১৬ জানুয়ারী, ২০১৭ ০২:৫৮ পিএম

হৃদরোগ হাসপাতালে যেন রোগীর মিছিল

হৃদরোগ হাসপাতালে যেন রোগীর মিছিল

হাসপাতালের কোনো শয্যাই ফাঁকা নেই। শয্যা ছাপিয়ে বারান্দা, করিডোর থেকে শুরু করে সিঁড়ি পর্যন্ত রোগীর লাইন। মেঝেতে অতিরিক্ত শয্যা দেওয়ার পরও রোগীর ভিড় সামলাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। রোগীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শয্যা বিছিয়ে শুয়ে আছেন। কর্তৃপক্ষ দ্রুত সেবা দিয়ে তাদের রিলিজও দিচ্ছেন। এর পরও রোগীর চাপ হাসপাতালে। যেন রোগীর মিছিল!

এটি রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বাস্তব চিত্র। ৪১৪ শয্যার এ হাসপাতালে সব সময় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগী থাকার কারণে সেবার গুণগতমান নিশ্চিত করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এর পরও দরিদ্র মানুষের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল।

হৃদরোগে আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আরও একটি নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি সমকালকে বলেন, হৃদরোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসা পাওয়ার কারণে রোগীরা এই হাসপাতালে আসেন। কিন্তু শয্যা সংখ্যার তুলনায় সবসময় রোগী চাপ বেশি থাকে। এতে করে হাসপাতালের স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হয়। শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হলে এই সেবার মান আরও বাড়বে। তাই নতুন আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হবে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জরুরি ও বহির্বিভাগে মোট ১৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩৮ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৭২ জন। মোট রোগীর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৮৪ হাজার ১২৪ জন, নারী ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৪৯ জন এবং শিশু ৮৮ হাজার ৫৬৭ জন।

তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ৮৪০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন যশোরের রাজিয়া খাতুন। তিনি জানান, হার্ট অ্যাটাকের পর স্থানীয় হাসপাতালে গেলে সেখানে থেকে চিকিৎসকরা এই হাসপাতালে রেফার করেন।

মেঝেতে বিছানা পেতে থাকা অন্তত ১০ রোগীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ। কারও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। তারা জানিয়েছেন, মেঝেতে থেকেও তারা স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। হাসপাতালের বাথরুম-টয়লেটও অপরিচ্ছন্ন। তাছাড়া হাসপাতালের একশ্রেণির কর্মচারী রোগীর চাপ কাজে লাগিয়ে শয্যা নিয়ে বাণিজ্য করছে।

হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কেন এত ভিড়- এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে হৃদরোগের জন্য চালু থাকা সেবাকেন্দ্র চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে কার্ডিওলজিস্ট পাওয়া গেলেও মফস্বল শহরে তা নেই।

দক্ষ চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে দেশের জেলা সদরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগ সেবা খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আটটি সরকারি মেডিকেলে অল্পবিস্তর হৃদরোগের সেবা দেওয়া হচ্ছে। করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে সেখান থেকে তারা রোগীদের ঢাকায় রেফার করতে বাধ্য হন।

ফলে ভিড় বাড়ছে সরকারি এই হাসপাতালে। তবে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এ হাসপাতালটিতে সঠিক সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। ওয়ার্ডের সব এসি অকেজো হয়ে পড়ায় রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল: ১৯৭৮ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যাত্রা শুরু। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিক ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচালক।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন পিজি হাসপাতালে) একটি কার্ডিওভাসকুলার বিভাগে হার্টের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হতো। আবদুল মালিক ছিলেন ওই বিভাগের প্রধান।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

১২৫ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী নিয়ে ১১০ শয্যার এই হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তখন বহির্বিভাগ ছিল না। ইনডোরের চিকিৎসকরাই বহির্বিভাগে রোগীদের সেবা দিতেন। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যাও ছিল অপ্রতুল। হার্টের রোগের চিকিৎসা সহায়তা করতে এগিয়ে আসে জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা: ৪১৪ শয্যার এই হাসপাতালতে তিন শতাধিক চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ হাজার জনবল রয়েছে। গত বছর নতুন ১, ২ এবং ৩ নম্বর ক্যাথল্যাব, শিশুদের জন্য পৃথক আইসিইউ ইউনিট, পুরনো আইসিইউ ইউনিটের আধুনিকায়ন, মহিলা পেয়িং ওয়ার্ড, ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, ইমার্জেন্সি ভাসকুলার ওয়ার্ড, আধুনিকায়ন কম্পিউটারাইজড রেকর্ড সংরক্ষণ সিস্টেম, বায়োকেমিস্ট্রি, ব্লাড গ্যাস ও কার্ডিয়াক মার্কার এনালাইজার স্থাপন করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এসব উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে পাঁচটি ক্যাথল্যাবের মধ্যে চারটি সচল রয়েছে। তিনটি ক্যাথলাবে গড়ে ১০টি করে এনজিগ্রাম করা হয়। অপর একটি পেসমেকার বসানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে শিশুদের জন্য পৃথক কোনো ক্যাথল্যাব নেই। বড়দের ক্যাথল্যাব রুটিন করে শিশুদের জন্য ব্যবহার করা হয়।

হৃদরোগের সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবা এই হাসপাতালে দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার না করেই হার্টের জন্মগত ছিদ্র বন্ধ করা হয়। ছয় ঘণ্টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের কোনো রোগী এলে প্রথমে ক্যাথল্যাবে নিয়ে এনজিওগ্রাম করে প্রয়োজনে রিং লাগিয়ে দেওয়া হয়।

মোট শয্যার ৬০ শতাংশ ফ্রি এবং ৪০ শতাংশ পেয়িং। কেবিনের সংখ্যা ৩০টি। করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ৪৭টি শয্যা এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ১৭টি শয্যা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে চলতি মাসে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। 

অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান সমকালকে বলেন, শয্যা সংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপের বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। দ্রুত শয্যা সংখ্যা সমাধানের জন্য হাসপাতালের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি মত দিয়েছেন। অন্তত আরও তিনতলা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ হলে রোগীর চাপ কিছুটা সামলানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া আরেকটি নতুন ভবনও নির্মাণ করা হবে।

শয্যা নিয়ে বাণিজ্যের বিষয়ে পরিচালক বলেন, শয্যা বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করি না। একটি শয্যা ফাঁকা হলে অন্তত ১০ জন তা পেতে প্রতিযোগিতা করেন। এই সুযোগে কেউ কেউ অনিয়ম করে। তবে এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্সদের দিয়ে শয্যা বণ্টনের চিন্তা-ভাবনা চলছে। এটি করা গেলে বাণিজ্য বন্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।

জানা গেছে, কুয়েত রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহায়তায় গত ৭ থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৫ শিশুকে জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসায় দেওয়া হয়েছে। শিশু হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার সমকালকে বলেন, অস্ত্রোপচার না করে বেলুন পদ্ধতিতে বাল্বের এবং ডিভাইসের মাধ্যমে হার্টের ছিদ্র বন্ধ করার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ের এ চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দরিদ্র রোগীদের দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত ৭ বছরে জন্মগত হৃদরোগ আক্রান্ত ৩৫১ জন এ সুবিধা পেয়েছে।

সৌজন্যেঃ সমকাল

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি