ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১৪:১৪

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা

অনেকেই ডাক্তারের সাথে আচরন করতে নিজের ক্ষমতা বা পদবীর অপব্যাবহার করতেছে! সরকারি হাসপাতালে যা কিছু সুযোগ সুবিধা আছে, কর্তব্যরত ডাক্তার সেখানে তার চাইতে বেশি কিছু ব্যবস্থা করবেন কিভাবে? ডাক্তারের অবহেলার সংজ্ঞা কি? অবহেলা কত প্রকার ও কি কি ? অবহেলা পরিমাপের মাপকাঠি কি?

একটি বাস্তব ঘটনার কথা বলি। ২০০৯ সালের কথা। ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগী একদিন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন বুকে ব্যথা নিয়ে। উপস্থিত ডাক্তার দ্রুত তার ইসিজি এবং বুকের এক্সরে করিয়ে দেখলেন সেগুলো স্বাভাবিক । এমতাবস্থায় তিনি নিয়ম অনুযায়ী রোগীর জন্য অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহনের পাশাপাশি তাকে পেপটিক আলসারের ইনজেকশন এবং মুখে খাওয়ার ওষুধ দিলেন।

এমতাবস্থায় ডাক্তার রোগীকে জিজ্ঞাসা করলেন, "এখন ব্যথা কেমন?" রোগী উত্তর দিলেন, একটু কমেছে। তারপর ডাক্তার ওই রোগীর জরুরী কাগজপত্র লিখতে লিখতে আনুমানিক ২৫ মিনিটের সময় রোগী অভিযোগ করতে শুরু করলো , "আমার জন্য এখনো কিছুই করলেন না!" এই হচ্ছে আমাদের রোগীদের অভিযোগের ধরন! উল্লেখ্য যে, শুরু থেকে ওই ২৫ মিনিট সময় ডাক্তার শুধু ওই রোগীকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।

অর্থাৎ এই রোগীর বুকের ব্যথা পুরোপুরি না কমা পর্যন্ত তার জন্য যত কিছুই করা হোক না কেন, সে সবকিছু অস্বীকার করতেছে এবং করবে। সে মনে করে, হাসপাতালে সে ই একমাত্র রোগী, ডাক্তারেরা সবাই এসে তাকে কোলে করে নিয়ে সবকিছু মুখে খাইয়ে দিবে আর সাথে সাথেই বুক ব্যথা কমে যাবে !

এভাবেই রোগীরা ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে! তারা অনেকেই নিজেরা বাড়িতে ছিঁড়া কাঁথায় ঘুমায়, আর ৬০০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে ১৮০০ জন ভর্তি হয়ে নিজেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে প্রত্যেকেই সার্বক্ষণিকভাবে একজন অধ্যাপককে নিজের সেবক হিসেবে পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে চায়! সেটা না হলে তারা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে , গণমাধ্যমে প্রচার হতে থাকে- সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারেরা রোগীর চিকিৎসায় অবহেলা করতেছেন!

সরকারি হাসপাতালে যদি দুধের সরবরাহ না থাকে তাহলে যে কোন রোগী দই দাবি করে না পেলে সেটাকে ডাক্তারের অবহেলা বলা যায় কিভাবে? বরং এ ধরনের আচরন অত্যন্ত নিন্দনীয় । নিজের এক সন্তানকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করাতে না পারলেও রোগী চায় একজন প্রফেসর সারাক্ষণ তার বিছানার পাশে দাঁড়ানো থাকুক, আর সেটা না হলে তারা মনে করে ডাক্তারেরা তার চিকিৎসায় অবহেলা করতেছে !

তারা অনেক সময় সরকারি হাসপাতালের পরিবেশে নিজেরা নাকে রুমাল দেয় , কিন্তু কখনোই চিন্তা করে দেখে না , এ ধরনের পরিবেশে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সর্বোচ্চ শিক্ষিত ডাক্তারেরা কিভাবে তাদেরকে চিকিৎসা দিতেছে! কবি বলেন, "দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া"।

যে কোন রোগী সরকারি হাসপাতালে এসে ডাক্তারের কাছে নিজের খেয়াল খুশিমত যা ইচ্ছা তা দাবি করতেছে, আর না পেলে সেটাকে ডাক্তারের অবহেলা বলে অভিযোগ করতেছে! যখন- তখন, যেখানে- সেখানে , যে কেউ চাইলেই ডাক্তারের বিরুদ্ধে 'অবহেলা'র অভিযোগ করা একটি ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে ! সমাজের খলনায়ক লোকটি রোগীর সাথে হাসপাতালে এসে ডাক্তারের বিরুদ্ধে 'অবহেলা' বা 'ভুল চিকিৎসা'র অভিযোগ তুলে ডাক্তারকে লাঞ্ছিত করে নায়ক সাজতেছে ! ডাক্তারের সাথে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হচ্ছে।

ফলে চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পরছেন। কারন, যে কোন মুহূর্তে যে কোন ডাক্তারের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হচ্ছে। দুর্বৃত্ত লোকেরা নিজের দুর্বৃত্তপনা চাষ করার জন্য ডাক্তারের পিঠকে জমি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইতেছে! আইনে যদি প্রমানিত হওয়ার আগেই অবহেলার অভিযোগে ডাক্তারকে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির ব্যবস্থা থাকে , তাহলে জাতির স্বার্থেই সে আইন দ্রুত পরিবর্তন করা উচিত ।

একমাত্র অভিযোগ প্রমানিত হওয়ার পরেই ডাক্তার উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করবেন। ডাক্তারেরা সরকারি হাসপাতালের সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্যে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ডাক্তারি করেন। তারা জানেন , রোগীরা কোন কোন ব্যাপারগুলিকে 'ডাক্তারের অবহেলা' বলে অভিযোগ করে। রোগীরা ডাক্তারের বিরুদ্ধে যতটি অভিযোগ করে তার ৯৯% বাস্তবেই আমলে নেয়ার অযোগ্য ।

৬০০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারেরা কষ্ট করে যখন ১৮০০ রোগীর চিকিৎসা দেন, তখন জাতির উচিত সেটার স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের বিবেকবোধের পরিচয় দেয়া। স্বীকৃতি দিলে ডাক্তারদের কর্মস্পৃহা বাড়বে। ডাক্তারেরাই আরামের ঘুম হারাম করে সারারাত বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা দেন। জরুরী মুহূর্তে ডাক্তারেরাই মুমূর্ষু রোগীকে নিজের শরীর থেকে রক্ত দেন। বেঁচে যায় রোগীর জীবন।

চাঁদা তুলে রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সে মুহূর্তে সেখানে সাংবাদিক বা অন্ধ সমালোচনাকারিরা থাকে না। দেশে এরকম অনেক সিনিয়র ডাক্তার আছেন, যারা প্রায় প্রতিদিনই সরকারি হাসপাতালে কোন না কোন গরিব রোগীকে চিকিৎসার জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য করেন। নিজের চেম্বার থেকে গরিব রোগীকে সরকারি হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেয়ার ঘটনা ডাক্তারদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার !

কিন্তু সরকারি হাসপাতালের যে কোন সুযোগ সুবিধার সীমাবদ্ধতার জন্য ডাক্তারের সাথে খারাপ আচরন করে, সেটাকে ডাক্তারের অবহেলা বলে প্রচার করা হচ্ছে! হাসপাতালে রোগীর স্বজন রোগীকে নিয়ে বিপদে এবং সে কারনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেগপ্রবণ থাকেন। ফলে তাদের অধিকাংশ অভিযোগ হয় আবেগপ্রবণ এবং বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন।

কোন ডাক্তার কখনোই ইচ্ছা করে রোগীকে ভুল চিকিৎসা দেন না। মুমূর্ষু রোগীকে রোগীর স্বার্থে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী কোন ইনজেকশন দেয়ার পর বা কোন ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর রোগী মারা গেলেই তার অর্থ এই নয় যে, ওই ইনজেকশনটা বা ওই ট্যাবলেটটাই ভুল চিকিৎসা ।

পান থেকে চুন খসলেই যে কেউ যখন-তখন ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করতেছে! তারা যদি বুঝতে পারে চিকিৎসা ভুল হয়েছে , তাহলে তো তারা নিজেরাই রোগীর সঠিক চিকিৎসা করতে পারতো ! ডাক্তারের কাছে আনার প্রয়োজন হতো না! এ ধরনের অভিযোগ জাহেলিয়াতের অংশ এবং একজন ডাক্তারের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর! তখন তারা না পারেন কিছু কইতে , না পারেন সইতে! কারো যদি সন্দেহ হয় , ভুল চিকিৎসায় তার রোগীর মৃত্যু হয়েছে বা ডাক্তার অবহেলা করেছেন, তাহলে তিনি ডাক্তারকে লাঞ্ছনা বা হাসপাতাল ভাংচুরের মতো অসভ্যতা না করে বরং আদালতে মামলা করুন।

ডাক্তার দোষী প্রমাণিত হলে , তিনি শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য থাকবেন আর দোষ প্রমাণিত না হলে রোগী ডাক্তারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন। এ ধরনের আইন থাকা উচিত।এসব অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়ে ডাক্তারের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণের আগেই গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হলে ডাক্তারদের অনেকে শুধু আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতেই ব্যস্ত থাকবেন। আদালতে মামলার পাহাড় তৈরি হবে।

সবকিছুই স্থবির হয়ে আসবে! উচ্চবিত্তরা চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়ে টাকাগুলো বিদেশীদেরকে দিয়ে আসবেন। বঞ্চিত হবে দেশ! আড়ালে হাসবে বিদেশিরা! ডাক্তারদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাচ্ছে! এতে করে দেশের চিকিৎসা খাতে লেজে-গোবরে অবস্থা সৃষ্টি হবে। রোগীর সেবার মানসিকতা এবং আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন চিকিৎসকেরা ।

জাতিকে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে। এ খেত্রে ডাক্তার এবং তার পরিবারের চাইতে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হবে বেশি। এ ধরনের অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মেধাবী ডাক্তারেরা আরো বেশি করে বিদেশমুখী হবেন। কারন, আত্মরক্ষা মানুষের সহজাত ধর্ম । দুর্বৃত্তদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য তারা সারা জীবন লেখাপড়া করে ডাক্তার হন না।

অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে বা অন্যায় দাবিতে ডাক্তারকে লাঞ্ছিত করা এবং হাসপাতাল - ক্লিনিক ভাংচুর করা হলে বরং সে ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ডাক্তারের কর্তব্য কাজে বাধা প্রধান, হত্যার উদ্দেশে হামলা এবং মানহানি ও ক্ষতিপূরণ মামলা করা এবং অজামিনযোগ্য গ্রেফতারী পরোয়ানার আইন থাকা উচিত।

কারন হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ভবন সহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি অবশ্যই জাতীয় সম্পদ। অন্যথা চিকিৎসা খাতে অস্থিরতা না কমে বরং দিনে দিনে বাড়বে । ডাক্তার যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন সে জন্যই এসব ইতিবাচক আইন থাকতে হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত