ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১০:০১ এএম

বিদেশি মলম বনাম দেশি ডাক্তার

বিদেশি মলম বনাম দেশি ডাক্তার

এক দিন এক রোগী ডাক্তারের কাছে কানের সমস্যা নিয়ে হাজির হলেন। পরে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, কান ব্যাথার কারনে বিদেশি একটি মলমকে সব রোগের মহৌষধ মনে করে তিনি সেটা কানে ঢেলে দিয়েছেন । পরে কয়েক দিন পার করে এখন ডাক্তারের কাছে এসেছেন।  

অন্য এক রোগী সব রোগের মহৌষধ মনে করে বিদেশি কিছু একটা খেয়ে পরে লিভারের গুরুতর সমস্যা নিয়ে এসে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছেন । তার জীবন যায় যায় অবস্থা! আমাদের দেশের আমজনতার কাছে কিছু শব্দের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ।  

তার মধ্যে ৪ টি শব্দ হচ্ছে :  (ক) বিদেশি (খ) রিএকশন (গ) এন্টিবায়োটিক আর (ঘ) প্রেশার ।  

সব কিছুতেই তারা বিদেশি খোঁজে । পরের বউটা দেখতে সুন্দর! নিজেরটা না। তারা অনেকেই নিজের সন্তানকে ঠিকমতো পঞ্চম শ্রেণী পাস করাতে না পারলেও এম বি বি এস ডাক্তারের চিকিৎসার 'ভুল' ধরতে ওস্তাদ । কথায় কথায় তারা এন্টিবায়োটিক চায় ।  অনেক উচ্চবিত্ত লোক দেখেছি যারা দেশি ডাক্তারের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে রিউমেটয়েড আরথ্রাইটিস এর উন্নত চিকিৎসা করার জন্য নিজের স্ত্রীকে থাইল্যান্ড নিয়ে যখন দেখেন সেখানকার ডাক্তার আর বাংলাদেশের ডাক্তার ওই রোগের ব্যাপারে একই চিকিৎসা দিচ্ছেন, তখন তারা হতাশ হয়ে দেশে ফিরে আসেন।  

তখন তারা দেশের ডাক্তারদেরকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন। কিন্তু ততক্ষনে থাইল্যান্ড যাওয়া এবং সেখানকার চিকিৎসা গ্রহণ বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে । পরে তুলনামুলকভাবে অনেকটা খালি হাতে তারা দেশেই বাকি চিকিৎসা গ্রহন করেন। অনেক রোগ আছে যেগুলোর চিকিৎসা অনেক দিন ধরে চালিয়ে যেতে হয়।  নির্দিষ্ট সময় পরপর ফলোআপ করার জন্য ডাক্তারের কাছে আসতে হয়। যেমন সোরিয়াটিক আরথ্রাইটিস, রিউমেটয়েড আরথ্রাইটিস, এস এল  ইত্যাদি ।

দেশের ডাক্তার যখন রোগীকে বলেন , এই রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী ; তখন তারা ভাবতে থাকেন আমাদের দেশের ডাক্তারেরা মনে হয় চিকিৎসা জানে না।  তাই অনেক দিন ধরে চিকিৎসা করতে হবে বলতেছে। তাই তারা রুই-কাতলা ডাক্তারদের চিকিৎসা নিয়ে অল্প কয়েক দিনে সুস্থ হওয়ার জন্য বিদেশ যান। বিদেশে গিয়ে যখন দেখেন সেখানকার ডাক্তারেরাও একই কথা বলতেছে, তখন তারা নিজেদের ভুলটা ধরতে পারেন। কিন্তু ততক্ষনে অনেক টাকা নষ্ট হয়ে গেছে।

সবাইকে জানতে হবে সারা পৃথিবীতে ডাক্তারেরা একই বই পড়ে সেই মোতাবেক চিকিৎসা দেন।   কেউ কেউ বলেন আমাদের দেশের ডাক্তারেরা এতগুলো পরীক্ষা করাইলো কিন্তু রোগটা ধরতে পারলোনা। অথচ বিদেশে গেলাম , ডাক্তারেরা একটা মাত্র পরীক্ষা করিয়ে রোগ ধরে ফেললো । যারা এমন কথা বলেন তারা বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশে করা পরীক্ষার রিপোর্টগুলো সেখানকার ডাক্তারকে না দেখিয়ে বরং গোপন রাখুন।  দেখবেন বাংলাদেশে যে পরীক্ষাগুলো করেছিলেন, বিদেশের ডাক্তারেরা তার সবগুলোই করাচ্ছে; এমনকি দু'এক্টি বেশি করাচ্ছে! অথবা বাংলাদেশে কোনো পরিক্ষা না করিয়ে সরাসরি বিদেশের ডাক্তারের কাছে চলে যান।

তখন আমরা দেখবো কিভাবে তারা একটিমাত্র পরিক্ষা করিয়ে আপনার রোগটি ধরে ফেলে! বিষয়টা অনেকটা গাছ কাটার মত।  একটি গাছ কাটতে হলে মোট ২০ টি কোপ দরকার। দেশের ডাক্তার মোট ১৮ টি কোপ দিয়ে গাছ কাটার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। আর মাত্র ২ কোপ দিয়ে তিনি গাছটি কেটে ফেলবেন। এমতাবস্থায় রোগী ১৮ টি কোপ দেয়ার কারনে দেশি ডাক্তারের প্রতি বিরক্ত হয়ে বিদেশি ডাক্তারকে ডেকে আনলেন।  বিদেশি ডাক্তার বাকি ২ কোপ দিয়ে গাছ কেটে দিলেন।

রোগী বিদেশি ডাক্তারের প্রশংসা করতে শুরু করলেন। দেশি ডাক্তার ১৮ টি কোপ দিয়ে যে গাছ কাটতে পারলোনা, সেটি বিদেশি ডাক্তার মাত্র ২ কোপে কেটে ফেলেছে!  সবাইকে জানতে হবে, যে গাছ কাটার জন্য মোট ২০ টি কোপ দরকার, বিদেশের রোগীরা তাদের দেশের ডাক্তারদের দিয়ে সে গাছের গোঁড়ায় ১৮ টি কোপ দিয়ে আমাদের কাছে আনলে আমরা দেশি ডাক্তারেরাও বাকি মাত্র ২ কোপ দিয়ে সে গাছটি কেটে ফেলতে পারবো । আশা করি সবাই বুঝতে পেরেছেন।  

সবাইকে আরো জানতে হবে, বিদেশে বিভিন্ন সভা সেমিনারে বিভিন্ন দেশের ডাক্তারদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ডাক্তারেরা অহরহ প্রথম হচ্ছে! মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গিরা রোগ বিশেষজ্ঞ (APLAR- Asia Pacific League of Associations for Rheumatology ) ডাক্তারদের সম্মেলনে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ডাক্তারেরা প্রথম হয়েছিলেন ।  ২য় হয়েছিলেন ভারতের ডাক্তারেরা। সুতরাং ,দেশি ডাক্তারেরা বিদেশি ডাক্তারের চেয়ে কম জানে - এই হীনমন্যতা পরিহার করুন।

বাংলাদেশের অনেক তরুণ চিকিৎসক বিদেশে অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃত । বিদেশের অনেক নামি দামি হাসপাতালে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরাই সফলতার সাথে চিকিৎসা দিচ্ছেন।  প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের চিকিৎসকগণ বিদেশে বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহন করতেছেন আবার বিদেশের চিকিৎসকগণ বাংলাদেশে আসতেছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহন করার জন্য। বৃক্ষ মানব তো এখন পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ৩-৪ জন পাওয়া গেছে।  

গতবছর ২০/০২/১৬ তারিখে ঢাকা মেডিক্যালে তার সফল অপারেশন তো দেশের চিকিৎসকগণই করেছেন। বিদেশী চিকিৎসক তো ডেকে আনতে হয় নি! এর আগে মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুকে তো ঢাকা মেডিক্যালেই সফল অপারেশন করা হয়েছে ।  সেখানেওতো বিদেশি চিকিৎসক ডেকে আনা লাগেনি! সর্বশেষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রাংকিং এ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো প্রমাণিত হয়েছে । প্রতিবেশী দেশগুলোর অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে এম বি বি এস এবং এফ সি পি এস, এম ডি, এম এস ডিগ্রী করে পরে নিজেদের দেশে গিয়ে সুনামের সাথে ডাক্তারি করতেছে।  

কেউ কেউ বলেন, দেশি ডাক্তারেরা এতই অযোগ্য যে তারা আল্ট্রাসনগ্রাম না করে জ্বরের চিকিৎসা দিতে পারেন না । তাদের জানা উচিত, এমন অনেক জ্বর আছে ; হাজারো পরীক্ষা করিয়েও যেগুলোর কারন ধরতে পারে না দুনিয়ার কোনো ডাক্তার, হোক সে দেশি অথবা বিদেশি {দেখুন Aetiology of pyrexia of unknown origin (idiopathic~15%) , box-13.2, page-298, Davidson's Principles & Practice of Medicine, 22nd Edition}! আমজনতা চায় ১ দিনে জ্বর ভাল হোক ।  ১ দিনে জ্বর ভালো না হলে তারা দেশি ডাক্তারের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ।

অথচ সঠিক চিকিৎসা শুরুর পর ৫ দিন পার হওয়ার আগে টাইফয়েড এর জ্বর, আর ১০ দিন পার হওয়ার আগে টিবি রোগের জ্বর কমতে শুরু নাও করতে পারে। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, এ ধরনের অনেক রোগী বিদেশে গিয়ে ৩ মাসে জ্বর না কম্লেও সন্তুষ্ট থাকে!  উদাহরণস্বরূপ ফুসফুসের ক্যান্সার যদি একবার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে তখন ওই রোগীকে আর অপারেশন করিয়ে লাভ নেই। কিন্তু দেশি ডাক্তারের প্রতি কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট অনাস্থার কারনে উচ্চবিত্তদের অনেকেই এ ধরনের মুমূর্ষু রোগীকে বিদেশে নিয়ে টাকাগুলো বিলি করে পরে রোগীর মৃতদেহখানা দেশে ফেরত নিয়ে আসেন। বঞ্চিত হয় হতভাগা বাংলাদেশ।  

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এদেশের আমজনতা তাদের নিজেদের সন্তান ডাক্তারদের বিরুদ্ধে এ রকম হীনমন্যতায় ভোগে কেন? কারন হচ্ছে এদেশের গণমাধ্যমে দেশি ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবিরাম অপপ্রচার করা হচ্ছে।  দেশের গণমাধ্যমে ডাক্তারদেরকে একটি আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরে তাদেরকে দেশের একমাত্র দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে! মনে হচ্ছে যেন, এ দেশের সবগুলি ডাক্তারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেই বুঝি দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যেত! এভাবেই দেশের উচ্চবিত্ত রোগীদেরকে চিকিৎসার জন্য বিদেশের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে।  

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ডাক্তারেরা আলাদা গোষ্ঠী হলো কিভাবে? এদেশের ডাক্তারেরা কি ভিনদেশ থেকে আগত কেউ? না কি এদেশে ডাক্তারদের সন্তানেরাই শুধু বংশানুক্রমিকভাবে ডাক্তার হচ্ছে আর অন্য কাউকে ডাক্তার হতে দেয়া হচ্ছে না , যে কারনে তাদেরকে আলাদা গোষ্ঠী হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?  ডাক্তারেরাতো ঘুরেফিরে তাঁদেরই রক্ত সম্পরকের বা দূর সম্পরকের আত্মীয় , যারা সুযোগ পেলেই পথেঘাটে অন্ধভাবে ডাক্তারের সমালোচনা করেন!

সরকারি হাসপাতালে ওয়ার্ড বয় যদি সিট বাণিজ্য করে বা ৪৫ বেডের ওয়ার্ডে ৪০০ রোগী ভর্তি হয়ে ৩৫৫ জন যদি মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়, সেক্ষেত্রে ডাক্তারকে দোষারোপ করার কি আছে?  ইউনিয়ন , উপজেলা আর জেলাতে ক্লিনিকগুলোতে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অনেক সময় গরীব রোগীর ৫-৬ হাজার টাকার পরীক্ষা করানো হয় , এ জন্য তো ডাক্তারকে দোষারোপ করা যায় না। এ সবের জন্য তো তারাই দায়ী যারা সুযোগ পেলেই পথে ঘাটে ডাক্তারের সমালোচনা করে।  

যখমের মিথ্যা সার্টিফিকেট দিতে ডাক্তারকে বাধ্য করে কারা? ডাক্তার মিথ্যা সার্টিফিকেট দিতে নারাজ হলে তাকে অপমানিত করা বা রাজনৈতিক নেতাকে দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে বাধ্য করার ঘৃণ্য কাজটি করে কারা? আমজনতা নয় কি? উপজেলাতে একজন ডাক্তার সৎ ভাবে ডাক্তারি করতে চাইলে তার ভাত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় কেন? এ লজ্জা কি ডাক্তার সমাজের? না কি পুরো জাতির? পুরো জাতির দুর্নীতির দায় ডাক্তারের কাঁধে চাপিয়ে নিজেরা সাধু সাজার চেষ্টা করা কাপুরুষতা নয় কি?  

সাধারন মানুষের মধ্যে যেমন ভালো- খারাপ আছে, তেমনি ডাক্তারদের মধ্যেও ভাল- খারাপ আছে। এমন এক ডাক্তার দেখেছি যে, এক বেবস্থাপত্রে একই ওষুধ তিন কোম্পানির তিনটি লিখেছে! এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন , ডাক্তার নামের কলঙ্ক সারা দেশে হাতে গোনা দু'এক জন আছে।  যদি দেখা যায় একটি দেশের আমজনতার ১৫% অসৎ সে দেশের ডাক্তারদের মধ্যেও ১৫% অসৎ থাকবে। এটাই স্বাভাবিক । কারন ডাক্তারেরা জাতির অংশ, জাতি ডাক্তারদের অংশ নয়।

কিছু সংখ্যক দুর্নীতিবাজ ডাক্তারদের জন্য পুরো ডাক্তার সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে , ডাক্তারদের যতটা না ক্ষতি হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় জাতীয় অর্থনীতির ।  আশা করি বিজ্ঞ পাঠকগন বিষয়টা সহজেই বুঝতে পারবেন। কোনো অধ্যাপকের পরামর্শ ব্যতীত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন না। এতে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয় এবং দেশকে অহেতুক ছোট করা হয়।  দুর্নীতি করে সবাই আর দোষ দেয়া হয় ডাক্তারকে।  দেশের মানুষের টাকা খরচ হয় সবার জন্য আর প্রচার করা হয়, সব টাকা ডাক্তার বানানোর জন্য খরচ হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ , ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে মাথাপিছু ব্যয় ৯৭ হাজার ৪৪১ টাকা। সম্প্রতি জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে মৃত রোগীকে আইসিইউতে রেখে অহেতুক টাকা আদায় করার খবর প্রচারিত হয়।  পরে উক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদলিপিতে বলেন, খবরটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা । হাস্পাতালের বিল পরিশোধ না করে পার পাওয়ার জন্য রোগীপক্ষ এ ধরনের ফ্যাসিবাদী অভিযোগ করে। গতবছর ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাতে সরকারি হাস্পাতাল সম্পরকিত কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।  

রিপোর্টের শিরোনামগুলি নিম্নরূপ :   (১) ছুটির দিন মানেই ডাক্তার নেই  (২) সরকারি হাস্পাতাল আল্লাহ ভরসা  (৩) বেশির ভাগ যন্ত্রপাতিই নষ্ট ।  যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে সেজন্য ডাক্তারকে দোষারোপ করার কিছু নেই। রিপোর্টের মূল বক্তব্বে যা লেখা হয়েছে তাতে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে উল্লেখ করার মতো কোন অভিযোগ নেই বললেই চলে। সব ওয়ার্ডবয়দের খারাপ ব্যাবহার এবং সিট বাণিজ্য , মশার উৎপাত , ৪৫ জনের ওয়ার্ডে ৪০০জন রোগী ইত্যাদি ।  কিন্তু শিরোনাম দেখলে মনে হয় ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার থাকে না।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ছুটির দিনেও সরকারি হাস্পাতালে চিকিৎসা চলে পুরদমে। সব ধরনের জরুরি চিকিৎসা , জরুরি অপারেশন চলে মহাসমারহে।  সাধারন ওয়ার্ডে ও চিকিৎসা চলে , তবে সেখানে একটু শিথিলতা থাকে। ছুটির দিনে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে রাতের বেলা অনেক সরকারি হাস্পাতালে একজন সহকারি অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক সংক্ষিপ্ত রাউন্ড দিতে যান। কিন্তু সেটা সব সময়ই থাকে অঘোষিত , সেটাকে কেউ কখনো স্বীকার করে না।  

সবাই শুধু অপপ্রচার করতে থাকে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারেরা অফিস সময়ে বাইরে রোগী দেখে। সরকারি হাসপাতাল আল্লাহ ভরসা - এ ধরনের শিরোনাম জাতীয় পত্রিকার প্রথম পাতাতে থাকলে সবাই চোখ বন্ধ করেই ধরে নিবে সরকারি হাসপাতালে কোন চিকিৎসা হয় না।  সরকারি হাসপাতালে রোগীর যে পিত্ত থলির অপারেশন হয় সেটাই প্রাইভেট হাস্পাতালে ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্য়ন্ত খরচ হয়! সরকারি হাসপাতালে যে ব্রেন টিউমার অপারেশন হয় সেটাই উচ্চবিত্তরা বিদেশে গিয়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে আসে! অন্যান্য চিকিৎসার কথা না হয় বাদই দিলাম।  

উপকার পেয়ে তা স্বীকার করার অভ্যাস এ জাতির মধ্যে বিরল। বরং তারা সব সময় চাতুর্যের সাথে উপকার অস্বীকার করতেই পারদর্শী । বাস্তবতা মেনে নিন, বাস্তবতা স্বীকার করুন । উপকার স্বীকার না করলেও অন্তত পক্ষে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করবেন না।  দেশের চিকিৎসা খাত ডাক্তারদের নিজস্ব সম্পদ নয়।

বরং দেশের ডাক্তারসমাজ এবং চিকিৎসা খাত হচ্ছে জাতীয় সম্পদ। ডাক্তারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা মানে ১৬ কোটি মানুষের জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি করা। ডাক্তারদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করুন।  অহেতুক ভুল ধারনা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে ডাক্তারের সাথে খারাপ আচরন থেকে বিরত থাকুন। তখন দেখবেন বিদেশি রোগীরা এদেশে এসে চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট মনে দেশে ফিরে যাচ্ছে। দেশের যুবসমাজ, শিক্ষক , প্রকৌশলী , আইনজীবী , বুদ্ধিজীবীসহ সবাই এ ব্যাপারে সময় থাকতে সচেতন হওয়া আবশ্যক। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত