যোবায়ের মাহমুদ

যোবায়ের মাহমুদ

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। 


০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১০:১১ এএম

পথ চেয়ে বসে আছি সেই দিনটার

পথ চেয়ে বসে আছি সেই দিনটার

দুয়েকদিন ধরে যখনই ফেসবুকে ঢুকছি, হোমপেজ জুড়ে দেখছি একটাই আলোচনা, এসএসসির বাংলা পরীক্ষাতে আসা উদ্দীপকের তুমুল আলোচিত বিষয়বস্তু নিয়ে।

আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ঘটনা ঘটছে,ঘটে ; তার সবগুলোর সৌভাগ্য হয় না লাইমলাইটে আসার, আলোচনার টেবিলে ঝড় তোলার। এই ঘটনার হয়েছে।

এই বিতর্কিত প্রশ্ন করার পর দুটো পক্ষ দেখতে পাচ্ছি। 
এক পক্ষ আম-জনতা। অন্য পক্ষ আম-ডাক্তার সমাজ।

আম জনতা বলছে, এমন প্রশ্ন করে আসলে সত্য জিনিসটাকেই তুলে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন করলে এমন প্রশ্নই করা উচিত।

ডাক্তারেরা অবশ্যই লোভী। হ্যা, ডাক্তার লোভী, স্বীকার করছি। আমার এক বন্ধুর ভাই ডাক্তার। তার বাড়িতে নতুন টিভি, ফ্রিজ সবই ঔষধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভদের দেওয়া।
আপনি বলতে চান তিনি লোভী না? অবশ্যই লোভী। 
কয়দিন রাস্তায় দাড়িয়েছেন ডাক্তারদের সিলেবাসে নৈতিক প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্তির জন্য?

কিছুদিন আগে সকালে আমাদের হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরছি। ডাক্তারের কক্ষের বাইরে দাঁড়ানো মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ আমার হাতের প্রেস্ক্রিপশন নিয়ে ছবি তুলতে চাইলে আমি তাকে বললাম, 'কেন ছবি তুলবেন ভাই'? 
তার উত্তর ছিলো, 'ভাই, এইগুলো দেখাতে হয়'। বুঝি তাদের চাকরি! 
কিন্তু যে ডাক্তার অখ্যাত কিন্তু নির্দিষ্ট কোম্পানির ঔষধ লিখছেন শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে, আপনি বলতে চান তিনি লোভী না?
আমরা কি আমাদের এমন ভাইদের বলেছি, আপনি কেন অবৈধ পথে টাকা আয় করেন? বাদ দেন না ভাই!

ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে ইনভেস্টিগেশন করানোর সময়ে দেখা যায়, রেফারড বাই ডা: অমুক..তমুক। এই যে ইনভেস্টিগেশনের রেফারেন্সে টাকা আয় করলেন ডাক্তার, সেটি কি আদৌ হালাল? আপনি বলতে চান তিনি লোভী না? 
আমরা কি বলেছি, এই সিস্টেম বদলে দেবার জন্য আমাদের কাজ করা উচিত? কই শুনিনি তো কখনো!

আমাদের আম ডাক্তার সমাজ এই প্রতিটি অভিযোগের জবাব দিতে চায়। সেখানেই গোলটা পাকায়। মানুষ কয়েকজন ডাক্তারের ভুল দেখে পুরো ডাক্তারসমাজকে ডিফাইন করে বসে থাকে। 
আবার আমরা যারা নতুন,তাদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই অপবাদের ঘানি টেনে যেতে হয়। দুটোই আসলে প্রাথমিকভাবে করা ভুলের কন্টিনিউয়েশন।

ধরুন তর্কের খাতিরে আমি বা আমরা সবকিছুই মেনে নিলাম। কিন্তু এসএসসির মত একটি জাতীয় পরীক্ষায় দেওয়ার জন্য এর চাইতে মানানসই কোন উদ্দীপক পাওয়া গেল না? যিনি প্রশ্ন করেছেন, তিনি বিষয়টির সামাজিক ইমপ্যাক্ট কল্পনা না করেই না হয় করলেন ; কিন্তু যিনি প্রশ্নপত্র মডারেটর তিনিও কেন বিষয়টিকে স্কিপ করে গেলেন?

বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্থ খাতগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যখাতের অবস্থান অনেক নিচে। শিক্ষকেরা কিছুক্ষেত্রে দুর্নীতি করেন, যে কোন অফিসের ক্লার্ক /কেরানীরা কিছুক্ষেত্রে দুর্নীতি করেন, কখনো হয়তো আমাদের প্রতিনিধিরাও দুর্নীতি করেন, কখনো হয়তো দুর্নীতির অভিযোগ আসে পোষাকধারীদের ওপর ; তাই বলে তো তারা পরীক্ষায় উদ্দীপক হয়ে যান না। তাহলে কেন শুধু ডাক্তারদের চরিত্রেই অযথা কালিমালেপনের অপচেষ্টা?

একজন মানুষ তার পুরোটা জীবনে বহুবার ডাক্তারদের সংস্পর্শে আসে। হয় তার নিজের কারণে, নয় তার আত্মীয় স্বজনের কারণে। ডাক্তার নিয়ে কোন আলোচনা উঠলেই প্রতিটি মানুষ তার জানা সবচে চমকপ্রদ ঘটনাটি বলার চেষ্টা করেন, যা অধিকাংশ সময়েই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যায়।
নার্সরা ডাকলে সময়মত আসে না,দোষ ডাক্তারের।
ওয়ার্ডে লাইট নাই, দোষ ডাক্তারের।
হাসপাতালে ওষুধ সাপ্লাই নাই, দোষ ডাক্তারের।

ডাক্তারের সংখ্যা কম, সারাদিনে একবার হয়তো এসেছেন। সবাইকে রাউন্ডে একবার করে দেখা ছাড়াও তিনি অনেকগুলো কাজ করেন। তবু, যা কিছু হোক দোষ ডাক্তারের। আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, আমাদের হাসপাতালের সবচাইতে ছোট যে ওয়ার্ডটা আছে, সেখানকার রোগীদের প্রত্যেকের ফাইল একবার করে দেখবেন দিনে দুইবেলা এবং প্রতিবেলা প্রত্যেককে আন্তরিকতায় ভরপুর একটা হাসি দিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করবেন, মা/বাবা কেমন আছেন?

টানা এক সপ্তাহ সবার সাথে এভাবে হেসে কথা বলার পরও যদি আপনার হাসিতে আন্তরিকতার কোন ঘাটতি না আসে, আপনি যা বলতে চান, সব মেনে নেবো। পারবেন? 
পারবেন না।

অনেক ডাক্তারই আছেন, যারা কোন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভের কাছ থেকে একটা পয়সাও নেন না, শুধুমাত্র উপার্জন হারাম হবে বলে। এই ডাক্তারদের সংখ্যা যত নগন্যই হোক, তাদের কথা আমরা কাউকে বলতে শুনি না কেন?
কেন জনগন এত সহজে এগুলো চেপে যায়?

আমাদের ইন্টার্ন ভাইদের দেখেছি, পাশের বড় ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে চেনা-জানা নেই এমন রোগীর জন্যও বড় বড় অক্ষরে 30/40% ডিসকাউন্টের জন্য লিখতে। কই কেউ শুনেছেন, কেউ বলছে, আমার এই উপকারটা পেয়েছি ডাক্তারদের কাছ থেকে?

বেশি ইনভেস্টিগেশন দেওয়া হয় বলে রোগীরা প্রায়শই অভিযোগ করেন। অথচ কিছু রুটিন ইনভেস্টিগেশন সব রোগীকেই করে দেখা হয়। অপারেশনের আগেও কিছু ইনভেস্টিগেশন করতে দেওয়া হয়। 
অথচ কিছু না বুঝেই অধিকাংশ মানুষ চিৎকার করতে থাকে, তাদেরকে গাদাগাদা করে ইনভেস্টিগেশন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে!

প্রতিদিন হাসপাতালের করিডোর দিয়ে বিশ-ত্রিশ জন রোগীর স্বজন দৌড়ে বেড়ায় রক্তের জন্য। রক্ত কেনার টাকা তার নেই। রক্ত দেওয়ার মত লোক তার নেই। কারা তাদেরকে রক্ত দেয়?
জানে কেউ? কই হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় একবার ডেকেও ধন্যবাদ দিয়ে যায় না। মানুষ সুখের মুহূর্তগুলোকে ভুলে যায় খুব সহজে, দুঃখের কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে। বারবার বলে।

এইসব কারণে আমরা হাহাকার করে বেড়াই নে, কেন আমাদেরকে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ দিয়ে গেলো না, কেন আমরা তাদেরকে রক্ত দিতে যাবো, কেন কপর্দকহীন রোগীটির হাসপাতালের সাপ্লাইএর বাইরে লাগা অতিরিক্ত ঔষধ আমরা সবাই মিলে টাকা দিয়ে কিনে দিতে যাবো? 
যদি আমরা এসব তুচ্ছ কারণে হাহাকার করতে আসতাম, তাহলে এই পেশাতেই আসতাম না। আমরা জানি এটা একটা থ্যাংকলেস জব। আমরা শুধুমাত্র এ পেশায় এসেছিলাম, মানুষের চোখের অশ্রু মোছার উপলক্ষ্য হতে।
আমাদের হাহাকার শুধু বিনা কারণে গালি শুনতে।
আমাদের হাহাকার আপনাদের করা অশালীন মন্তব্য হজম করতে। আপনি শেষ মুহূর্তে রোগী এনেছেন, রোগী অপ্রত্যাশিতভাবে মারা যাওয়ার পর মারতে তেড়ে আসা আপনার আচরণের জন্য।

একদম দল-মত-শ্রেণি-বর্ণ-অবস্থান নির্বিশেষে সব ডাক্তারই এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে, ব্যাপারটা যথেষ্ট আনন্দের। আমরা ভাবতাম ডাক্তারেরা মেরুদণ্ডহীন, তারা প্রতিবাদ করতে জানে না ; আমাদের সে জানাটা ভুল ছিলো জেনে খুশি হলাম। 
কিন্তু দিনশেষে কেন জানি আমার মনে হচ্ছে, আমাদের ডাক্তারদের মাঠে নেমে আন্দোলন করার জন্য এরচাইতে বেশি গুরুতর অনেক টপিক ছিলো। আমি সেদিন সবচাইতে বেশি খুশি হবো যেদিন অনারারী প্রথা বন্ধের জন্য বা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার দাবী নিয়ে বা দেশের চিকিৎসা খাতের সামগ্রিক বরাদ্দ আরো বৃদ্ধির জন্য আমাদের ডাক্তারদের সংগঠনগুলো বিবৃতি দেবে, কথা বলবে, আলোচনা করবে, মানববন্ধন করবে।

'পথ চেয়ে বসে আছি সেই দিনটার
ঘুচে যাবে মেঘ কালো সব হতাশার'

 

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না