২১ জানুয়ারী, ২০১৭ ১১:১০ এএম
ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরী

হৃদয় কাটার প্রথম নারী সার্জন

হৃদয় কাটার প্রথম নারী সার্জন

আমাদের দেশে নারী কার্ডিয়াক সার্জন এই মুহূর্তে একজনই। এর আগে একজন শুরু করেছিলেন, কিন্তু কাজটা চালিয়ে যেতে পারেননি। তাই তাকেই প্রথম ও একমাত্র বলা যেতে পারে। তিনি ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরী। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম নারী যিনি নিজেকে গড়েছেন স্পেশালিস্ট কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে। অথচ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি মানুষের হৃদয় কেটে রোগ নিরাময় করেন। অসুস্থ হৃদয়কে করে তোলেন সুস্থ। ছিপছিপে গড়নের সদা হাস্যোজ্জ্বল সাবরীনার এই অগ্রযাত্রা যে কারও জন্যই অনুপ্রেরণীয়। তাকে নিয়ে লিখেছেন— তানিয়া জামান

নিজের অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন কতজন? কতজনই বা পারেন ছোট বেলায় স্থির করা কঠিন লক্ষ্যকে জয় করতে? কেউ কেউ হয়তো পারেন। তাদের মধ্যে একজন ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরী। ক্যারিয়ার হিসেবে এমন কিছু বেছে নিতে চেয়েছিলেন যা আর দশটা সাধারণ মেয়ে ভাবতেও সাহস পায় না। এমন পথে নিজের পদচিহ্ন রাখতে চেয়েছেন যেখানে তিনিই প্রথম নারী হবেন। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন ধৈর্যের সঙ্গে। আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে...

শাড়ি পরলে পাল্টে যায় চেহারার গতি-প্রকৃতি আবার সালোয়ার কামিজে তিনিই কলেজ বালিকা বনে যান। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন নায়িকা হবেন। শখের বশে নাচতেও শিখে নিয়েছেন ভালো। কিন্তু নায়িকা হওয়ার চেষ্টাটাই শেষ পর্যন্ত করা হয়নি! বাবার কড়া শাসন আর মায়ের স্নেহের সঙ্গে নিজের মেধা ও চেষ্টা তাকে ক্যারিয়ার সচেতন একজন মানুষে পরিণত করেছে। নইলে কার্ডিয়াক সার্জারির মতো কঠিন বিষয় কেন তাকে আকৃষ্ট করবে। আর তিনিই বা কেন আনন্দের সঙ্গে কাজটিকে উপভোগের চেষ্টা করছেন? সব সময় হাসিভরা মুখের অধিকারী ডা. সাবরীনা চেষ্টা করেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিবিড়ভাবে উপভোগের। গল্পটি দেশের একমাত্র নারী কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরীর।

 

একলা একজন

ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরী বাংলাদেশে প্রথম নারী যিনি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জটিল অপারেশনে হাতে তুলে নিয়েছেন ছুরি-কাঁচি। দেশের আনুমানিক ১৫০ স্পেশালিস্ট কার্ডিয়াক সার্জনের মধ্যে তিনি একমাত্র নারী। বেশ কিছুদিন আগেও অনেকে ভাবতে পারতেন না কার্ডিয়াক সার্জারিতে কোনো নারী ডাক্তার। সাধারণত হার্টের একটি অপারেশনে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। রোগীর জ্ঞান ফিরতে সময় লাগে আরও কয়েক ঘণ্টা। সব মিলিয়ে এত সময় ধরে একটি অপারেশনে মনোনিবেশ করা অনেকটা সাধনার মতো। নারীদের সাংসারিক ও পারিপার্শ্বিক অনেক ঝামেলা থাকায় তাদের পক্ষে এতটা সময় মনোনিবেশ করা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা ছিল সবার। কিন্তু ডা. সাবরীনা প্রথম চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন। নিজেকে কঠিন মুহূর্তেও ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে প্রমাণে শপথ নেন।

 

পুরুষ হলে নারী কেন নয়?

হার্টের অপারেশন বেশ জটিল ধরনের হয়ে থাকে। সামান্য ত্রুটিতে এখানে রোগীর বাঁচা-মরা নির্ভর করে। তাই দায়িত্ব পালনের সময় ডাক্তারকেও হতে হয় বিচক্ষণ ও নিবেদিতপ্রাণ। জাগতিক সব দায়িত্ব থেকে নিজেকে নির্ভার করে অস্ত্রোপচারে অংশ নিতে হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে একজন পুরুষই সঠিক ভূমিকা রাখতে পারে বলে অধিকাংশ লোক ভাবতেন। আবার মানুষও সহজাতভাবে পুরুষ সার্জনদের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরীর নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন ছিল। ‘পুরুষ যদি কার্ডিয়াক সার্জন হতে পারে নারী কেন নয়?’ এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে নিজেই হাজির হলেন প্রশ্নের জবাব হিসেবে। প্রমাণ করলেন নারীরাও পারে এমন গুরুদায়িত্বকে নিজ হাতে পালন করতে।

 

বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা

ডাক্তারি পেশা হিসেবে প্রথম যখন এই বিষয়ে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন, শিক্ষকরা পর্যন্ত অবাক হন। কার্ডিয়াক বিষয়টি এমনিতেই অনেক কঠিন। এখানে ছেলেরাও কম আগ্রহ দেখান। সেখানে একটি মেয়ে এ বিষয়ে পড়ার আগ্রহ দেখিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু সাবরীনার দৃঢ় মনোবল নিজের ইচ্ছা থেকে একচুলও সরাতে পারেনি। সরকারি চাকরিজীবী বাবা ও গৃহিণী মায়ের ঘরে দুই বোনের মধ্যে বড় ডা. সাবরীনা। ছোটবেলায় অনেক বেশি পড়ার স্মৃতি ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই মনে করতে পারেন না। তবে ভাবতেন বাবা-মা যেন কখনো ছেলের অভাব বোধ না করেন। তাই এমন কিছু করার ইচ্ছা ছিল যা এখন পর্যন্ত ছেলেদের দখলে। যেখানে সাধারণত মেয়েরা যেতে ভয় পায়। দারুণ মেধাবী ডা. সাবরীনা কার্ডিয়াক সার্জন হওয়াকে স্বপ্ন হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু করলেন। ডাক্তারি কঠিন পড়াগুলোও রপ্ত করতে থাকলেন নিজের প্রবল চেষ্টায়। পাশে থেকে দারুণভাবে মানসিক সাহস জুগিয়েছেন ডা. সাবরীনার স্বামী আরিফুল চৌধুরীও। এ বিষয়ে একমাত্র তিনিই ছাত্রী থাকায় অনেক সময় কুণ্ঠাবোধ করতে হয়েছে। সব সময় পড়ার বিষয়ে শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করতে লজ্জা পেতেন। শিক্ষক বা অন্য ছাত্ররা যেন না ভাবে, মেয়ে বলে পড়ার বিষয় কম বোঝেন। তাই নিজের চেষ্টাটা আরও বেশি বাড়িয়ে দিতেন তিনি। খুব দরকার হলে শিক্ষকের সাহায্য নিতেন। ডাক্তারি পড়া আয়ত্ব করতে ডা. সাবরীনার প্রচেষ্টা থেকেছে সব সময়। সফলতার সঙ্গে পার করেছেন প্রতিটি পরীক্ষা। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ট্রেনিং নিয়েছেন। সর্বশেষ এমএস কোর্স করেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল থেকে। পাস করার পর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঁচ বছর ধরে স্পেশালিস্ট কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন।

 

এগিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা

প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা হিসেবে ডা. সাবরীনা জানান, ‘প্রথম অপারেশন থিয়েটারে রোগীর হৃদযন্ত্রটি দেখে সামান্য ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু তার ধুকধুক শব্দ যেন আমাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে নিজের কাজে নিবেদিত থাকতে’। প্রতিটি অপারেশনের সময় ডা. সাবরীনার দায়িত্ব পৃথিবীর সবকিছু থেকে তাকে আলাদা করে দেয়। তখন তিনি শুধুই একজন দায়িত্বশীল ডাক্তার। নিজের দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ডা. সাবরীনা জানান, তার মায়ের নির্দেশে নিজের কাজে সব সময় মনোযোগী থেকেছেন। কাজকে সম্মান দিয়েছেন। প্রতিটি রোগীকে সমান গুরুত্ব দিতে শিখেছেন। পেশাটি যতই চ্যালেঞ্জধর্মী হোক না কেন ডা. সাবরীনা মনে করেন, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারীদের এগিয়ে আসা উচিত। আগ্রহী নারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাগত জানান। তার মতে, এমন সূক্ষ্ম যে কোনো কাজেই ধৈর্য, বিচক্ষণতা আর মমতার প্রয়োজন। কার্ডিয়াক সার্জারির মতো সূক্ষ্ম সার্জারিতেও একজন নারী সে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। তাই আমি চাই আরও অনেক নারী এই পেশায় এগিয়ে আসুক। ডাক্তারি পেশায় ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরী নিজেকে ধরে রেখেছেন দায়িত্ব কর্তব্যের শীর্ষে। তার কাছে ডিউটি মানে পুরোদস্তুর ডাক্তারি। সেখানে ব্যক্তিজীবন থাকে উহ্য। হাজার প্রয়োজন সামনে এসে হাজির হলেও দায়িত্ব পালনের সময় কোনো আপস করেন না। আপন কাউকে অপারেশন থিয়েটারে নিলেও প্রফেশনাল থাকেন বলে দাবি ডা. সাবরীনার। একবার নিজের মায়ের অপারেশনের সময় কাছে থাকতে পারেননি ডিউটির কারণে। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে ডাক্তারি পেশায় এসে।

 

ডাক্তার বাছাইয়ের সুবিধা

হৃদযন্ত্রের অপারেশনে দেশে নারী ডাক্তার না থাকায় রোগীদের ডাক্তার বাছাইয়ের বিষয় আগে কখনো বিবেচিত হয়নি। তাছাড়া হৃদযন্ত্রের অপারেশন মানেই বুকে কাটাছেঁড়া। তাই নারী রোগীরা অস্বস্তি বোধ করলেও পুরুষ ডাক্তার দেখাতে বাধ্য হয়েছেন। দেশে দক্ষ নারী কার্ডিয়াক সার্জন বেড়ে গেলে নারী রোগীর জন্য ব্যাপারটি স্বস্তির থাকবে।

 

মানবসেবা

অপারেশনের জন্য এত সময় দিতে হয় আবার নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারপরও তিনি চান সপ্তাহে বা মাসে দু-একদিন দূর-দূরান্তের রোগীদের সেবা দিতে। যারা অজ্ঞতার কারণে, অপারগতায় অথবা যোগাযোগের অভাবে সময়মতো ডাক্তার দেখাতে পারেন না তাদের জন্য ডাক্তারি ক্যাম্প বসাতে চান। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সাহায্য চান ডা. সাবরীনা। স্বেচ্ছাসেবক এবং আয়োজক পর্যায়ে অগ্রণী ভূমিকা তিনি আশা করেন। যাতে সহজেই তার সেবাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। আর্ত মানবতার সেবার পেছনে তার দেশপ্রেম সদা জাগ্রত। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে তার আত্মতৃপ্তি আসে। তিনি চান একটি মানুষও যেন অবহেলায় প্রাণ না হারান। কেউ যেন সামান্য সচেতনতার অভাবে দেহের মূল্যবান অংশ হৃদযন্ত্রকে অকেজো করে না ফেলেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ডা. সাবরীনার ইচ্ছা ঢাকার বাইরে কার্ডিয়াক সেন্টার খোলা। সেখানে জনগণের মাঝে বিনামূল্যে কার্ডিয়াক সেবা প্রদান করা হবে। এ ছাড়াও জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হবে যাতে কার্ডিয়াক রোগীরা দ্রুত সেবা গ্রহণ করে। এ ছাড়াও আশপাশের কাউকে অসুস্থ দেখলেও যেন তারা চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে যেতে পারে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব কম খরচে বিশ্বমানের সেবা পাওয়া যায় তা অনেকেই জানেন না। মাত্র এক লাখ টাকার বিনিময়ে একটি বাইপাস সার্জারি পর্যন্ত করা হচ্ছে। অপারেশনটি বিশ্বের সবচেয়ে কম খরচে করা হয়। সরকারি বরাদ্দ ভাল্ব কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও পাওয়া যায়। এসব তথ্য জনগণ জানলে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আর্থিক অনটনকে ভয় পাবে না। তাই সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শের অনুরোধ ডা. সাবরীনা আরিফ চৌধুরীর।

 

সাবধানতা সবার জন্য

সাধারণের উদ্দেশে তিনি বলেন, যাদের বংশে হার্টের সমস্যা আছে তাদের ৪০ বছর বয়স পার হওয়ার পর অবশ্যই সচেতন হতে হবে। খাওয়া-দাওয়া করতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে। টেস্ট করাতে হবে নিয়মিত। মানসিক চাপমুক্ত থাকতে পারলে হার্টসহ অন্যান্য রোগেও মুক্তি সম্ভব। নিয়মিত শরীরচর্চা মানুষকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়াও বিপদের দিনে সহায় হতে পারে হেলথ পলিসি। তাই প্রত্যেকের হেলথ পলিসি থাকা জরুরি বলে মনে করেন ডা. সাবরীনা। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, অনেক রোগী আমাদের কাছে আসার পর অপারেশনের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়েন। আর্থিক সামর্থ্যহীন এসব লোক আমাদের কাছ থেকে দুই তিন মাস সময় নেন টাকা জোগাড় করার জন্য। অথচ দুই থেকে তিন মাস দেরি করায় বিপদ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শেষমেশ টাকার জোগাড় হলেও রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয় না। তাই প্রত্যেকের উচিত আগে থেকে সাবধান হওয়া।

 

গুণী ডা. সাবরীনা

মানুষের হৃদয় কাটাছেঁড়ার মতো এমন কঠিন কাজ করলেও ডা. সাবরীনা কিন্তু বেশ সাহিত্যপ্রেমী। চরমভাবে ভালোবাসেন বাংলা সাহিত্যে মজে থাকতে। অনেক অনুষ্ঠানে মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশন করে সুনামও কুড়িয়েছেন। এ ছাড়াও ভালো লাগার বিষয় হিসেবে আছে যে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করা। আত্মতৃপ্তি খুঁজে পান মানবসেবায়। পারিবারিক বলয়ে শান্তশিষ্ট মেয়ে হয়ে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

 

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত