ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০২:৪৯ পিএম

ডাক্তারদের ওপর হামলা: ক্ষতি বেশি সাধারণ জনগণেরই

ডাক্তারদের ওপর হামলা: ক্ষতি বেশি সাধারণ জনগণেরই

আমরা যাদেরকে পছন্দ করিনা, তাদের নিগৃহীত হতে দেখলে খুশি হয়ে উঠি। এমনকি তারা যদি অন্যায় আচরণের স্বীকার হোন, তাহলেও আমরা এটাকে পোয়েটিক জাস্টিস ধরে নিই। অথচ এটা আল্টিমেটলি কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনা। বাংলাদেশ এখন একটা টোটাল ডিজেস্টারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে যার জায়গায় ন্যায় অন্যায়ের বালাই না করে যতটুকু সম্ভব স্বার্থ উদ্ধার করে যাচ্ছে। পেশাজীবীদের মধ্যে ঘৃণা সব ধরনের রেকর্ড অতিক্রম করছে, আর রাজনীতিরতো কথাই নাই। এ জন্য দেখা যাচ্ছে, একজন সাংবাদিক যখন সরকার দলীয় পান্ডাদের হাতে মাইর খায়, তখন আমি খুব খুশি হয়ে উঠছি।

প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীনদের দালালি করে যাওয়ার, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক জনমত সৃষ্টিতে ভুমিকা পালন করায়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আমার ব্যাপক ক্ষোভ আছে। এই ক্ষোভ হয়তো যৌক্তিক। কিন্তু সাংবাদিক যখন ক্ষমতাসীনদের পেটোয়া বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়, তখন আমাদের খুশি হওয়া এবং প্রচ্ছন্ন সাপোর্ট কিন্তু বিপজ্জনক। এতে যেটা হয়, সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য আরো বেশী চেষ্টা করেন এবং তাদেরকে আরো বেশী গণবিরোধী ভুমিকায় দেখা যায়।

একই কথা প্রযোজ্য, ডাক্তারদের উপর চলমান হামলা এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ভাংচুরে যারা খুশি হয়ে উঠেন, তাদের জন্যেও। ডাক্তারি একটা থ্যাংসলেস জব। সাধারণ মানুষ যেভাবে তার নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটা বাজেট রাখে, তার অসুখের জন্য সেভাবে বাজেট রাখেনা। তাই ডাক্তারকে ফিস দেয়া, বিভিন্ন টেস্টের টাকা, হাসপাতালের বিল, এগুলোকে তার কাছে অতিরিক্ত মনে হয়।

আবার মানুষজনের কাছে চিকিৎসার সফলতা মানে হচ্ছে, তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে দেওয়া। অসুস্থতা থেকে সুস্থতা - একটা বিশাল এরিয়া। এই এরিয়ার পুরোপুরি টপে অবস্থান না করলে, সে সন্তুষ্ট না। আর তাছাড়া ডাক্তারি পেশার 'মার্জিন অব এরর ' অনেক বেশী । ডাক্তারদের ছোট্ট ভুল, অনেককে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার রোগীর ভালোর জন্য নেওয়া যেকোনো ডিসিসান যেমনঃ রোগীকে বিভিন্ন টেস্ট দেওয়া, হাসপাতালে স্টে করার কথা বলা, কোনো অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত দেওয়া, এগুলো ডাক্তারের জন্যেও লাভজনক। তাই এগুলো রোগীর ভালোর জন্যে দেওয়া হয়েছে, নাকি ডাক্তারের লাভের জন্য দেওয়া হয়েছে, তাই নিয়ে রোগীর মাঝে কনফিউশান থেকে যায়। এজন্য উন্নত দেশগুলোতে, যেখানে দুর্নীতি এবং অসততার পরিমাণ অনেক কম, সেখানেও ডাক্তারের বিষয়ে রোগীরা স্যাটিসফাইড না।

আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবস্থাতো আরো জটিল। বাংলাদেশে রোগীরা রোগীরা হয়তো খুবই অসচেতন অথবা গুগলসার্চ দিয়ে অতি সচেতন। আর জাতীয় চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিছু ডাক্তার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্যই দুর্নীতিবাজ। কিছু ডাক্তার কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের মতো গম্ভীর মুখ করে রোগী এবং রোগীর এটেনডেন্টদের ধমকাধমকি করতে ওস্তাদ। এতে বাংলাদেশের রোগীদের এবং তাদের কাছ থেকে শুনে শুনে সাধারণ মানুষের একটা বিরাট অংশ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে খুবই বিদ্বেষ পোষণ করেন।

এর ফলশ্রুতিতে কোথাও কোনো ডাক্তার আক্রান্ত হলে, হাসপাতাল ভাংচুর হলে, বিপুল সংখ্যক লোক আনন্দ পান, এইসব ঘৃণ্য আক্রমণকে সাপোর্ট দেন। এই সংক্রান্ত নিউজের কমেন্ট সেকশনে গেলে এই বিদ্বেষ এবং ঘৃণার বহর দেখলে যে কোনো নবীন ডাক্তারেরই ডাক্তারি ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে। অথচ হামলার শিকার ডাক্তারটা হয়তো খুবই নিরীহ প্রকৃতির, ওই হাসপাতালে আক্রমণ এবং ভাংচুরের পিছনে হয়তো জড়িয়ে আছে রাজনীতির কুটিল অঙ্ক, হাসপাতাল বিল না দেয়ার চেষ্টা। আপনি যিনি, এই স্ট্যাটাস পড়ছেন, আপনি ডাক্তারকে পছন্দ করুন বা নাই করুন, এইসব হামলা আর আক্রমণে আপনার বিন্দুমাত্র লাভ হবেনা। বরং এতে আপনার ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী।

আপনি যদি গ্রামে থাকেন, তাহলে শুনুন, অব্যাহত হামলা আর ভুল চিকিৎসার অপবাদের কারণে ডাক্তাররা প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে জটিল রোগীর চিকিৎসা করা ছেড়েই দিছে। পেরিফেরির হাসপাতালগুলোতে এখন রোগীর ডেথ ডিক্লেয়ার করা ছেড়েই দিয়েছে। নিজের পিঠ বাচানোর চিন্তায় অস্থির ডাক্তার এখন পাকা অভিনেতার মতো মৃত রোগীকে শহরে রেফার করার বিদ্যা আহরণ করা শিখছে। আপনি হয়তো শহরে থাকেন, কিন্ত আপনার যে গরীব প্রিয়জন গ্রামেই থাকেন, তার চিকিৎসা একটু কঠিন করে দেয়ার জন্য, ডাক্তার আক্রমণের সংবাদে আনন্দিত আপনিও একটু দায়ী নন কি?

ভুল চিকিৎসার অভিযোগে হাসপাতাল ভাংচুর এখন মোটামুটি চালু ফ্যাশন। এতে আমজনতার খুশী একটু বেশিই। চক্ষুলজ্জার কারণে ডাক্তার পেটানোর ঘটনা শেয়ার না দিলেও হাসপাতাল ভাংচুরের ঘটনা অনেক ভালো ভালো মানুষই শেয়ার দেন। অথচ হাসপাতাল ভাংচুরের অধিকাংশই ঘটে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা বা হাসপাতালের বিল না দেয়ার অজুহাত সৃষ্টি করার জন্য। আমি কাকরাইলের একটা হাসপাতালে কিছুদিন ডিউটি করেছিলাম। ওই হাসপাতালে পলিটিকাল হম্বিতম্বিওয়ালা কোনো রোগী মারা গেলে প্রায়শই ঝামেলা করার চেষ্টা করতো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ধরনের রোগীদের কাছ থেকে বিল না নিয়ে ছেড়ে দিতো। যেকোন হাসপাতালকে লাভ করতে হয়। তাই এই যে, ঝামেলার ভয়ে বিল না দিয়ে ছেড়ে দেয়া, স্থানীয় রুইকাতলার সাথে যোগাযোগ রাখা, পত্রিকাওয়ালাদের ম্যানেজ করা, এ সংক্রান্ত যাবতীয় খরচের চাপটা এসে পড়ে সাধারণ রোগীদের উপর।

আপনি যদি ওইরকম প্রভাবশালী কেউ না হোন, তাহলে শুনুন, এই যে হাসপাতাল ভাংচুর এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় খরচের দায়ভার আপনি এবং আপনার সাধারণ আত্মীয়কে বহন করতে হয়। সুতরাং ডাক্তার নিপীড়ন এবং হাসপাতাল ভাংচুরে আপনার খুশী হওয়া কিন্তু আপনার জন্যই আত্মঘাতী। উন্নত দেশগুলোতে লোকজন এগুলো খুব ভালো করে বোঝে বলে, ডাক্তারের উপর ক্ষোভ থাকলেও ডাক্তারের গায়ে কেউ হাত তুলেনা এবং হাসপাতাল ভাংচুর করে বেড়ায় না। কেউ যদি এ কাজ করে, তার এ কাজের জন্য সবাই শাস্তি দাবি করে। আমাদের দেশে এর উল্টোটা হচ্ছে। তাই চিকিৎসা খরচ আরো বাড়ছে, সাধারণ মানুষরা আরো বেশী প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

তাই সবার উচিত এই এই সামষ্টিক দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা। ডাক্তারকে শায়েস্তা করতে গিয়ে আপনি নিজেই যেনো শায়েস্তা না হয়ে যান - এ বিষয়ে খেয়াল রাখা। ডাক্তারের প্রতি করুণা বা সম্মানের জন্য নয়, আপনার নিজের স্বার্থেই চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থলের সৃষ্টি করে চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার কাজে শরীক হওয়া। আপনার হটকারি মন্তব্য, ফেসবুক পোস্ট এবং ঢালাও ঘৃণার চাষাবাদ যেন সেই বাংলাদেশ গড়ার পথে প্রতিবন্ধক না হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের শতকরা নিরানব্বই জন কিন্তু ক্ষমতাবলয়ের বাইরের লোক, যাদেরকে এ দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত