২৯ জানুয়ারী, ২০১৭ ০৩:০৯ পিএম

কেউ না কেউ অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সে বিশ্বাস আমার আছে

কেউ না কেউ অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সে বিশ্বাস আমার আছে

১.

একটা প্র্যাকটিক্যাল জোকস্ বলি.....

পেপারে একটি বিজ্ঞাপন প্রায়ই আমার নজরে পড়ে। লজ্জার ব্যাপার -বিজ্ঞাপনটি একজন চিকিৎসকের। যে সিচুয়েশনে হার্টে রিং পড়ানো বা বাইপাস সার্জারী আবশ্যক, সেখানে উনি রোগীর কাছে আন-সায়ন্টেফিক বিকল্প ব্যবস্থার চটকদার অপশনের কথা উল্লেখ করেছেন..

কোনো পেশেন্টকে যখন জানানো হয় যে তার হার্টে রিং পরাতে হবে বা বাইপাস সার্জারীর প্রয়োজন, তখন তার মনের অবস্থা ক্রিটিক্যাল স্টেইজে থাকে। রোগীর মনের এই দূর্বল অবস্থায় তাকে অপচিকিৎসার দিকে আহ্বান জানানো এক ধরণের প্রতারণা তো বটেই। আমি অবশ্য ভেবে পাইনা, একটি প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিক কিভাবে এই অপবিজ্ঞানকে প্রমোট করে.....

যাই হোক, প্র্যাকটিক্যাল জোকস্ এর ক্ল্যাইমেক্স পয়েন্টে আসি....

হার্টে রিং পরানোর বিকল্প যিনি ফেরি করে বেড়ান-- উনার নিজের হার্টেই কিন্তু রিং পরানো আছে...

 

২.

"ইস্! কৌশলটা আগে জানা থাকলে বাবা স্ট্রোক করে মারা যেতেন না...."

স্ট্রোক হলে হাতে পিন ফুটিয়ে রক্ত বের করতে পারলেই নাকি কেল্লা ফতে, নবজীবন পাওয়া যাবে। এই হলো আরেক কামাখ্যা বিদ্যা...

রেডিও মুন্না ও এই টাইপ কিছু পেইজ এইসব ফাজলামো টাইপ তথ্য দেয়া শুরু করলো, মুহূর্তের মাঝে হাজার হাজার ছাগলা এইসব ফালতু জিনিস বিদ্যুতের মতো শেয়ার করে অশেষ নেকী হাসিল করলো, আমার কোনো আপত্তি ছিলো না। আপত্তি তখনোই স্টার্ট হলো যখন দেখলাম এক চিকিৎসক এর পক্ষে যুক্তি দেয়া শুরু করলো। Holy shit !!!

একটা তথ্য আমি জানলাম, কোনো স্টাডি বা ট্রায়াল ছাড়া আমি এর পক্ষে কথা বলা শুরু করলাম! মেডিকেল সায়েন্স কবে থেকে এতটা খেলো হলো তা আমার জানা নেই। পাগল-ছাগল আর কাকে বলে..

 

৩.

চেম্বারে হুড়মুড় করে কয়েকজন লোক এক অজ্ঞান রোগীকে নিয়ে ঢুকলো। ডায়াবেটিস আছে শুনে ব্লাড সুগার চেক করলাম, ব্লাড সুগার 2 mmol/L, থাকা উচিত মিনিমাম 5-6 mmol/L।ইনসুলিন নেয় না, ওষুধও খায় না, এরপরেও ব্লাড সুগার এত কমে গেলো কিভাবে?

চিকিৎসা দিতে দিতে রোগীর স্ত্রীর কাছ থেকে শুনলাম- সম্প্রতি কোনো এক লোক নাকি ডায়াবেটিস নির্মূল করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন, তার থেকে ওষুধের গুড়া গতকাল রাতে খাবার পর আজ দুপুরের পর থেকে অজ্ঞান। ডায়াবেটিস নির্মূল হবার সাথে সাথে রোগীরও এখন নির্মূল হবার দশা..

ভীতিকর তথ্যটা এবার বলি। কয়েকদিন আগে দেখি ফেসবুকে একটি পেইজ খুলে এই ধরণের ওষুধের প্রচারণা চলছে। এগুলো প্রমোট হলে সামনে একটি ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে..

 

৪.

আরেক প্রতারকের কথা বলি।উনিও চিকিৎসক।এক 'আরক' নাকি উনার নিজস্ব আবিষ্কার, যাদের ক্রিয়েটিনিন (কিডনী ফাংশন মার্কার) অনেকদিন ধরে বেশী, এই আরক খেলে সেই ক্রিয়েটিনিন নাকি নরমাল রেঞ্জে চলে আসবে.....

তার ফেসবুক পেইজ ঘুরলাম, ভারতের এক সেমিনারে উনাকে এই 'আরক' আবিষ্কার করার জন্য ক্রেস্ট দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছে।কঠিন ব্যাপার-স্যাপার। দেশী লোক, দেশের কেউ ক্রেস্ট দিলো না, ভারত দিলো। গেঁয়ো যোগী ভিখ্ পায় না টাইপ......

আসল কথাটা বলি-- ক্রেস্ট বিজনেস ভারতে চললেও এই দেশে চলে না...

 

৫.

এবার আসি হাল আমলের ক্রেজ, তরুণদের হৃদয়ের ঝড়- ডাঃতানিয়া সুলতানায়।

কোনো এক আহাম্মক- "ডাক্তার তানিয়া সুলতানা " নামে একটি ফেসবুক পেইজ খুলে বিনামূল্যে এদেশের মানুষদের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। ততোধিক আহাম্মক বাঙাল প্রজাতি এসব ভূয়া তথ্যকে বেদবাক্য মনে করে সহোৎসাহে তা শেয়ার করছে। ডাক্তার আপা দেখি রাত-বিরাতে আবার ফেসবুক লাইভেও আসেন। ভালোই বিনোদন চলে তাহলে......

ডাক্তার আপা কি ধরণের চিকিৎসা সেবা দেন তার একটা নমুনা দেই। লজ্জাবতী গাছ মাত্র ১ বার সেবন করলেই যেকোনো দূর্বল পুরুষ নাকি টাট্টুঘোড়া হবে-- বাকীটুকু আর বলতে চাচ্ছি না, বুঝে নিন। শয়ে শয়ে লোক এই খবর শেয়ার করছেন। বাংলার যুবকরা এত দূর্বলতায় দিন কাটায়- সেটা আমার জানা ছিলো না....

 

৬.

আসামের এক রহস্যময় এলাকা কামাখ্যা। হাজার বছর আগে এই কামাখ্যা ছিলো জাদু-টোনা আর ঝাড়-ফুঁকের তীর্থভূমি। সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে, কামরূপ কামাখ্যা শাস্ত্রের বিলুপ্তি ঘটেছে। আসলেই কি বিলুপ্তি ঘটেছে? চিকিৎসার নামে কিছু কালপ্রিট যে অপচিকিৎসার প্রসার ঘটাচ্ছে তা কি কামাখ্যা শাস্ত্র নয় ?

"Only two things are infinite, the universe and human stupidity, and I'm not sure about the former." - কথাটা যে কতটা যুক্তিযুক্ত -এসব ঘটনা দেখি আর তা ভাবি.....

২০১৬ সালের একটা তথ্য দেইঃ 'বিশ্বে ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ '।যে হারে এদেশে অপচিকিৎসাকে প্রমোট করা হয়, আমি আশাবাদী অচিরেই এই দেশ ছাগল উৎপাদনে প্রথম হবে......

 

৭.

একটা কথা না বলে পারছিনা..

দেশে অপচিকিৎসার এই যে ব্যাপ্তি তার পিছনে আমরাও বোধ হয় কিছুটা দায়ী। রোগী আসছে, চিকিৎসা দিচ্ছি-তারপরেই আমরা খালাস- এমন ভাবাটা যৌক্তিক নয়। চিকিৎসক হিসেবে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে..

ফ্রন্ট লাইন মিডিয়াগুলো এইসব অপচিকিৎসা রোধে এগিয়ে আসবে না সেটা অনুমিত। তবে ফেসবুক কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যাম। যে ফেসবুকে এইসব অপবিদ্যার প্রোপাগান্ডা চালানো হয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সে ফেসবুকেই যদি চিকিৎসকেরা এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তাদের মতামত তুলে ধরেন, তবে সিচুয়েশন কিছুটা হলেও কন্ট্রোলে থাকবে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা আরকি..

 

৮.

গ্রীক পৌরাণিক উপকথা অনুযায়ী প্রথম মানবী ছিলেন 'প্যানডোরা'। গ্রীক দেবতা জিউস থেকে উপহারপ্রাপ্ত বাক্সটি প্যানডোরা যখন প্রথম খুলেন তখন বের হয়ে আসে পৃথিবীর সকল খারাপ জিনিসগুলো, দ্বিতীয়বার সেটা খুললে বের হয়ে আসে 'আশা'। নিতান্তই গল্প....

একটার পর একটা যে অপচিকিৎসার কথা প্রথমদিকে বলে গিয়েছি সেগুলো প্যানডোরার বাক্সের প্রথম উন্মোচনের ফসল। তবে মনে রাখতে হবে দ্বিতীয়বার প্যানডোরার বাক্স ওপেন করার পর 'আশা'ও কিন্তু বের হয়েছিলো। তিমির রাত্রির অবসান ঘটে, সূর্যোদয় হয়। কেউ না কেউ এসব অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সে বিশ্বাস আমার আছে, সে আশা আমি করতেই পারি, কারণঃ

"Hope is a good thing, maybe the best of things, and no good thing ever dies....."

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না