ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


০৯ মার্চ, ২০১৭ ১১:২৮ এএম

চিকিৎসা অভিজ্ঞতাঃ আমেরিকা ও কানাডার চিত্র

চিকিৎসা অভিজ্ঞতাঃ আমেরিকা ও কানাডার চিত্র

সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিশেষ করে ডাক্তারদের নিয়ে মিডিয়ার ব্যপক অপপ্রচারের কারণে সাধারণ মানুষ এবং ডাক্তারদের মধ্যে একটা দ্বন্ধ সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকের ধারণা বাংলাদেশের ডাক্তাররা মানসম্মত চিকিৎসা দিচ্ছেনা, অনেকের ধারণা বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি, অনেকের ধারণা বাংলাদেশের চিকিৎসকরা প্রায়শ ভুল চিকিৎসা দিচ্ছেন।

আসলে কি তাই? বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা আসলে উন্নত দেশের চিকিৎসা সেবার তুলনায় কতটুকু পিছিয়ে? বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা নিয়ে যে ঢালাও অভিযোগ তার যৌক্তিকতা আসলে কতটুকু? প্রথমেই বলে নেই, বাংলাদেশের চিকিৎসার সাথে উন্নত দেশগুলোর চিকিৎসার তুলনা করা চলেনা। এই দেশগুলোকে কল্যান রাষ্ট্র বলা হয়। নাগরিকের কল্যাণে এই দেশগুলো নিবেদিতপ্রাণ। তবে তার বিনিময়ে দেশের সরকার নাগরিকের আয় থেকে ৪০-৬০শতাংশ কেটে নেয়।

বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে যা সম্ভব নয়। এই দেশগুলোতে সব সেক্টরের মতো স্বাস্থ্য খাতও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এই দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ দূর্নীতিমুক্তও নয়,যার ছায়া স্বাস্থ্য খাতেও পড়েছে। এই দেশগুলোর ডাক্তারদের মতো একশো ভাগ প্রফেশনালও হয়ে উঠতে পারে নাই।

তাই আমেরিকা,কানাডা,জার্মানির মতো মানসম্মত চিকিৎসা বাংলাদেশে দেয়া সম্ভব নয়। কিন্ত তারপরও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা তাদের সীমিত সামর্থের মধ্যে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেই চেষ্টার একটা তুলনামুলক পরিচয় পাওয়ার জন্য এই দুটি দেশের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরলাম। লেখকদের কেউই ডাক্তার না।সুতরাং ডাক্তাররা নিজেদের ঢোল বাজাচ্ছে এরকম অভিযোগ এখানে অবান্তর

 

*************************************************
প্রথম অভিজ্ঞতা শুভ কামালের। তিনি আমেরিকায় থাকেন। Rutgers universityতে পড়াশোনা করছেন। তার ভাষায়,

'' যারা বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা নিয়া খুশি না, তাদের ছয় মাসের জন্য আমেরিকায় ট্রিটমেন্ট নিতে পাঠায়া দেয়া উচিত। তারপরে দেশে ফিরে গিয়ে তারা সকাল বিকাল ডাক্তারের পা ধোয়া পানি খাবে!
তিন চার দিন আগে কানাডায় এক বাংলাদেশি তরুণ মারা গেছে। ইমার্জেন্সীতে গিয়ে চিকিৎসা পায়নাই বলে।

আমেরিকায়ও চাইলেই আপনে ডাক্তার দেখাইতে পারবেন না। ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট নিতে হইবো মিনিমাম পনেরদিন আগে। আর ডাক্তারের চেম্বারে গিয়া বসতে হয় মিনিমাম তিন ঘন্টা। এই দেশে এপয়েনমেন্ট মানে হচ্ছে কয়টা থাইকা গিয়া অপেক্ষা করা শুরু করতে হইবো সেই সময়, অর্থাৎ আপনার যদি এগারোটায় এপয়েনমেন্ট থাকে তার মানে হচ্ছে আপনার এগারোটা থাইকা সেইখানে বইসা অপেক্ষা করা শুরু করতে হইবো! এইটা নিয়া আগেও লিখছিলাম।

এইদেশে সরকারী হাসপাতাল বইলা কোন বস্তু নাই। প্রাইভেট চেম্বারে যদি এপয়েনমেন্ট পাইতে লেইট হয় তবে কোন বিপদে হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে যাওয়া যায়। সেইখানে নরমালের চেয়ে তিনগুণ বেশী খরচ হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইমার্জেন্সীতেও রোগ ভেদে তিন চার ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয় অথচ বাংলাদেশে যেকোন হাসপাতালে ইমার্জেন্সীতে যাওয়ার প্রায় সাথে সাথেই চিকিৎসা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ একটা অসাধারণ দেশ যেখানে ফ্রি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ আছে। আমেরিকানদের যদি বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে আমার ধারণা ৮০% আমেরিকান বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালের লাইনে চার পাঁচঘন্টা হাসিমুখে দাঁড়ায়ে পরে সেবা নিবে।

ফেরার সময়ে থ্যাংকিউ থ্যাংকিউ বলে মুখে ফেনাও তুলে ফেলবে! অথচ মাগনা আর ফাও পেয়ে অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় বাঙালি এখন ডাক্তারদের ফ্যানও ছাইড়া দিতে বলে, দুইদিন পর পা টিইপা না দিলেও ডাক্তারদের মারধর করবে! অথচ বাংলাদেশে এইসব সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে শুধুমাত্র আমাদের ডাক্তারদের ত্যাগের কারনে। এই সব উন্নত দেশে লোকজন বাঁইচা গেছে অসুখ বিসুখ এইখানে কম হয় বইলা, বাংলাদেশের মত লোকজনের এত ঘন ঘন রোগ হইলে পুরা মহামারী হইয়া যাইতো!!

এক মহিলা সাংবাদিক ফেসবুকে নিয়মিত ডাক্তারদের তুলাধুনা করেন। ডাক্তারদের কেউ কেউ তাকে বদনা কবির নামে ডাকে। তার মতে বাংলাদেশের ডাক্তাররা খুব খারাপ, খুউউউব খারাপ। কোন ডাক্তারে উনারে কি করছিলো কে জানে, তিনি হয়তো আশা করেছিলেন মাগনা ট্রিটমেন্টের সাথে সাথে ডাক্তার তারে মালিশও করে দিবে! সাংবাদিকরা খুব ভাল, খুউউউউব ভালো!! খবর নিয়া দেখেন, উন্নত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের চেয়ে খারাপ হলেও সাংবাদিকতার মান আমাদের চেয়ে অনেক অনেক অনেক গুণ উন্নত। সাংবাদিকেরা কত ভাল সেইটা দুই দিন আগেই খালের কন্ঠের সাংবাদিকরা আবারও প্রমাণ দিয়েছে।

 

*******************************************
এবার কানাডার গল্প। লেখক সাইফুর এস মিশু,পেশায় সফটওয়ার প্রকোশলী। তার নিজের ভাষায় অভিজ্ঞতাঃ

''গতকাল কানাডার টরোন্টোতে মাত্র এক বছর বয়সী সন্তান রেখে শুধুমাত্র জরুরী বিভাগের অবহেলার কারণে মারা গেছে অমিত নামের এক বাঙ্গালী তরুন। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে উন্নত দেশগুলোতে। দেশ থেকে বাইরে চিকিৎসা নিতে আসা যারা উঠতে বসতে দেশের চিকিৎসকদের ধুয়ে দেন নানাভাবে তাদের বুঝা উচিত যেই অর্থ ব্যয় করে দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে যান সেই মানের চিকিৎসা দিয়েও সেই অর্থ দেশের কোন হাসপাতালে কিংবা চিকিৎসক চার্জ করলে "কসাই" উপাধী জুটবে তাদের।

যারা দেশের বাইরে থেকে প্রতিনিয়ত চিকিৎসকদের অনভিজ্ঞতার শিকার তারা মাত্রই জানেন আমাদের দেশের চিকিৎসকরা আসলেই প্রভুর পরের স্থানটি দাবী করলে একেবারেই কম হয়ে যায়। কিছু সংখ্যক অসৎ চিকিৎসকের জন্য পুরো চিকিৎসক সমাজকে যে কোন ভুলের জন্য দায়ী করা ভয়াবহ রকমের জানার সীমাবদ্ধতা। একজন মানুষ এক দিনে কয়জন মানুষের সাথে হেসে কথা বলতে পারে? একজন স্বাভাবিক মানুষ একদিনে কত ঘন্টা কাজ করতে পারে? একজন চিকিৎসকের রোগী দেখা কিংবা চিকিৎসার বাইরেও নিজের একটি জীবন থাকে।

সেই জীবনে তাকে আমার আপনার মতই সমাজ, পরিবার সবকিছু মেন্টেন করে চলতে হয়। তার সেই জীবনেও আমাদের অন্যদের মত থাকে হাসি কান্নার পেছনে অসংখ্য কারণ। অথচ, কোন কারণে যদি একজন চিকিৎসক একদিন রোগী দেখতে অপারগতা প্রকাশ করেন, হতে পারে তিনি সেদিন মানসিকভাবে রোগী দেখার অবস্থায় নেই; এই আমি আপনিই নানা রকমের কথা বলবো তার চেম্বারে যেয়ে ফিরে আসলে।

কিংবা কোন চিকিৎসক যদি ঠিক করেন কিংবা উন্নত দেশগুলোর মত সরকারীভাবে যদি এমন নির্দেশ আসে একজন চিকিৎসক একদিনে সর্বোচ্চ একটি নির্দিষ্ঠ সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিবেন। তাতে আমাদের মত ঘনবসতির দেশে প্রতিদিন কতজন শুধুমাত্র চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু বরণ করবে তা অনুমান করারো সাহস করছি না।

বলছি না, আমাদের দেশ অসাধু চিকিৎসক নেই। অবশ্যই আছে। কতিপয় অসাধু এবং ব্যবসায়ী মানসিকতার চিকিৎসক অবশ্যই আছে, যাদের কারণে ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ রোগীরা। তাই বলে পুরো চিকিৎসক সমাজকে তার জন্য দায়ী করা খুবই অনুচিত। এই আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি, তারাও নানা রকম চিকিৎসার জন্য দেশের চিকিৎসকদের দ্বারস্ত হই একাধিক কারণে। তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, ঐ খরচে এত যত্ন নিয়ে চিকিৎসা আমরা পাইনা এসব দেশে।

অনেকেই হয়তো বেশ অখুশী হবেন, তবে কথাগুলোর বাস্তবতা উপলব্ধি করবেন খুব ভালভাবেই, যারা প্রবাসে এসব সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন''।

 

*********************************************
এই অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করা মানে, আমি এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছিনা যে, বাংলাদেশের চিকিৎসা আমেরিকা, কানাডার চাইতে উন্নত। এই অভিজ্ঞতাগুলোতে নিশ্চয়ই জেনারেলাইজেশান আছে। অনেকের নিশ্চয় খুবই ভালো অভিজ্ঞতাও আছে। অনেকেই হয়তো খুবই সন্তষ্ট। কিন্ত এই অভিজ্ঞতাগুলো অবশ্যই দাবী করে, নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও দেশের কসাই খ্যাত প্রাণীগুলো আরেকটু ভালোবাসা আশা করে। আমাদের ডাক্তারদের অবশ্যই অনেক সংশোধন জরুরী। কিন্তু আপনারা যারা সাধারণ মানুষ তাদেরও আরেকটু সুবিবেচনা আশা করা যায়।

দাবি পেশাজীবী সংগঠনের, রিট পিটিশন দায়ের

‘বেসরকারি মেডিকেলের ৮২ ভাগের বোনাস ও ৬১ ভাগের বেতন হয়নি’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না