনে কল এলে বাসা থেকে বের হয়ে পাশে কুশিয়ারা নদীর তীরে গিয়ে কথা বলতে হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর থেকে কয়েক বছর ধরে এখানকার বাসিন্দাদের মাথাব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন লুত্ফা ও তার প্রতিবেশীরা।

স্থানীয়রা জানান, বরকতুল্লাহ পাওয়ার প্লান্টের শব্দদূষণ কমানোর জন্য ২০১১ সালের দিকে আন্দোলনেও নেমেছিলেন তারা। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছিল সে সময়। তবে তাতে কোনো কাজ হয়নি। উপায় না পেয়ে স্থানীয়দের অনেকেই পৈতৃক ভিটা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছে বলে তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন।

দূষণের কারণে এ রকম অনেকেই এখনো অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছে। এ রকমই একজন গৃহিণী কমলা বেগম জানান, যারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক তারা অনেক শক্তিশালী। আমাদের কথা তো আর তারা শুনবে না। তাই হয়তো আমাদেরও অন্যত্র চলে যেতে হবে।

এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইলেন্সার নিয়মমাফিক উঁচুতে স্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মামুন নামে স্থানীয় এক শিক্ষার্থী জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে আমাদের কথা বলা ও শোনা দুটোতেই সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাড়িতে একে অন্যের সঙ্গে জোরে কথা বলতে হয়। ফলে এলাকার বাইরে অন্য কোথাও বেড়াতে গেলেও আমাদের এখন জোরে কথা বলার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। ফলে এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় আমাদের।

শুধু ফেঞ্চুগঞ্জ নয়, একই অবস্থা বিরাজ করছে হবিগঞ্জের শাহজীবাজার এলাকাতেও। ওই এলাকার ফতেহপুর গ্রামে বর্তমানে দুটি সরকারি ও দুটি ভাড়াভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি এনার্জিপ্রিমা ও অন্যটি শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানির। ওই এলাকাতেও মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ হচ্ছে।

দিনের তুলনায় রাতে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন ফতেহপুর গ্রামের নতুন বাড়ির ঠিকাদার জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, শাহজীবাজারে বেশকিছু শিল্প-কারখানা রয়েছে। ফলে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কিছুটা কম থাকে। এ কারণে সব ক’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হয় রাতে। এ সময় দূষণও ঘটে বেশি।

জানা গেছে, শুধু ফেঞ্চুগঞ্জ ও শাহজীবাজার নয়; নরসিংদীর ঘোড়াশাল, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জসহ দেশের প্রায় সব ক’টি বেসরকারি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শব্দদূষণ নিয়ে চিন্তিত পরিবেশ অধিদপ্তর। দূষণ রোধে চলতি মাসে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী বণিক বার্তাকে বলেন, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বর্তমানে শব্দদূষণ হয় না এমন জেনারেটরের উদ্ভাবন হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহারও চলছে। এসব জেনারেটরের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সভা করব। আর শব্দদূষণকারী জেনারেটর যাতে আমদানি করা না যায়, সেটাও আমদানি নীতিমালার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সৌজন্যেঃ বণিক বার্তা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত