ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০৪:০৪ পিএম

ফার্মেসি ব্যবসায়ীর 'হাতের যশ'

ফার্মেসি ব্যবসায়ীর 'হাতের যশ'

ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে যে ডাক্তার রোগীকে প্রয়োজনের বাইরে পরীক্ষা করতে দেন না এবং প্রয়োজনের বাইরে ওষুধ লেখেন না , সে ডাক্তারের কাছে রোগীকে যেতে দেয় না ক্লিনিক মালিক আর ফারমেসিওয়ালারা! এক্ষেত্রে অনেক ক্লিনিক মালিক বরং একজন ফার্মেসিওয়ালা বা কোন হাসপাতালের প্রাক্তন কোন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে ডাক্তার হিসেবে দেখিয়ে রোগীদের টাকা লুট করে।

ফার্মেসিতে ওষুধের ব্যবসা করা একটি সৌখীন পেশা। কিন্তু বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ফার্মেসিওয়ালারা চিকিৎসা খাতকে কলুষিত করে রেখেছে। ফার্মেসিওয়ালা আর কবিরাজের দৌরাত্মে গ্রাম এলাকার মানুষের অপচিকিৎসার প্রবনতা দিনে দিনে বাড়তেছে ! গ্রামে সরকারি এবং প্রাইভেট উভয় ক্ষেত্রেই ডাক্তারের চিকিৎসায় ফার্মেসিওয়ালা আর কবিরাজের হস্তক্ষেপ হয়।

উপজেলায় কর্মরত ডাক্তার এবং গ্রামের রোগীরা ফার্মেসিওয়ালা, ক্লিনিক মালিক আর কবিরাজের কাছে জিম্মি। অনেক সময় দেখা যায়, একজন রোগী যখন এমবিবিএস ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষুধ কেনার জন্য ফার্মেসিতে যায়, তখন কোন কোন ফার্মেসিওয়ালা রোগীকে নিজের খেয়াল খুশিমত এমন ওষুধ দেয় যার সাথে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের কোন সম্পর্কই নেই! তিন চার দিন পর যখন রোগীর সমস্যা আরো বাড়তে থাকে তখন রোগী ডাক্তারকে দোষারোপ করতে থাকে!

কিছু কিছু ফার্মেসিওয়ালা মনে করে এটা তার এলাকা! সে রোগীকে যা ইচ্ছা তা ই ধরিয়ে দিবে ! ডাক্তারের চাইতে সে নিজেই বরং আরো ভালো ডাক্তারি জানে ! অন্যদিকে ডাক্তারেরও কিছু করার থাকে না । অভিযোগ করেও ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে ! ফার্মেসিওয়ালা এলোপাতাড়ি কথা বলে চলে যাবে। ডাক্তার না পারেন কিছু কইতে না পারেন সইতে। ' রিএকশন' শব্দটা আমাদের দেশে রোগীদের অনেকের খুব প্রিয় একটা শব্দ।

দেখা যায়, ডাক্তার রোগীকে সাত দিনের ওষুধ দিলে ২ দিন পর পান থেকে চুন খসলেই ফার্মেসিওয়ালা রোগীকে বলে, এমবিবিএস ডাক্তারের চিকিৎসায় আপনার শরীরে রিএকশন হয়েছে । রোগী ফার্মেসিওয়ালার কথাই বিশ্বাস করে ! যেমন ডেঙ্গু জ্বর হলে, শুরু থেকে ষষ্ঠ-সপ্তম দিনে রোগীর শরীরের চামড়ায় স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের দাগ উঠতে পারে।

এমন সময় রোগী কোনক্রমে একবার ফার্মেসিওয়ালার মুখোমুখী হলে ফার্মেসিওয়ালা রোগীকে বলে, "ডাক্তারের চিকিৎসায় আপনার শরীরে রিএকশন হয়ে দাগ উঠেছে"। ফলে মাঝপথেই চিকিৎসায় হস্তক্ষেপ হওয়ার কারনে অপচিকিৎসা হয় এবং রোগ জটিল হতে থাকে। একদিকে অপচিকিৎসা অন্যদিকে ডাক্তারের বদনাম !

গ্রামে ঘর থেকে বের হলেই রোগীর সামনে থাকে ফার্মেসিওয়ালা ! অধিকাংশ রোগীই ডাক্তার আর ফার্মেসিওয়ালার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে বলে মনে করে না। উভয়কেই তারা সমানভাবে ডাক্তার বলে মনে করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের অনেক রোগী ফার্মেসিওয়ালার কথায় এমবিবিএস ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের ভালো- মন্দ যাচাই করে! ফার্মেসিওয়ালার এ ধরনের দৌরাত্মের কারনে ডাক্তারের চোখের সামনেই রোগীর অপচিকিৎসা হয়। কিছুই করার থাকে না ডাক্তারের।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে অনেকে 'ডাক্তার' শব্দটার প্রকৃত অর্থই বুঝে না ! এক জন এমবিবিএস ডাক্তার যখন একজন রোগীকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি ফার্মেসিওয়ালা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে সময় আর টাকা নষ্ট করলেন কেন? তখন অনেক রোগী উত্তর দেয় , "আপনারাও ডাক্তার, ওনারাও ডাক্তার, আপনারাও মানুষ ওনারাও মানুষ , আপনারা খালি খালি ওনাদের সাথে হিংসা করেন কেন"?

ব্যথা হলে এই ওষুধ আর পাতলা পায়খানা হলে ওই ওষুধ দিতে হয়, এটা ডাক্তারি নয়। বরং ডাক্তারি হচ্ছে কোন রোগীকে কোন অবস্থায় কোন ওষুধ দেয়া যাবে না এবং কেন দেয়া যাবে না । একই রোগীকে কোন দুটি ওষুধ এক সাথে দেয়া যাবে না ! চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এমবিবিএস ডাক্তার সব সময় চেস্টা করেন রোগীকে সবচেয়ে কম ক্ষমতার ওষুধ সবচেয়ে কম ডোজে সব চেয়ে কম মেয়াদে দিতে।

যেন, এক রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগীর অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি না হয় বা অন্য কোন রোগ সৃষ্টি না হয়। এতে করে কাজ না হলে পরে তিনি ক্রমান্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু ফার্মেসিওয়ালা ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেসেন্টেটিভদের মুখ থেকে হাতে গোনা কিছু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধের নাম মুখস্থ করে নিজের কথিত 'হাতের যোশ' দেখানোর জন্য এবং নিজেকে এমবিবিএস ডাক্তারের চাইতেও অনেক বড় ডাক্তার প্রমান করার জন্য শুরুতেই রোগীকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একাধিক ওষুধ দেয় !

কেউ যদি দেখেন , আপনার রোগ বা ব্যথা বা যে কোন স্বাস্থ্য সমস্যা এমবিবিএস ডাক্তারের চিকিৎসায় ভালো হতে দেরি হচ্ছে, কিন্তু কোন এক ফার্মেসিওয়ালার দেয়া ওষুধে দ্রুত সেরে গেছে; তাহলে বুঝে নেবেন আপনি কোন না কোন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যা এ মুহূর্তে বুঝা যাচ্ছে না, কিন্তু ফার্মেসিওয়ালার এই কথিত 'হাতের যোশ' এর কারনে পরে আপনি কোন এক সময় আরো বড় স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবেন । দীর্ঘ সময় ধরে তিলে তিলে কিডনী নষ্ট হওয়ার একটি কারন হচ্ছে যখন তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যাথার ওষুধ গ্রহণ করা।

বাস্তবতা হচ্ছে উভয় কিডনী প্রায় সম্পূর্ণ নস্ট না হওয়া পর্যন্ত বাহিরে থেকে কোন সমস্যা দেখা দেয় না। অনেক মাধ্যমিক / উচ্চ মাধ্যমিক পাস যুবককে দেখেছি এক উপজেলার লোক হয়ে অন্য উপজেলাতে গিয়ে কোন এক ফার্মেসিওয়ালার থেকে ব্যাথার চিকিৎসা নিতে। আফসোস ! তারা কেমন করে মনে করতে পারে যে, একজন ফার্মেসিওয়ালা একজন এমবিবিএস পাস ডাক্তারের চাইতে ভালো চিকিৎসা জানে ! তারা কি মনে করে এসব ওষুধের নাম পরিচয় এমবিবিএস ডাক্তারেরা জানে না ? উচ্চ মাধ্যমিক পাস শিক্ষিত যুবক এমন কুসংস্কারে ডুবে থাকলে মূর্খ লোকেরা কি করবে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক রোগীকে একই সময়ে একটির বেশি ব্যাথানাশক ওষুধ (NSAID) দিতে নিষেধ করা হয়েছে , কারন তা করলে কিডনী , পাকস্থলী এবং হৃদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে ! এমন কি সেটা রোগীর মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু দেখা যায় অনেক ফার্মেসিওয়ালা নিজের 'হাতের যোশ' দেখানোর জন্য এক রোগীকে একই সময়ে ইনজেকশন সহ মোট চারটি উচ্চ ক্ষমতার ব্যথার ওষুধ দিয়েছে ! এতে তাড়াতাড়ি ব্যাথা সেরে ফার্মেসিওয়ালার খুব সুনাম হয়। সবাই বলতে থাকে এই ফার্মেসিওয়ালার 'হাতের যোশ' খুব ভালো! কিন্তু রোগীর কিডনী, পাক্সথলী আর হৃদযন্ত্রের কটটুকু ক্ষতি হয়েছে তা ফার্মেসিওয়ালা আর ওই রোগী কেউ জানে না ।

লেখকঃ স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষনরত চিকিৎসক , ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল , ঢাকা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত