০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১১:৩৮ এএম

ল্যাবরেটরীতে প্রথম মানুষ ও শুকরের হাইব্রিড ভ্রুণ তৈরি

ল্যাবরেটরীতে প্রথম মানুষ ও শুকরের হাইব্রিড ভ্রুণ তৈরি

প্রথমবারের মত বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরীতে শুকরের প্রাথমিক পর্যায়ের ভ্রুণের অভ্যন্তরে 'মানব কোষ ' বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছেন। ব্যাপারটিকে বিজ্ঞানীরা আখ্যা দিয়েছেন 'আন্ত:প্রজাতিক কাইমেরা ' বলে। এ আবিষ্কারের পথ ধরে একদিন হয়তো ল্যাবেই মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ উৎপাদন করা সম্ভব হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ট্রান্সপ্লান্ট করে বাঁচানো সম্ভব হবে হাজারো মৃত্যুপথযাত্রীর জীবন।

এই পরীক্ষায় আমেরিকান বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক পর্যায়ের শুকরের ভ্রূণে মানুষের স্টেম কোষ ইনজেক্ট করে এই হাইব্রিড ভ্রূণকে ফার্স্ট ট্রাইমেস্টার পর্যন্ত বাড়তে দিয়ে দেখেন প্রায় ১৫০টির মত ভ্রূণ কাইমেরা-তে রুপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে লিভার এবং হৃৎপিণ্ডের মত অঙ্গসমূহের প্রিকারসর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে যদিও এখানে মানব কোষের পরিমাণ ছিল খুবই অল্প, কাইমেরার ১০০০০টি কোষের মধ্যে মাত্র ১টি!

এটি মূলত মানুষ এবং শুকরের সংকর ভ্রূণ তৈরির সফলতার সম্ভাব্যতা বিচারের একটি পরীক্ষা ছিলো। ক্যালিফোর্নিয়ার সল্ক ইনস্টিটিউট, থেকে জুয়ান কার্লোস ইজপিসুয়া বেলমন্টে বলেন, 'আমাদের এ পরীক্ষার ফলাফল মেডিসিন এবং সায়েন্সকে ভ্রূণের বৃদ্ধি ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরির ব্যাপারে গবেষণা করতে আশা যোগাতে পারে এবং একই সাথে নতুন মেডিকেল চিকিৎসার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে'। তিনি আরও বলেন, 'আমরা দেখিয়েছি আধুনিক টেকনোলজির মাধ্যমে এক প্রজাতির কোষ থেকে তৈরি অঙ্গ অন্য প্রজাতির কোষের মধ্যে বৃদ্ধি করা যেতে পারে'।

ইজপিসুয়া বেলমন্টে এবং তার দল ২০১৫ সালেও অনুরূপ একটি পরীক্ষা করেছিলেন। সে পরীক্ষায় তারা ইদুরের ভ্রূণে মানুষের স্টেম কোষ প্রবেশ করিয়ে ঐ স্টেম কোষকে বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেটিই ছিলো বিশ্বের প্রথম আন্তঃপ্রজাতিক কাইমেরা, যেটি দেখিয়েছিল মানুষের স্টেম কোষ অন্য কোন প্রজাতির মধ্যে বৃদ্ধিতে সক্ষম!

'কাইমেরা ' শব্দটির উৎপত্তি গ্রীক মিথোলজীতে, এটি এমন দৈত্যকে বোঝায় যার ঘাড় থেকে ছাগলের মাথার মত একটি অংশ বের হয়ে থাকে এবং পেছনের অংশে লেজের বদলে একটি সাপ থাকে। বায়োলজীতে 'কাইমেরা' বলতে স্বাভাবিক বা কৃত্রিমভাবে কোন প্রজাতির নির্দিষ্ট অঙ্গাণুর অন্য প্রজাতিতে বৃদ্ধি পাবার ঘটনাকে বোঝায়।

'এটি আমাদেরকে প্রজাতির বিবর্তন, বায়োলজী এবং রোগ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন পথ নির্দেশ করছে এবং একদিন হয়তো এর মাধ্যমেই ট্রান্সপ্লান্টের জন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ উৎপাদনও সম্ভব হবে'-ব্যাখা করছিলেন ইজপিসুয়া বেলমন্টে। 

মানুষ এবং শুকরের সংকর ভ্রুণ তৈরি মূলত ক্রমাগত চলা পরীক্ষাগুলোর ফলাফল হিসেবেই এসেছে। তবে এর পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিলো। এ গবেষণা দলের প্রথম গবেষণা ছিলো CRISPR -Cas9 ব্যবহার করে ছোট অাকৃতির ইদুরের(mice) অগ্ন্যাশয় তৈরির জন্য দায়ী জিনকে বাধা প্রদান এবং পরবর্তীতে এ ছোট আকৃতির ইদুরের মধ্যে(mice) বড় আকৃতির ইদুরের (rat) অগ্ন্যাশয় তৈরির স্টেম কোষ প্রবেশ করান।

এই স্টেম কোষগুলো ভিন্ন প্রজাতিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে ইদুরের চোখ এবং হৃৎপিণ্ড সহ বিভিন্ন অঙ্গ কৃত্রিমভাবে তৈরীতে উৎসাহ যোগায়। একইসাথে বিজ্ঞানীরা ছোট আকৃতির ইদুরের (mice) মধ্যে বড় আকৃতির ইদুরের (rat) পিত্তথলিও তৈরি করতে সক্ষম হন।

সহকারী গবেষক জুন ইউ ব্যাখ্যা করেন, 'আমাদের এই পরীক্ষাগুলো গোপন একটা সত্য উদঘাটন করে দেখিয়েছে যে, ছোট আকৃতির ইদুরের (mice) মধ্যে বড় আকৃতির ইদুরের (rat) পিত্তথলি তৈরীর প্রক্রিয়া চলতে পারে, যেটি স্বাভাবিকভাবে ছোট আকৃতির ইদুরের (mice) বৃদ্ধির সময়ে অনুপস্থিত থাকে।' তিনি আরও বলেন, 'এটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বৃদ্ধি এবং প্রজাতি ভিন্নকরনে পোষাক দেহের পরিবেশের গুরুত্বই তুলে ধরে।'

দ্বিতীয় পরীক্ষাটি করা হয়েছিলো, ছোট এবং বড় আকৃতির ইদুরের স্টেম কোষকে শুকরের ভ্রূণে বড় হতে দিয়ে। পরবর্তীতে চার সপ্তাহ পরে দেখা যায়, এগুলোতে কোন অস্বাভাবিকতার চিহ্ন নেই।

তৃতীয় পরীক্ষাটি ছিলো মানুষ এবং গরুর স্টেম কোষকে শুকরের প্রাথমিক ভ্রূণের মধ্যে বড় হতে দিয়ে দুটি নতুন কাইমেরা তৈরী করা। কিছুদিন পর পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, মানুষের স্টেম কোষ ঠিকমতোই বড় হচ্ছে। 

এই পরীক্ষাগুলোই মূলত বিজ্ঞানীদের মানুষ ও শুকরের সংকর ভ্রূণ তৈরীতে উৎসাহ যোগায়, যা বড় হবে শুকরের জরায়ুতে। এর জন্য তারা আগের মতই শুকরের ভ্রূণে 'হিউম্যান ইনডিউসড প্লুরিপটেন্ট স্টেম সেল' (Human iPSC) প্রবেশ করান এবং কয়েক সপ্তাহ পর এদের বৃদ্ধি পরীক্ষা করে দেখতে পান, কিছু মানব কোষ এমনভাবে বদলে যাচ্ছে যাতে অনুমান করা যায় যে, এরা ভ্রূনের অভ্যন্তরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ কারণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ব্যবহার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত শুকর বড় হতে থাকবে। যেহেতু এটিই প্রথমবার মানুষ ও শুকর থেকে কাইমেরা তৈরি, সেহেতু বিজ্ঞানীরা তাদের মূল উদ্দেশ্য সফল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

ইজপিসুয়া বেলমন্টে বলেন, এ কাইমেরিক গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্টেম কোষ এবং জিন এডিটিং টেকনোলজি ব্যবহার করে জেনেটিক মিলসম্পন্ন টিস্যু এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি এবং ভালো একটি ফলাফলের জন্য আমরা সবাই আশাবাদী। এ পদ্ধতিতে আমরা জিনের বিবর্তন এবং রোগ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারছি, যেটা অন্যভাবে সম্ভব ছিলো না।'

তবে এমন গবেষণায় কিছু নিরাপত্তার এবং নীতিগত সমস্যা রয়ে যায়, যেমন যেকোন প্রজাতিতে ভাইরাসের সংক্রমনের হার বেড়ে যাবে। এ পরীক্ষায় নীতিগত সমস্যা এড়ানোর জন্য মানুষ ও শুকরের হাইব্রিড ভ্রূণের বৃদ্ধি ২৮ দিন (শুকরের ফার্স্ট ট্রাইমেস্টার) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

সত্যি বলতে এমন হাইপোথিটিক্যাল প্রশ্নের জবাব মূলত কারো কাছেই নেই,যেটা এই গবেষণাকে কিছুটা হলেও অনিশ্চিত করে ফেলেছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) এর আগে মানুষ থেকে কাইমেরা তৈরির এ প্রকল্পে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো।

কিন্তু এটাও ভেবে দেখবার মত একটি বিষয়, আমেরিকাতে গড়ে প্রতিদিন ২২জন মানুষ অঙ্গ সংযোজনে ব্যর্থতার কারনে মারা যাচ্ছে এবং প্রতি দশ মিনিটে একজন মানুষ এই অপেক্ষমান তালিকায় যোগ দিচ্ছে ; একারণেই কিছু মানুষ মনে করছেন, এই গবেষণা চলতে থাকাটাই উচিত অন্তত যতদিন সুনিয়ন্ত্রিত থাকে।

উৎস : সায়েন্স এলার্ট।

ভাষান্তরঃ মাহমুদ ইবনে মাহফুজ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত