ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১২ ঘন্টা আগে
২৩ জানুয়ারী, ২০১৭ ১১:২০

পুষ্টি নিরাপত্তায় পোলট্রির অবদান অনেক

পুষ্টি নিরাপত্তায় পোলট্রির অবদান অনেক

বাংলাদেশে পোলট্রিশিল্পের দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধিও প্রায় ২০ শতাংশ। পোলট্রিশিল্প বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে। তবে এই শিল্পের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় যে কাজটি হয়েছে তা হলো, এ দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা অনেকাংশে দূর করছে। পুষ্টি নিরাপত্তা ও সুন্দর আগামীর জন্য তাই পোলট্রির অবদান অনেক।

এই শিল্পের মালিকেরা মনে করছেন, এই খাতের আরও উন্নয়নের পথে বেশ কিছু বাধা রয়েই গেছে। আগে এই খাত আয়করমুক্ত ছিল। কিন্তু এখন করযুক্ত করা হয়েছে। অগ্রিম করও রয়েছে। এগুলো তুলে দেওয়া দরকার। পোলট্রির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে টিকা আমদানি করা দরকার। এই খাতের জন্য করা আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পোলট্রির অগ্রগতি ভালো হচ্ছে। তবে এই শিল্প কতটা স্থিতিশীল, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ছোট ছোট পোলট্রি ফার্ম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো দরকার। সরকারের নীতি ও আইন মেনে এই খাত এগোলে তা একটি স্থিতিশীল শিল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।

রোববার সকালে প্রথম আলোর কার্যালয়ে ‘সুন্দর আগামীর জন্য পোলট্রি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। গোলটেবিলের আয়োজন করে প্রথম আলো আর সহযোগিতায় ছিল ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব‍) সভাপতি গোলাম রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রিয় মোহন দাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদা ইসলাম, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মসিউর রহমান, বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ফুড অ্যান্ড সেফটি প্রোগ্রামের সিনিয়র ন্যাশনাল অ্যাডভাইজর শাহ মুনির হোসেন, ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ ব্রাঞ্চের সভাপতি সামসুল আরেফিন খালেদ, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল হক, সিপি বাংলাদেশের সভাপতি সুচাত শান্তিপদ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাধারণ পরিষদের সদস্য এম নজরুল ইসলাম, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান, সংগঠনের 

সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান এবং কাজী ফার্মস লিমিটেডের লেয়ার সেলস ইনচার্জ মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।

গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তা চায় সহনীয় মূল্যে মানসম্মত খাবার খেতে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে পোলট্রির ৫৫ শতাংশ আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফার্ম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তাঁদের ওপর নজরদারি তেমন নেই। এখানে পোলট্রির বড় শিল্পমালিকদের ও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে, যেন এই ব্যবসায়ীরা মানসম্পন্নভাবে উৎপাদন করেন। তিনি বলেন, পোলট্রি খাতের বিকাশের জন্য সরকারকে ব্যবসায়ীদের সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক প্রিয় মোহন দাশ বলেন, পোলট্রি বিষয়ে কেবল মুরগির মাংস ও ডিম নিয়ে আলোচনা করলে হবে না। এখানে হাঁস, কবুতর ও তার্কি নিয়েও কথা বলতে হবে। পোলট্রিতে হাতুড়ে চিকিৎসা বন্ধ করতে হবে। টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তিনি বলেন, পোলট্রিশিল্পে জীব নিরাপত্তা, পরিবেশের ওপর জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলেন, একটা কুসংস্কার আছে, দেশি মুরগির মাংস ও ডিমে ফার্মের মুরগি ও ডিমের চেয়ে বেশি পুষ্টিগুণ রয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই ঠিক নয়। দুটোরই পুষ্টিমান সমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খর্বকায় একটা সমস্যা। এটা দূর করতে প্রোটিন দরকার। আর প্রোটিনের জন্য সহজলভ্য খাদ্য হলো মুরগির মাংস ও ডিম।

মসিউর রহমান বলেন, পোলট্রিশিল্পের কারণে ডিম ও মাংসের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। এখন এক ব্যক্তি বছরে ৫০টি ডিম ও ৪ কেজি মাংস খায়। আমাদের লক্ষ্য, ২০২০ সালে গড়ে একজন ১০০ ডিম ও ৮ কেজি মাংস খাবে। ফলে উৎপাদন বাড়াতে হবে।

শাহ মুনির হোসেন বলেন, এই খাতে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে শক্তিশালী করতে হবে। টিকার ব্যবহার ঠিকমতো হতে হবে। তিনি বলেন, এ, বি ও সি শ্রেণির ফার্ম থেকে পণ্য কিনে একত্র করে ফেলা হয়। ফলে মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান বলেন, একটা মুরগি থেকে ১৫২টা বাচ্চা পাওয়ার কথা, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৯০ থেকে ১২০টি। দেশের মা মুরগি আছে, কিন্তু উৎপাদন কম। এর কারণ মুরগি অসুস্থ হয়। এ ক্ষেত্রে টিকা দেওয়া গেলে ভালো হতো। তিনি বলেন, পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে নতুনরা কম আসছে। এ অবস্থার মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো আয়কর আরোপ করা হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক।

সামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, বছরে একজন ব্যক্তি প্রোটিন পাচ্ছেন ১৮ থেকে ২০ কেজি। কিন্তু এটা ৩৫ থেকে ৪০ কেজি হওয়া উচিত। প্রোটিনের সহজলভ্যতা ছাড়া এটা বাড়ানো সম্ভব নয়। পোলট্রি এই জায়গা নিয়েছে এবং তাদের আরও বড় পরিসরে যাওয়ার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, এ খাতে মেয়েদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ আছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কাজী ফার্মসের দুটি পোলট্রি ফার্ম আছে, যার ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সব কাজ করেন নারীরা। দেখা গেছে, এ দুটি ফার্মের পরিচালনা ব্যয় অন্যান্য ফার্মের চেয়ে কম, আবার লাভ অন্য ফার্মের চেয়ে বেশি।

সুচাত শান্তিপদ বলেন, বাংলাদেশে পোলট্রির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ব্যক্তি খাতে এই শিল্প অনেক দূর গেছে। তিনি বলেন, এ দেশের মানুষ এখন তাদের প্রধান খাবার ভাতের বাইরেও বিকেলের নাশাতায় মুরগির মাংস খাচ্ছে।

এম নজরুল ইসলাম বলেন, এ খাতের বিকাশে ট্যাক্স-সংক্রান্ত যে প্রতিবন্ধকতা আছে, তা দূর করা দরকার। আমদানি নিয়েও কিছু বাধা আছে। সেগুলো সরকারকে দূর করতে হবে।

মো. সিরাজুল হক বলেন, পোলট্রিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে ভুল ধারণা আছে। মূলত চিকিৎসকের পরামর্শে কোনো কোনো খামারে প্রয়োজন হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। আর এটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর শরীর থেকে চলে যায়। তা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হলে মুরগির মাংসের দাম অনেক বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, পোলট্রি খাত অনেক আধুনিক হয়েছে।

 মনজুর মোরশেদ খান বলেন, এইচ-৯ ভাইরাসের টিকা আনা জরুরি। এই ভাইরাসের কারণে অনেক ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, অবৈধ পথে এই টিকা আসছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে এর মান পরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। এ খাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটা খুবই জরুরি।

সাইদুর রহমান বাবু বলেন, পোলট্রি নীতিমালা ও আইন বাস্তাবায়ন করা দরকার। পোলট্রি খাতের উন্নয়নে কী করা যায়, সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া দরকার।

আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পোলট্রি প্রোটিনের চাহিদা পূরণে অন্যতম খাত। বিগত কয়েক বছরে পোলট্রি খাতের সম্প্রসারণের কারণে দেশের মানুষের গড় উচ্চতা বেড়েছে। তিনি বলেন, পোলট্রি শিল্পের অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকারের উচিত সম্ভাব্য সবকিছু করা।

 

সৌজন্যে : প্রথম আলো। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত