১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৪:১৩ পিএম

ডা. প্রদীপের নেতৃত্বের জটিল এইচওসিএম রোগের অস্ত্রোপচারে বিস্ময়কর সাফল্য

ডা. প্রদীপের নেতৃত্বের জটিল এইচওসিএম রোগের অস্ত্রোপচারে বিস্ময়কর সাফল্য
এইচওসিএম রোগে আক্রান্ত ১১তম রোগী দেখছেন এনআইসিভিডির সহযোগী অধ্যাপক প্রদীপ কুমার কর্মকার। ছবি: আহমেদ শাফিন

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়ে শুরু হয়েছে হৃৎপিণ্ডের বংশগত রোগ হাইপারট্রপিক অবসট্রাকটিভ কার্ডিওমায়োপ্যাথিতে (এইচওসিএম) আক্রান্ত রোগীদের বুক না কেটে যুগান্তকারী চিকিৎসা।

২০১৮ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকারের হাত ধরে এই চিকিৎসার সূচনা হয়। এ পর্যন্ত ১১ জন এইচওসিএম রোগী তাঁর অধীনে সেবা পেয়ে সুস্থ হয়েছেন। তার হাত ধরে দেশে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসায় সাফল্যের হারও আন্তর্জাতিকমানের।

সম্প্রতি এনআইসিভিডিতে এই চিকিৎসা পদ্ধতির সম্ভাবনাসহ নানা দিক নিয়ে মেডিভয়েসের সঙ্গে আলাপ হয় ডা. প্রদীপ কুমারের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন

মেডিভয়েস: দেশে প্রথম সরকারিভাবে এইচওসিএম রোগীদের যুগান্তকারী একটি চিকিৎসা পদ্ধতি আপনার মাধ্যমে শুরু হলো, আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই?

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: আমার কাছে খুব ভালো লাগছে। এই বিষয়টা নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছিলাম। এইচওসিএম রোগটি হার্টের মাংসপেশীর জটিল রোগ। এটি বংশগত ও জন্মগত রোগ। জেনেটিক ও জিনগত রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কমন এটি। পৃথিবীতে প্রতি ৫০০ জনে একজন এ রোগে আক্রান্ত। যদিও বাংলাদেশে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ৫০০ জনে একজন এ রোগে ভুগছেন। এই রোগের চিকিৎসা নিয়ে আরও বিশদভাবে কাজ করতে চাই।

মেডিভয়েস: এ চিকিৎসা পদ্ধতির শুরুর এবং এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের গল্পটা শুনতে চাই?ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: এই রোগের দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি পৃথিবীতে আছে। একটা হলো, বুক কেটে অতিরিক্ত মাংস বের করে ফেলা, এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি। এই চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশসহ বিশ্বে অপ্রতুল। আরেকটি হলো বুক না কেটে ক্যাথেটার সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হার্ট অ্যাটাক করিয়ে ১০০ শতাংশ অ্যালকোহল দিয়ে চিকিৎসা। এতে হার্টের মাংসপেশী পাতলা হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়।গত কয়েক দিন আগে সফলভাবে ১১তম রোগীর অ্যালকোহল সেপ্টাল অ্যাব্লেশন পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার করেছি। বর্তমানে তিনি ভালো এবং সুস্থ আছেন। এ ছাড়া আমার শিক্ষাজীবনে এই রোগ সম্পর্কে আগ্রহ জন্মে। সেই সঙ্গে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি এবং এই রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে হওয়া দরকার বলে মনে করি। পরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আমি ভারত যাই। সেখানে বিশদ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। বাংলাদেশে এসে এই রোগের চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করি। এই পদ্ধতিতে মোট ১১ জন রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা ভালো ও সুস্থ আছেন। 

মেডিভয়েস: চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো, এর ফলে রোগীরা কতটুকু উপকৃত হবেন?

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: আমরা যতজন রোগীকে সেবা দিয়েছি, সবাই দুই-তিন দিনের মধ্যে ভালো অনুভব করেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। কয়েক দিন আগে যে রোগীর সেবা দেওয়া হয়েছে, তিনি ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট। তিনি ঘনঘন অজ্ঞান হয়ে যেতেন এবং অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কাজ হয়নি। সবশেষ, হাসপাতাল থেকে তাকে বলা হয়েছে, বিদেশ চিকিৎসা নেওয়ার জন্য এবং দেশে এই রোগের চিকিৎসা নেই। এ দেশের চিকিৎসকদের দিয়ে তার কাজ হবে না।

পারিবারিকভাবেও তিনি চাপ এবং দুশ্চিতার মধ্যে ছিলেন। অনেক পরে তিনি জানতে পারেন, এই রোগের চিকিৎসা করতে হবে। ইকো বা ইসিজি করে রোগ শনাক্ত করা যায়। তাঁর রোগ অনেক পরে শনাক্ত করা গেছে। তিনি ২০০৮ সাল থেকে এইচওসিএম রোগে ভুগছেন। বর্তমানে তিনি আমাদের চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছেন।

আমরা ১০০ শতাংশ অ্যালকোহল দিয়ে ক্যাথেটার পদ্ধতিতে এই চিকিৎসা দিয়ে থাকি। এতে রোগী অল্প সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। অপারেশন থিয়েটারে সময় লাগে ২০-৩০ মিনিট, রোগী একদিন করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) থাকেন। তৃতীয় দিনে রোগীকে আমরা ছুটি দিয়ে দেই। এই হলো, এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি।

মেডিভয়েস: দেশে এই চিকিৎসার সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বলুন।

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: এই রোগের চিকিৎসার মূল প্রতিবন্ধকতা হলো, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি এখনও বাংলাদেশে নেই, বিদেশ থেকে নিয়ে আসা লাগে। আর ১০০ শতাংশ অ্যালকোহল জোগাড় করাও কঠিন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং হলো, রোগীর সচেতনতা। এইচওসিএম রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীই জানেন না, কোথায় চিকিৎসা হয় এবং কার কাছে যেতে হবে।

ঢাকা শহরে অন্তত ২০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এই মানুষগুলো তাঁর ব্যক্তিগত এবং সমাজ জীবন ঠিক মতো কাটাতে পারছেন না। তাদের চিকিৎসা করাতে পারলে একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।

মেডিভয়েস: এ চিকিৎসায় দেশ ও বিদেশে খরচের পার্থক্য বলুন।

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: বুক কেটে ওপেন হার্ট সার্জারি করালে এই রোগের চিকিৎসায় ৫-৭ লাখ টাকা খরচ হয়। আমরা ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতিতে যেটা করেছি বিদেশে এর খরচ হয় ২-৩ লাখ টাকা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আমরা ৩০-৩৫ হাজার টাকায় এই রোগের সেবা দিতে পারি। অথচ গুণগত দিক থেকে এটা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের সেবা। সরকার এই রোগের যন্ত্রপাতিগুলো এনে দিলে বিনামূল্যেও করা সম্ভব হবে।

মেডিভয়েস: দেশে এই চিকিৎসায় সাফল্যের হার জানতে চাই।

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: কয়েক দিন আগে বুক না কেটে ১১তম রোগীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছে। যারাই সেবা নিয়েছেন, আমরা তাঁদের ফলোআপে রাখছি। তাঁরা খুব ভালো এবং সুস্থ আছেন।

মেডিভয়েস: এ রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: এই রোগে আক্রান্তদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক রোগীই চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আর এই রোগীগুলোর বেশিরভাগই বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এতে আমাদের দেশের টাকাও বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশেই এই রোগের চিকিৎসার প্রসার ঘটানো দরকার। সামর্থের অভাবে অনেক রোগী দেশের বাইরে যেতে পারেন না, অন্তত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

মেডিভয়েস: এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার: আমি চিকিৎসা দিচ্ছি এবং আমার টিমে ১০-১২ জন চিকিৎসক রয়েছেন। তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে কল আসছে, তাঁদেরকে সেবা দেওয়া চেষ্টা করছি। দেশের যেকোনো প্রান্তে গিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার ইচ্ছা আছে আমাদের। কিছু দিন আগে ঢাকা মেডিকেল থেকে ফোন এসেছে, তাঁদের রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। আর যারা ঢাকায় আসতে পারবেন না, তাদের নিকটস্থ মেডিকেলের ক্যাথেল্যাবে তাঁরা ভর্তি হলে আমাদের টিম গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসতে পারবে। এতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা চাই, এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তৃতি ঘটুক এবং রোগীরা ভালো সেবা পাক।

বেড়ে ওঠা

ডা. প্রদাপ কুমার কর্মকার ফেনী জেলায় জন্মাগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে এসএসসি এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি কোর্স (পোস্ট গ্রাজুয়েশন) সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে কুমিল্লার মুরাদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সহধর্মিনী রত্না পালও একজন চিকিৎসক। তিনি গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিকেলের গাইনি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। পারিবারিকভাবে তিন কন্যা সন্তানের জনক তিনি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : এনআইসিভিডি
দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস বিভিন্ন মেডিকেলের

বর্ধিত ভাতা পাচ্ছেন ৭ বেসরকারি মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক