পিনাকী ভট্টাচার্য্য

পিনাকী ভট্টাচার্য্য

ব্লগার, লেখক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

সাবেক শিক্ষার্থী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। 


১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০৩:৩৪ পিএম

আমার মায়ের ক্যান্সার জয়ের গল্প

আমার মায়ের ক্যান্সার জয়ের গল্প

মনটা ভালো, কারণ মায়ের ক্যান্সার হবার পরে প্রায় তিন বছর নির্বিবাদে কাটলো। শেষ ফলো আপে দেখা গেল সব একদম ঠিক আছে। ক্যান্সার আর ফিরে আসেনি। ২০১৪ সালে মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়লো, ব্রেস্ট ক্যান্সারের সবচেয়ে বাজে আর এগ্রেসিভ টাইপের ক্যান্সার ছিল এটা। খাদেমুল ইসলাম স্যার সার্জারী করলেন, অগ্রজতুল্য কামাল ভাই কেমো আর ইমিউনোথেরাপি দিলেন। আমরা তিন ভাই বোন, আমার স্ত্রী মিলে চিকিৎসার খরচ যোগাতে হিমশিম খেয়ে গেলাম। আমার বন্ধু মনোয়ার মোস্তাফা জলিকে বলেছিলাম সেই সময়, জানেন এই মাসে কত কত টাকা লাগবে শুধু ওষুধ কিনতে? টাকার অংক শুনে, জলি বলেছিল, আমার মাথা ঘুরতেছে, আর বলবেন না।

যাই হোক তখন আমাদের একমাত্র চিন্তা মা'কে বাচাতে হবে, সেরা চিকিৎসা দিয়ে হলেও, আর সেই চিকিৎসার খরচ জোগার করতে গিয়ে পথে বসলেও। আর আমার গোঁ ছিল দেশেই চিকিৎসা করাতে হবে।

চিকিৎসার শেষ দিকে যখন রেডিওথেরাপি দেয়া হবে নাকি হবেনা তা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিল তখন দেবদুতের মতো আবির্ভুত হলেন তাসনিম আপা। তাসনিম আপা, আমেরিকায় থাকেন সেখানেই প্র্যাকটিস করেন ক্যান্সার চিকিৎসার। নিজে সার্জন আর সার্জারির পরের ক্যান্সার চিকিৎসার একটা বড় অংশ নিজেই সামলান। তিনি তার বাসাতেই দেখলেন মাকে, অনেক সময় নিয়ে কয়েকবার দেখলেন, নানা পরীক্ষার পরে তিনি বললেন; রেডিওথেরাপি দিলে কোন লাভ হবেনা বরং ক্ষতির সম্ভাবনা আছে, এটা বাদ দিন। এদিকে মা খুব পছন্দ করে ফেলেছেন তাসনিম আপাকে। মহিলা চিকিৎসক পেয়েও মা স্বচ্ছন্দ। আমরাও আপার কথামতো রেডিওথেরাপি বাদ দিলাম। সেই থেকে মা তাসনিম আপার ফলো আপেই আছেন। এমনকি আবার যদি কখনো ক্যান্সার ফিরে আসে তাহলে কী চিকিৎসা করবেন সেটাও আপা ঠিক করে রেখেছেন। তার সাথে এটাও বলেছেন ৪০% সম্ভাবনা আছে ক্যান্সার আর ফিরে আসবেনা।

২০১৫ সালে তাসনিম আপা জানালেন তিনি দেশে ফিরে আসবেন আর একটা এডভান্সড ক্যান্সার সেল থেরাপি সেন্টার করবেন জাপানের সাথে কোলাবরেশনে, আপার কাছেই শুনলাম ক্যান্সার চিকিৎসা সে কোথায় চলে গেছে। সেল থেরাপি এখন ক্যান্সার চিকিৎসার একটা গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ, আর সেটা শুরুই হয়নি বাংলাদেশে!! কেউ জানেইনা!! তবে অনেকেই তো অনেক কিছু বলেন, শেষে হতাশ হয়ে ফিরে যান। তাই ভেবেছিলেম তাসনিম আপাও হয়তো শেষে কিছুই করতে না পেরে ফিরে যাবেন আবার আমেরিকায়।

কিন্তু আপা ভিন্ন ধাচের মানুষ, তিনি শেষ পর্যন্ত করলেন তাঁর সেন্টার। যেদিন মিলাদ দিয়ে উদ্বোধন করলেন সেদিন গিয়ে আমি তো সেন্টার দেখে মুগ্ধ। বাংলাদেশে এতো সুন্দর একটা সেন্টার হতে পারে? সেন্টারটা পুরোটা চালু হয়নি হলি আর্টিজানের ঘটনার পরে জাপানিরা কিছুদিন আসতেই চায়নি বাংলাদেশে। তবে এখন সেই গ্যাড়াকল কেটেছে; সেন্টারের বাকি কাজটা খুব শিঘ্রীই শুরু হবে। এখন চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য মোটামুটি তৈরিই হয়ে গেছে সেন্টারটা।

যারা নিজ পরিবারের ক্যান্সার রোগীকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, তাসনিম আপার একটা সাজেশন নিতে পারেন। আমার বিশ্বাস আমার মতো অনেকেই উপকার পাবেন।

আপার সেন্টারটার নাম দিয়েছেন আপার মায়ের নামে, সালিমা স্পেসালাইজড সেন্টার ফর ক্যান্সার এন্ড সেল থেরাপি, নাভানা নিউবারি প্লেস (৮ম তলা), সোবাহানবাগ, মিরপুর রোড। ফোন নাম্বার ৯১১২০২৭

একজন ক্যান্সার রোগীর ছেলে হিসেবে জানি এই সামান্য তথ্যটুকু কারো কারো কত উপকারে লাগতে পারে।

তাসনিম আপাকে অভিনন্দন দেশে ফিরে এই সেন্টারটি গড়ে তোলার জন্য। সেইসাথে কৃতজ্ঞতা জানাই ল্যাব এইড, ইউনাইটেড, এপোলোর সকল চিকিৎসা কর্মিকে যারা মাকে সেবা দিয়ে ক্যান্সার জয়ে সাহায্য করেছেন।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না