ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


০৮ মার্চ, ২০১৭ ০১:৪০ পিএম

'নারী চিকিৎসকরা নারী হয়ে উঠতে পারেন নাই'

'নারী চিকিৎসকরা নারী হয়ে উঠতে পারেন নাই'

সকালে দৈনিক পত্রিকার ক্রোড়পত্র মনে করিয়ে দিলো আজ বিশ্ব নারী দিবস। বড় বড় কলামে নারীদের বিজয়গাঁথা লেখা হয়েছে। অদম্য, কীর্তিমান নারীদের গল্প ছাপা হয়েছে। পড়ে ভালো লাগলো। নানা সময় আমরা যতই ট্রলারডুবি করিনা কেনো, আসল বাস্তবতা হচ্ছে, নারীদের জন্য একটা সুন্দর, বৈষম্যহীন সমাজ আমরা আজও উপহার দিতে পারি নাই।

আমাদের পরিবারগুলোতে আমরা এখনো নারীদের উপযুক্ত সন্মান দিতে পারিনি। এখনো বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের মায়েরা নিয়মিত শারীরিক, মানষিক নির্যাতনের শিকার হন। অশিক্ষিত লোকজনের কথা বাদ দিলাম; শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, রাবীন্দ্রিক স্বামীরাও এই নির্যাতনে পিছিয়ে নাই। আর কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজ করার পরিবেশ খুবই শোচনীয়।

এতো সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে যেসব নারী সফল হন, তাদের বিজয়ের কাহিনীগুলো সবার জন্যই প্রেরণাদায়ক। পত্রিকাগুলো শ্রেণীবদ্ধ করে সবার সফলতার কাহিনী লিখেছে। নারী পুলিশ অফিসার, নারী মডেল, নারী উদ্যোক্তা, নারী ক্রীড়াবিদ, নারী আমলা, নারী কুটনৈতিক। সবার সুন্দর কাহিনী আর এ পথে চলতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার কথা আছে। শুধু নারী চিকিৎসকের কথা নাই। উল্লেখ নাই একজন নারী চিকিৎসক কতটা বাধা বিপত্তি নিয়ে তার প্রতিদিনকার পথ চলেন। এতে অবাক হই নাই।

কারণ এতদিনে আমরা বুঝে গেছি, নারী চিকিৎসক তার পেশার কারণে আমাদের সুশীল সমাজ, নারীবাদী আর আলোকিত সমাজ গড়ার কারিগর প্রথম আলোর চোখে ঠিক নারী হয়ে উঠতে পারেন নাই। তাই নারী চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রের সমস্যা, তাদের নিগৃহীত হওয়া, তাদের প্রতিদিনকার দুঃখ যন্ত্রণার রোজনামচা আমাদের নারী অধিকার কর্মীদের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারেনা কখনোই। এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাড়িয়ে আমার মনে পড়ে ডা.সাজিয়া আফরিন ইভার কথা। ডিউটিরত অবস্থায় ক্লিনিকের ওয়ার্ডবয় যাকে ধর্ষণ চেষ্টার পর হত্যা করে। কোনো নারীবাদী সংগঠনের শক্ত কোনো পদক্ষেপের কথা মনে পড়েনা।

ডা. শম্পা রানীকে হাসপাতালের ভিতরেই এলাকার প্রভাবশালী নেতা চুলের মুঠি ধরে নিচে ফেলে লাথিতে লাথিতে শম্পা রানীর ডাক্তার জন্মের অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। শম্পা রানীর পাশে দাড়ানো কোনো বড় টিপধারী নারীবাদী বা সুশীল সমাজের কথা মনে পড়ছেনা। বরং শম্পা রানীকে জেলে যেতে হয়েছিলো দুশ্চরিত্রা অপবাদ নিয়ে। কোনো পত্রিকা এটা নিয়ে এক্সক্লুসিভ নিউজ করে নাই। ডাক্তাররা কয়েক দিন কর্মবিরতি করে রোগীর দুর্ভোগের অপবাদ পেয়ে ঘরে ফিরেছেন।

বারডেমে নারী চিকিৎসককে বেসিনের আয়নায় থেঁতলে দেন এসপি মাসুদ। বাংলনিউজ শিরোনাম করে, অভিযোগ থেকে বাচঁতে ডাক্তারদের নাটক। ঢাকা মেডিকেলের ইন্টার্ন ডাক্তার কাঁকনের হাত কেটে যায় রোগীর আত্মীয়ের আঘাতে। তার সহকর্মীরা শহীদ মিনারে গিয়ে দাড়িয়ে থাকলো কয়েকদিন। সুলতানা কামাল কিংবা খুশি কবির কারো দেখা মেলে নাই। বগুড়ায় ইন্টার্ণ চিকিৎসক নাজের সাথে অশোভন আচরণের প্রতিবাদের পর সহকর্মীসহ নাজ নিজেই বহিষ্কৃত হন, কোনো নারীবাদী একবারো জিজ্ঞেস করে নাই, মেয়েটাতো মারামারি করে নাই, বরং তার সাথে অশোভন আচরণ করা হয়েছে, সে কেনো বহিষ্কার হবে।

এভাবে প্রতিদিন নারী চিকিৎসকরা কোথাও না কোথাও ঝামেলার মুখোমুখী হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে নিগৃহীত হচ্ছে, আমাদের মিডিয়া কিংবা নারী অধিকার কর্মী কারো মুখে কোনো প্রতিবাদ বা সহানুভূতি আমরা দেখিনা। ন্যুনতম নিরাপত্তা ছাড়া একজন নারী চিকিৎসক প্রত্যন্ত গ্রামে পোস্টিং পেয়ে কী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী খবর বের হয় না। অথচ নারী চিকিৎসকদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ এবং এটার জন্য পার্সোনাল স্যাক্রিফাইস যে কোনো পেশার তুলনায় অনেক বেশী।

ক্যারিয়ার আর পরিবার - এই দ্বৈরথে পড়ে কী যন্ত্রণার জীবন তারা অতিবাহিত করেন। তাদের কারও সন্তানই তাদের হাতে বড় হতে পারেনা। দাদী,নানী, কাজের বুয়ার হাতে বড় হয় অধিকাংশ নারী ডাক্তারের সন্তান।ডেভিডসন-নেলসন -জেফকট কখনোই তাদেরকে তাদের সোনামণিদের বর্ণশিক্ষার দায়িত্ব পালন করতে দেয়না।এদের হাত ধরেই আজ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর অধিকারী। আজকের নারী দিবসে এই আনসাং হিরোইনদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তাদের জন্য ভালোবাসা। পরম করুণাময় তাদের জীবনকে করুণাধারায় সিক্ত করুক।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত