ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১১ মিনিট আগে
ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


২৯ জানুয়ারী, ২০১৭ ০৮:৩২

ডাক্তার হিসেবে আমেরিকায় যেতে চাইলে

ডাক্তার হিসেবে আমেরিকায় যেতে চাইলে

(১)
চাকুরীর প্রাচুর্যতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনচর্যার সুযোগের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকরা আমেরিকায় অভিবাসী হন। অন্যদেশ থেকে ডাক্তারি পাশ করে আমেরিকায় চিকিৎসক হওয়া সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, সময়্সাধ্য়, ব্যয়সাধ্য এবং কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া। আমার এই অভিজ্ঞতা (কিছুটা) অর্জনের সুযোগ হয়েছে। প্রতিবছর অনেক মানুষ আমার সাথে যোগাযোগ করেন খুটিনাটি পরামর্শ চেয়ে। একারণেই, এখানে কিছুটা লিখছি যাতে পরামর্শ প্রার্থীরা উপকৃত হন।

 

(২)
পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে ডাক্তারি পাশ করলে সেই সার্টিফিকেট দিয়ে আমেরিকায় এসে সরাসরি ডাক্তারি করা যায় না। এজন্য দুটো ধাপ পেরোতে হয়: (ক) ইউনাইটেড স্টেটস মেডিক্যাল লাইসেন্সিং একজামিনেশন (ইউএসএমএলই) এবং (খ) রেসিডেন্সী এপ্লিকেশন, ইন্টারভিউ এবং ম্যাচ। ইউএসএমএলই সম্পর্কে আমি এখানে আলোচনা করব না, এ নিয়ে অনেকেই অনেক জায়গায় আলোচনা করেছেন। শুধু দু'টো বিষয় মনে রাখা দরকার যে বর্তমানে যারা ইউএসএমএলই পাশ করেন, স্টেপ-১ এবং স্টেপ-২ এ তাদের গড় মার্কস ২৩০ এর উপরে এবং তারা প্রায় সবাই একবারেই এই পরীক্ষা পাশ করেন। আমি মূলত: রেসিডেন্সী পাবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে একটা ধারণা এবং কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ আলোচনা করছি। বাস্তবিকপক্ষে, ইউএসএমএলই পাশ করার প্রক্রিয়ার চেয়ে রেসিডেন্সী পাবার প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল, ব্যয়সাধ্য, সময়সাধ্য এবং অনিশ্চিত।

(৩)
ইউএসএমএলই পাশ করার পরে (স্টেপ-১, স্টেপ ২ ক্লিনিক্যাল স্কিল এবং ক্লিনিক্যাল নলেজ) ইসিএফএমজি সার্টিফিকেট প্রদান করে। এই সার্টিফিকেট পাবার পরেই রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করা উচিত। রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করার আগে এই বিষয়ে বিশদভাবে অবগত হয়ে নেয়া উচিত। সেজন্য যথাযথ গবেষণা এবং পড়াশুনা করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে যে জিনিসগুলো সম্পর্কে জানা দরকার তা হলো:

-কোন হাসপাতালে আবেদন করবেন (সেই হাসপাতালের কোনো নিদ্রিস্ট চাহিদা আছে কিনা: যেমন: ভিসার ব্যাপার, ইউএসএমএলই-এর স্কোর কত থাকতে হবে, তারা বিদেশীদের নেয় কিনা, ডাক্তারি পাশ করার কত বছরের মধ্যের প্রার্থীদের তারা নেয় ইত্যাদি)

-পার্সোনাল স্টেটমেন্ট (অব পারপাস)

-তিন/চারটি রিকমেন্ডেশন লেটার

-রিজুমি/সিভি

 

(৪)
এই প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম প্রধান ধাপ হলো পার্সোনাল স্টেটমেন্ট লেখা। বারো ফন্ট সাইজের টাইপে এক পাতা দীর্ঘ পার্সোনাল স্টেটমেন্ট-কে সর্বোতকৃষ্ট বলে গন্য করা হয়। এতে মূলত সেসব বিষয় নিয়েই লেখা হয় যা নিজস্ব বায়োডাটায় লেখা যায় না। পারসনাল স্টেটমেন্ট কোনভাবেই বায়োডাটার কপি বা ডুপ্লিকেশন নয়। এখানে মূলত প্রার্থী মানুষ হিসেবে কেমন, তার জীবন দর্শন কি, তার ডাক্তার হবার ব্যক্তিগত কারণ কি এসব সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। সাথে সাথে তাকে হাসপাতাল চাকুরী দিলে হাসপাতালের কি লাভ হবে এবং তার নিজের পেশাগত উন্নয়ন এবং বিকাশ হবে, তা সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়া হয়। ৩/৪ অনুচ্ছেদে এই পুরো বিষয়টি একপাতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করতে হয়। এই লেখা হতে হবে ব্যাকরনগত এবং বানানগত দিক দিয়ে শতভাগ নির্ভুল। এজন্য, এই একপাতা লেখার জন্য ২-৩ মাস সময় লেগে যায়, অভিজ্ঞ মানুষদের দিয়ে পর্যালোচনা করাতে হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই এক্পাতা বর্ণনা হতে হবে প্রার্থীর নিজস্ব কথা, অন্যের শিখিয়ে দেয়া বা অন্যের থেকে অনুকরণ করা কথা নয়। এজন্য, অন্যের লেখা বা ইন্টারনেট থেকে অনুকরণ করে লেখা অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং আত্মঘাতী। এই একপাতার বর্ণনার উপর প্রার্থীর সফলতা অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

 

(৫)
পারসোনাল স্টেটমেন্ট-এর পরে রেফারেন্স লেটার/রিকমেন্ডেশন লেটার এর গুরুত্ব। আমেরিকায় রেসিডেন্সী আবেদনে আমেরিকার কারো রিকমেন্ডেশন লেটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নিজ দেশের কোনো অধ্যাপকের লেটার খুব একটা কাজে আসে না মূলত দুটি কারণে: নিজ দেশের কারো রিকমেন্ডেশন লেটার লেখার ফরম্যাট সাধারনত আমেরিকার ধরনের সাথে যুতসই নয়, দ্বিতীয়ত: যিনি লিখেছেন, তিনি আমেরিকায় পরিচিত নন, একারণে তার লেটারের গুরুত্ব কমে যায়। একারণে, রেসিডেন্সী প্রার্থীর উচিত প্রথম থেকেই আমেরিকায় চিকিত্সা পেশায় জড়িত এমন কারো সঙ্গে কাজ শুরু করা যাতে প্রয়োজনের সময় তার কাছ থেকে রিকমেন্ডেশন লেটার পাওয়া যায়। কমপক্ষে তিনজন-এর কাছ থেকে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় লেখা রিকমেন্ডেশন লেটার প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। যিনি লিখবেন, তাকে বলা উচিত যে সে যেন চিঠিটা সরাসরি "ইরাজ" এ পাঠিয়ে দেন, অর্থাত এই চিঠিটা তিনি গোপনে লিখে গোপনে পাঠিয়ে দিবে, প্রার্থী এই চিঠিটা দেখবে না। প্রার্থী চিঠিটা দেখলে এর গুরুত্ব অনেকাংশে কমে যাবে। এই চিঠিটা মূলত: হতে হবে প্রার্থীর ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতার বর্ণনা এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত চারিত্রিক এবং পেশাগত বৈশিষ্টের বর্ণনাবহুল। প্রার্থীর বৈজ্ঞানিক গবেষনার অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলনামূলকভাবে কম জরুরি। নিজের আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনের কাছ থেকে নেয়া চিঠির গুরুত্ব খুব-ই কম। তাছাড়া, প্রার্থী যে বিষয়ে রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করেছেন, তার উচিত সেই বিষয়ের উপর ট্রেনিং-এর বর্ণনা সম্বলিত রিকমেন্ডেশন লেটার দাখিল করা।

(৬)
পারসনাল স্টেটমেন্ট এবং রেফারেন্স লেটার এর কাজ শেষ হবার আগেই প্রার্থীর উচিত কোন কোন হাসপাতালে আবেদন করবে তার একটা তালিকা করে ফেলা। বর্তমান সময়ে, প্রত্যেকটি হাসপাতাল সম্পর্কে বিশদভাবে জেনে ৩০-৫০ টি হাসপাতালে আবেদন করাই সমীচীন, যদিও প্রায় সব প্রার্থীই শতাধিক হাসপাতালে আবেদন করেন। আমার মতে, এটা করা শুধুই টাকার অপচয়। প্রার্থী যে হাসপাতালে আবেদন করবে, সেই হাসপাতালে আবেদনের পূর্বশর্তগুলো বিশদভাবে জেনেই আবেদন করা উচিত। এগুলো সাধারনত হাসপাতালের ওয়েবসাইটে লিপিবদ্ধ করা থাকে। যদি না থাকে, তবে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটরকে ই-মেইল বা ফোন করে জেনে নেয়া উচিত। এসব ক্ষেত্রে, কোনভাবেই প্রোগ্রাম ডিরেক্টরকে ই-মেইল করা উচিত নয় (এতে সাধারনত হিতে বিপরীত হয়)। প্রার্থী যেসব হাসপাতালে আবেদনের জন্য যোগ্য নয়, সেসব হাসপাতালে কোনক্রমেই আবেদন করা উচিত নয়, কারণ তারা কখনোই এই প্রার্থীকে ইন্টারভিউয়ে ডাকবে না। এভাবে, সুক্ষ্ম গবেষনার মাধ্যমে নির্বাচিত ৩০-৫০ টি হাসপাতালে আবেদন করা উচিত। যেদিন আবেদনপত্র গ্রহণ শুরু হয়, সেই প্রথমদিন-ই আবেদন করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময়, প্রার্থীর তিনটি রিকমেন্ডেশন লেটার তখনও প্রস্তুত হয়নি, এমতাবস্থায়ও প্রথমদিনেই আবেদন করা উচিত এবং পরে রিকমেন্ডেশন লেটার পাঠানো যায়।

(৭)
আমাকে প্রায়-ই প্রার্থীরা প্রশ্ন করেন যে রেসিডেন্সিতে আবেদনের জন্য স্টেপ-৩ জরুরি কি না। এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, হ্যা, জরুরি, খুব-ই জরুরি। যারা আমেরিকায় পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা আমেরিকার নাগরিক নন, তারা যদি এইচ-১ ভিসার জন্য আবেদন করতে চান, তবে তাদের অবশ্যই স্টেপ-৩ পাশ করা থাকতে হবে। এছাড়া, স্টেপ-৩ পাশ করা প্রার্থীদের আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। একারণে, সম্ভব হলে অবশ্যই স্টেপ ৩ পাশ করা থাকা আবশ্যক, সম্ভব হলে বেশি মার্কস-ও পাওয়া উচিত, এবং একবারেই পাশ করা উচিত। আমেরিকায় রেসিডেন্সি করতে হলে দুই রকম ভিসায় আসা যায়: জে-১ এবং এইচ-১। প্রত্যেক প্রার্থীর উচিত এইচ-১ ভিসায় আমেরিকা আসা (ভিসার ব্যাপার নিয়ে পরে কখনো লিখব), এইচ-১ ভিসা পেতে হলে অবশ্যই স্টেপ-৩ পাশ করা থাকতে হবে।

(৮)
রেসিডেন্সী প্রার্থীদের অনলাইনে (ইরাজ) একটা বায়োডাটা পূরণ করতে হয়। এখানে দেয়া তথ্য নির্ভুল, বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্যনির্ভর হওয়া উচিত। এমন কোনো তথ্য দেয়া উচিত নয় যা প্রার্থী উপযুক্ত দলিল দিয়ে প্রমান করতে পারবে না। আবেদনের কথাও মিথ্যা তথ্য দিলে এবং তা ধরা পড়লে প্রার্থীর জন্য তা করুন পরিণতির কারণ হবে। এই আবেদনে প্রার্থীর একটি ছবি সংযুক্ত করতে হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত যাতে এই ছবিটি চিকিত্সা পেশার সাথে মানানসই হয়, প্রয়োজন হলে কোনো পেশাগত ফটোগ্রাফার-কে দিয়ে এই ছবিটি তোলানো উচিত। ছবির গুরুত্বকে ছোট করে দেখা উনুচিত। এই আবেদনেই প্রার্থীর কোনো গবেষণা, গবেষণালব্ধ প্রকাশনা, প্রেজেন্টেশন, অন্য কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো স্বেচ্ছাসেবকের অভিজ্ঞতা, মানবকল্যানে করা কোনো পদক্ষেপের বর্ণনা, কোনো সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা এবং প্রার্থীর শখ উল্লেখ করতে হয়।

(৯)
একজন প্রার্থী আবেদনকৃত হাসপাতাল থেকে ইন্টারভিউ পাবেন কিনা তা মূলত নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপর: তার ইউএসএমএলই-এর স্কোর, কত বছর আগে ডাক্তারি পাশ করেছেন, আমেরিকায় তার ক্লিনিক্যাল কাজের অভিজ্ঞতা, তার ভিসার প্রয়োজনীয়তা, রেফারেন্স লেটার, পারসনাল স্টেটমেন্ট (এবং সে হাসপাতালে প্রভাবশালী কাউকে চেনে কিনা)-এর উপর। যার স্কোর যত কম, তার ইন্টারভিউ পাবার সম্ভাবনা তত কম, যে পাঁচ বছরের অধিক সময় আগে ডাক্তারি পাশ করেছেন, তার ইন্টারভিউ পাবার সম্ভাবনা ক্রমশ কমে যায়। যার আমেরিকায় কোনো ক্লিনিক্যাল (বিশেষ করে হাসপাতালে, অবজারভারশিপ, এক্সটার্নশীপ ইত্যাদি) কাজের অভিজ্ঞতা নেই, তার ইন্টারভিউ পাবার সম্ভাবনা কম। অনেকেই ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে গবেষণা সম্পর্কিত কাজে বেশি সময় ব্যয় করেন, এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশিই হয়। গবেষনার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত হিসেবে থাকতে হবে।

(১০)
উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা একজন প্রার্থীর অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর প্রদানে সক্ষম হবে। প্রার্থী কোনো হাসপাতাল থেকে ইন্টারভিউ পেলে কিভাবে ইন্টারভিউ দিতে হয়ে, তার উপর নির্ভর করে যে সে রেসিডেন্সি পাবে কি না। আমেরিকায় সাধারনত চাকুরী না দিলেও ইন্টারভিউযার প্রার্থীর বেশ প্রশংসা করেন। প্রায় সময়-ই এটা বিভ্রান্তিকর কারণ প্রার্থী ভাবতে থাকেন যে এখানে তার চাকুরী হয়ে যাবে। ইন্টারভিউয়ার সব প্রার্থীর-ই প্রশংসা করেন, এবং তা করেন মূলত প্রার্থীকে উত্সাহ দেবার জন্য, কষ্ট করে ইন্টারভিউ দিতে আসার জন্য। এই উত্সাহ/প্রসংশা সব সময় চাকুরীর নিশ্চয়তা নয়। ইন্টারভিউ কিভাবে সফলভাবে দিতে হয়, সে সম্পর্কে অন্য কোনো একসময় বিশদভাবে লিখবো। সকল প্রার্থীর জন্য শুভকামনা।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত