ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


০৫ মার্চ, ২০১৭ ০১:২৩ পিএম

চিকিৎসকদের জন্যেও কি সব সমাধান তবে রাজপথেই?

চিকিৎসকদের জন্যেও কি সব সমাধান তবে রাজপথেই?

স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বড় বড় কথাবার্তা বলা আমাকে মানায় না। সবেমাত্র এই অঙ্গনের একজন নবীন সদস্য হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি। এর মধ্যেই উচিত ঔনুচিত্যের ব্যাপারে খুব বেশী কিছু বলতে যাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই প্রগলভতা বলে মনে হতে পারে। তাছাড়া এই খাতের সব ক্ষেত্রের সাথে আমার এখনও মিথষ্ক্রিয়ার সুযোগ ঘটেনি। তাই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নাও হতে পারে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো যেই দুর্নীতি ও সুবিধাবাদীতার বিরুদ্ধে এতো চিৎকার চেঁচামেচি করছি সেই দুর্নীতির আহবান যদি আমার কাছে আসে তাহলে ঠিক কতোটুকু পর্যন্ত আমি সৎ থাকতে পারবো তার নিশ্চয়তা এখনও দিতে পারছি না। হয়তো দশ-বিশ হাজার থেকে দশ-বিশ লাখ টাকার আহবান আসা পর্যন্ত আমি সৎ কিন্তু যদি টাকার সংখ্যাটা কোটির ঘরে পৌছায় তাহলে?

খুব কষ্ট পাই যখন দেখি বেশকিছু অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর সিন্দাবাদের ভূতের মতো এই সিস্টেমের উপর চেপে আছে যেগুলো আমাদের কর্তাব্যক্তিরা একটু আন্তরিকভাবে চাইলেই সমাধান করে ফেলতে পারেন; অথচ এই সমস্যাগুলোই আমাদের মতো তরুণ চিকিৎসকদের সৎ থাকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে এবং গভীর মমত্ববোধ নিয়ে জনগণের চিকিৎসার জন্য নিজেদেরকে যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বাধা দিচ্ছে তখন আর চুপ করে থাকতে পারি না। মনে হয় এই স্বাস্থ্যখাত ভীষণ অভিভাবকত্বহীনতায় ভুগছে। যাদের কথা ছিল আমাদের অধিকার ও করণীয়গুলো ঠিক করে দিয়ে স্বস্তি ও সম্মানের সাথে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেয়ার তারা কেন যেন অবাক করা উদাসীনতায় চুপ করে আছেন।

আমাদের যা প্রয়োজন তা অর্জন করে নেয়ার দায়িত্বটুকুও যেন আমাদের কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই ভাবি যতটুকু জোর আছে এই কণ্ঠস্বরে ঠিক ততোটুকু দিয়েই এসবের প্রতিবাদ করে যাবো। আমাদের ক্ষীণকন্ঠের এই চিৎকারে রাষ্ট্রযন্ত্রের হর্তাকর্তাদের কিছু এসে না যাক তবু আমাদের পিতৃসম অভিভাবকদের কুম্ভকর্ণের ঘুম যদি ভাঙ্গে তবেই আমরা স্বার্থক। খুব মজার ব্যাপার হলো আমাদের চিকিৎসকদের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশী উচ্চকন্ঠ থাকে তরুন চিকিৎসকরা কিন্তু তাদের তেমন কোনো ক্ষমতা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে যারা চাইলেই অঙ্গুলি হেলনে অনেক কিছু করে ফেলতে পারেন তারা কেন যেন চাইতেই আগ্রহী নন! তারা কি কখনো তরুন ছিলেন না? তাদেরকেও একই রকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়নি? তবে আজ তারা কেন সেই অতীত ভুলে বসে আছেন? নাকি তাদের অধিকারবোধ তৎকালিন সময়ের বয়জেষ্ঠদের উদাসীনতায় মরে গেছে?

দিনদিন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট চিকিৎসকদের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠছে। নিন্মমুখী হচ্ছে জনসাধারণের শ্রদ্ধাবোধের গ্রাফ। ফলাফল হিসেবে চিকিৎসকরা ক্রমেই ‘দ্বিতীয় ইশ্বর’ থেকে অভিজাত শ্রমিকে পরিনত হচ্ছেন। চিকিৎসক সমাজ রাজনীতি, বিশ্বাস, চিন্তায় শতধাবিভক্ত হতে হতে এতটাই দুর্বল অবস্থায় গিয়ে পৌছেছে যে নিজেদের একান্ত প্রয়োজনেও এক হওয়া অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। এই দুর্বলতার ফায়দা লুটছে সবাই। প্রশাসনযন্ত্রকেও চিকিৎসকদের উপর অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে তেমন সাত পাঁচ ভাবতে হচ্ছে না। কেউ যদি কোনো চিকিৎসকের সাথে অন্যায় কিছু করেও থাকে তাহলেও উক্ত চিকিৎসককেই মাথা নিচু করে চলে আসতে হয় কারণ আমাদের দেশের একজন চিকিৎসক একশো জনের সমান হলেও একশো জন চিকিৎসক কখনো এক হতে পারেন না। ফলে বরাবরই চিকিৎসকদের অধিকার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

চিকিৎসক সমাজ বরাবরই শান্তিপ্রিয় এবং বলতে গেলে সমাজের অনেকাংশেই নিরীহ একটি অংশ। যারা মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতেই বেশী পছন্দ করেন। মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে দিনরাত তারা পরিশ্রম করতে বেশী ভালবাসেন। এই নির্বিরোধী পেশার সদস্যদেরকে এভাবে দেখেই সাধারণ জনগন অভ্যস্ত। তাদের মান আছে, বিত্ত-বৈভবও আছে কিছুটা কিন্তু ক্ষমতা নেই বললেই চলে। অবশ্য এর জন্য কেউ লালায়িতও নয়। কিন্তু সম্প্রতি খুব ঘনঘনই তাদের অধিকার গুলোর উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে নিজেদের ন্যায্য অধিকারগুলো আদায়ে এই নির্বিরোধী চিকিৎসক সমাজ বারবার রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকবার চিকিৎসকদেরকে রাজপথে নামতে হয়েছে। যদিও এই আন্দোলনরতদের মাঝে প্রবীণদের উপস্থিতি শূণ্যের কোঠায় ছিল। ফলাফলে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ ঘটেনি বেশীরভাগ সময়ে। অভিভাবক শূণ্যতার বোধ তীব্র হয়েছে তরুণদের মাঝে।

যদি বর্তমান থেকে একটু অতীতের দিকে যাই তাহলে দেখা যায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এর প্রতিবাদে আন্দোলন, টিউশন ফি তে ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ক্যারি অন নিয়ে আন্দোলন, শিক্ষানবীশ চিকিৎসকদের বেতন বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন, ডাঃ মিম এর সাথে সাবেক সাংসদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলন, কিছুদিন আগে গোপালগঞ্জে ডাঃ পবিত্র কুণ্ডুকে শারীরিক ভাবে গুরুতর আহত করার প্রতিবাদে আন্দোলন, অনারারী চিকিৎসকদের অধিকার আদায়ের দাবীতে আন্দোলন প্রভৃতি অনুষঙ্গে রাজপথেই কাটাতে হয়েছে শত কর্মঘন্টা। বাস্তবিক অর্থেই এর ফলে চিকিৎসা সেবা প্রদান বাধাগ্রস্থ হয়েছে, মেডিকেল শিক্ষার্থী, ট্রেইনিদের অধ্যয়নের ক্ষতি হওয়া সহ নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

যখনই চিকিৎসকেরা রাজপথে নামেন স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য কর্মসূচীর পাশাপাশি বাধ্য হয়েই ধর্মঘট, কর্মবিরতিও ডাকা হয়ে থাকে। এতে বেড়ে যায় হাজারো অসুস্থ মানুষদের ভোগান্তি। পাশাপাশি জনগনের মনে চিকিৎসকদের সম্পর্কে ভুল ধারনার সৃষ্টি হয়। ফলাফলে বেড়ে যায় রোগী এবং চিকিৎসকদের মধ্যবর্তী দূরত্ব। অস্থির হয়ে ওঠে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অথচ নিয়মিত হাসপাতাল, লাইব্রেরী, চেম্বার, ক্লাস করা চিকিৎসকদের জন্য নিশ্চয়ই রাজপথের রোদে বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলন করা খুব সুখের কিছু নয়! তবুও কেন নামতে হচ্ছে তাদেরকে? যে দাবিগুলো নিয়ে তারা এ যাবতকালে আন্দোলনে নেমেছেন তার কোনোটা কি খুব অযৌক্তিক কিছু ছিলো? মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা কি চাইলেই চিকিৎসক নেতাদের সাথে বসে এই বিষয়গুলোর যৌক্তিক সমাধান করতে পারতেন না? উদ্ভুত সম্যস্যাগুলোর সমাধানে কি কোনো ‘ভদ্রস্থ’ উপায় নেই? যদি না থেকে থাকে তবে কেন নেই? কেন চিকিৎসক সমাজকে প্রশাসনের ওপর আস্থাহীনতার কারণে বারবারই রাজপথকে বেছে নিতে হচ্ছে? কেন বারবার প্রশাসন ও চিকিৎসক সমাজকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করানো হচ্ছে? চিকিৎসদেরকেও কি শ্রমিক আন্দোলনের মতো রাজপথ কাঁপিয়ে অধিকার আদায় করতে হবে? প্রশাসনের কাজ কী তাহলে?

অভ্যন্তরিন নানা আড্ডায় চিকিৎসকদের মুখ থেকে একটি কথা শুনতে শুনতে হতাশ হয়ে গেছি, তারা নাকি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মতই নির্বাচনের আগেই শুধু আমাদের অধিকার আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। পরবর্তীতে কাজ হচ্ছে শুধু চাটুকারিতা করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়া। তাহলে পেশাজীবী রাজনীতির সাথে মেঠো রাজনীতির পার্থক্য থাকল কোথায়?

চিকিৎসকরা এর আগেও বহুবার রাজপথে নেমেছেন। তবে নেমেছেন মূলত দেশ ও জাতির স্বার্থে। দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক হোস্টেল ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় অংশ। তার স্মৃতিস্মারক হিসেবেই শহীদ মিনার স্বগর্বে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণ ঘেষে। সত্তরের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনেও সমাজ সচেতন এই চিকিৎসকরা ছিলেন বরাবরের মতোই সোচ্চার, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলিম চৌধুরী প্রমুখেরা হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষুর কাছে হার মানেননি। নব্বইয়ের দশকে ডা. মিলনের বুকের তাজা রক্ত ত্বরান্বিত করেছে স্বৈরাচারের পতন। যখনই দেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন এসেছে তখন সচেতন নাগরিক হিসেবে চিকিৎসকরাও কখনও পিছিয়ে থাকেন নি, ভবিষ্যতেও থাকবেন না অবশ্যই। কিন্তু তাই বলে বারবার তাদেরকে ছোটখাট ইস্যুতেও তাদের দাবির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না জানিয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা কতটা যৌক্তিক?

চিকিৎসকরা কি চায়? তারা চায় নিরাপদ কর্মস্থল, উচ্চ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার সুযোগ সম্মানজনক সামাজিক ও প্রশাসনিক অবস্থান, সর্বোপরি দায়িত্ব ও অধিকারের যৌক্তিক ভারসাম্য। এগুলোর কোনোটা কি আদৌ অযৌক্তিক? অবশ্যই না। তাই আন্তরিকতা থাকলে সমাধানের পথ খোঁজাও কঠিন কিছু নয়। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন এদেশের চিকিৎসক সমাজের আশা ভরসার কেন্দ্র। রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপরে পেশাগত প্রয়োজনকে অবস্থান দিয়ে এই মহার্ঘ প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার সময়ের দাবি।

সরকার ও চিকিৎসক সমাজের পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য সর্বজন স্বীকৃত একটি ‘বাফার কমিটি’ থাকা উচিৎ যারা যৌক্তিক আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট, পদায়ন, শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্র্কিত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণে সহায়তা করবেন এবং চিকিৎসকদের অধিকার বাস্তবায়ন ও পেশাগত শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। এর বাইরেও আর কি কি শান্তিপূর্ন সমাধানের পথ থাকতে পারে তাও খুঁজে দেখা দরকার। দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে স্বাস্থ্যখাতের মত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের উন্নয়নের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রশাসন ও চিকিৎসক সমাজকে পারস্পরিক প্রতিপক্ষ নয় বরং সহযোগী হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে তাই সবার আচরণেই আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ থাকা জরুরী।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত