৩১ জানুয়ারী, ২০১৭ ১০:১০ এএম

চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, শঙ্কা পুষ্টিকর খাবারের

চাল নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, শঙ্কা পুষ্টিকর খাবারের

দেশে চাল উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই, তবে শঙ্কা আছে পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন নিয়ে। চাল উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে চালের উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। আর ওই সময়ে চাহিদা থাকবে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন।

অন্যদিকে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণকারী খাদ্য গম, আলু, ডাল, সবজি, মাংস, ডিম ও মিঠাপানির মাছ উৎপাদন চাহিদা অনুযায়ী বাড়ছে না। ওই সময়ে গোল আলুর উৎপাদন হবে ১ কোটি ১৮ লাখ টন, ডাল ৪ লাখ টন, সবজি ৬৪ লাখ টন আর ফলের উৎপাদন দাঁড়াবে ৩৬ লাখ টন। যা ওই সময়ের মোট চাহিদার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম থাকবে। ফলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যাবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ও যুক্তরাজ্য সরকারের বৈদেশিক–বিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা ডিএফএআইডি যৌথভাবে বাংলাদেশের কৃষি খাতের গতি–প্রকৃতি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। ‘স্ট্র্যাটেজিক এগ্রিকালচারাল সেক্টর অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি ডায়াগনস্টিক ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণায় এসব তথ্য ও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দেশের কৃষি উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা এবং ২০৩০ ও ২০৫০ সালে তা কী দাঁড়াবে, কোথায় জোর দিতে হবে, তা বুঝতেই ওই গবেষণাটি করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে আরও দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে কৃষি খাত। কৃষি খাতে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে দেশে দারিদ্র্য কমে শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর অ-কৃষি খাতে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে দারিদ্র্য কমে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে অ-কৃষি (শিল্প ও সেবা) খাতের ভূমিকা তিন গুণ বেশি।

দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি খাতের এই কার্যকর ভূমিকা থাকলেও ধারাবাহিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমে আসছে। কারণ, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি পর্যায়ক্রমে কমছে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি গড়ে ৫ শতাংশ ছিল। ২০১০ থেকে ২০১৫–এর মধ্যে তা কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

গবেষণাটিতে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে দেশে দারিদ্র্য কমেছে ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে ২০ শতাংশ কমেছে ২০০৫ থেকে ২০১০–এর মধ্যে। কারণ, ওই সময়ে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল। কারণ, ওই সময়ে চালের দাম বেশি ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চালের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের সঞ্চালনা বেড়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য কমেছে ১৫ শতাংশ। এই সময়ে চালের দাম বৃদ্ধির হার কমে যায়।

ব্র্যাকের প্রয়াত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে গবেষণাটি শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সংস্থাটির গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক বায়েস আহমেদ ও ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষণার বাকি অংশটি শেষ হয়। গবেষণায় পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে চার দশক ধরে মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে দেশের ৬৪টি গ্রামের তথ্য নিয়ে করা চলমান গবেষণার তথ্যকে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গবেষণাটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আবদুল বায়েস বলেন, ‘এত দিন ধরে দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল চালনির্ভর। সরকারের সব প্রণোদনা ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছিল চালমুখী। ফলে চালের উৎপাদন বেড়েছে। সবজি, ফল ও মাছের উৎপাদন বাড়লেও তা চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

কারণ, এই খাতে সরকারের সহায়তা কম। অথচ কৃষি খাতের নতুন উদ্যোক্তারা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং সবজি ও ফলেই বেশি আসছে। যেমন কয়েক বছর পরপর আমরা দেখি কৃষক আলু ও সবজির দাম না পেয়ে মাঠে ফেলে দিচ্ছেন। সরকার এই কৃষিপণ্যগুলোর ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে এমনটা হতো না।’

গবেষণাটিতে আরও দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে দেশে মোট উৎপাদিত ধানের অর্ধেক এক মাসের মধ্যে বাজারে চলে আসত। বর্তমানে তা বেড়ে ৬৩ শতাংশ হয়েছে। ধান উৎপাদনেও ক্ষুদ্র চাষিদের (এক একর পর্যন্ত জমির মালিক) ভূমিকা বেড়েছে। ১৯৮৮ সালে মোট উৎপাদিত ধানের ১৬ শতাংশ আসত ক্ষুদ্র চাষিদের কাছ থেকে।

২০১৪ সালে তা বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। এই ক্ষুদ্র চাষিরা মূলত চাষে বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত ফেরত পেতেই দ্রুত বিক্রি করছে। সার, সেচ ও কৃষি মজুরি পরিশোধ করতে এক মাসের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষুদ্র চাষি ধান বিক্রি করে দিলেও মৌসুম শেষে আবার তাঁরা কিনে খান। এতে তাঁকে বেশি দাম পরিশোধ করতে হয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাত্তার মণ্ডল বলেন, ‘বাংলাদেশের জমি কম। ফলে সব ধরনের খাদ্যশস্য উৎপাদনে সমান উন্নতি হবে না। কিছু খাদ্য আমাদের আমদানি করতে হবে।’ আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য ডাল ও পোলট্রিশিল্পের ওপর জোর দেওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন তিনি।

সূত্রঃ প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত