০৮ জানুয়ারী, ২০১৭ ০৮:৫৯ এএম

ভেজাল রক্ত থেকে সাবধান

ভেজাল রক্ত থেকে সাবধান

রাজধানীতে চলছে রক্ত নিয়ে ভয়ঙ্কর কারবার। সুস্থতার আশায় ব্লাডব্যাংক থেকে কেনা রক্তে রোগীরা বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মরণব্যাধির মারাত্মক সব ভাইরাস। আর এ রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ রোগ-জীবাণু। বাড়ছে মরণব্যাধি এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। অন্যদিকে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগও দেশজুড়ে রক্ত পরীক্ষা আর নিরাপদ রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা রক্তে মিলছে মরণব্যাধির সব ভাইরাস। এসবের মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস-বি ও সি, এইচআইভি (এইডস), ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, এনিমিয়াসহ নানা রোগের জীবাণু। বিশেষজ্ঞদের মতে রোগীর স্বজনদের রক্ত এক্ষেত্রে নিরাপদ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্লাড ব্যাংকগুলো থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনায় হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস ও এইডসের জীবাণু পাওয়া গেছে। এ তথ্যানুযায়ী, পরীক্ষা করা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৬ ব্যাগ রক্তের মধ্যে ৩ হাজার ৪২৯ ব্যাগে বিভিন্ন রোগের জীবাণু পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৮৭ ভাগ ব্যাগের রক্তেই ছিল হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস। বাকি ব্যাগগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ব্যাগে হেপাটাইটিস-সি, ১৪২ ব্যাগে সিফিলিস ও ১৩ ব্যাগে এইচআইভি জীবাণু পাওয়া যায়, যা রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে বেশ উদ্বেগের বিষয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ‘রক্ত সঞ্চালন বিভাগ’ সূত্রে জানা যায়, এখানে গড়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ ব্যাগ রক্ত রোগীরা বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়ে যায়। স্ক্রিনিং করে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় ব্যাগ অনিরাপদ রক্ত পাওয়া যায়। এ হার আশঙ্কাজনক। অপরদিকে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী সংগঠন সন্ধানীর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পেশাদার রক্তদাতাদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। এইচআইভি, এইচসিভি, এইচভিএসজি, ভিডিআরএল ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের জীবাণু রয়েছে তাদের রক্তে। তাদের মতে, প্যাথেডিন জাতীয় মাদক নিতে গিয়ে এরা একে অপরের সুই ব্যবহার করে। যার মাধ্যমে রক্তে হেপাটাইটিস বি ও সি, এইডস জাতীয় রোগের জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। মাদকের টাকা জোগাড় করতেই  এরা প্রতিনিয়ত রক্ত বিক্রি করে। আর এদের ক্রেতা হচ্ছে রাজধানীর বৈধ-অবৈধ অধিকাংশ ব্লাডব্যাংক।

ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ব্লাড ট্রান্সমিশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিরাপদ রক্তের জন্য একজন রক্তদাতাকে কমপক্ষে ভয়াবহ পাঁচটি রক্তবাহিত ঘাতক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হয়। এগুলো হলো: হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি বা এইডস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিসের মতো কঠিন রোগ। সাধারণত সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন করা ঠিক নয়। আবার ‘ক্রস ম্যাচ’ ও স্ক্রিনিং রিপোর্ট ছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন করা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তা উপেক্ষা করায় তার ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৪০টির বেশি বেসরকারি ব্লাডব্যাংক রয়েছে। তবে সারা দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ব্লাডব্যাংকের সংখ্যা শতাধিক। অবৈধ ব্লাডব্যাংক তো নিয়ম মানছেই না, তার ওপর লাইসেন্স নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে বৈধ ব্লাডব্যাংকগুলো। তারা শুধু পেশাদার রক্ত বিক্রেতার কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তা প্যাকেটজাত ও ফ্রিজবন্দি করে তা চড়ামূল্যে বিক্রি করছে।

সূত্রমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলেও মিলছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ লাখ ব্যাগ। এসব রক্তের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের কার্যক্রমের আওতায় স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়ার মাধ্যমে আসছে ৮০ হাজার ব্যাগ। কিছু সংগৃহীত হচ্ছে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে। আর অবশিষ্ট রক্তের জোগান আসছে পেশাদার রক্তদাতার কাছ থেকে। যার সবটাই জোগান দেয় কথিত ব্লাডব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশজুড়ে অর্ধলক্ষাধিক পেশাদার রক্তদাতা রয়েছেন। এ সংখ্যা ঢাকাতেই শুধু ২৫ হাজারের বেশি। এসব পেশাদার রক্তদাতাদের একটি বড় অংশ নানা জটিল মরণ ভাইরাসে আক্রান্ত। তাদের বেশিরভাগ মাদকাসক্ত, হেরোইনসেবী ও নানা ধরনের ভাসমান মানুষ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই রক্ত রোগীর জন্য ব্যবহার অনেকটা মৃত্যুর পরোয়ানা। মাদকাসক্ত কিশোর থেকে সকল বয়সের নারী-পুরুষ রক্ত বিক্রি করে নিয়মিত গ্রহণ করছে মাদকদ্রব্য। নেশার উপকরণ ক্রয় করার জন্য তারা বিক্রি করছে রক্ত।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, মাদকাসক্ত তরুণ-যুবকসহ নারী-পুরুষের রক্তে মরণব্যাধি এইডস ও হেপাটাইটিস বি-ভাইরাসসহ নানা ধরনের সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু থাকার আশঙ্কা শতভাগ। মাদকাসক্তদের মধ্যে অনেকে নেশার ইনজেকশন প্যাথেডিন ব্যবহার করে থাকে। এই ইনজেকশন পুশ করার একই সিরিঞ্জ ও নিডল বহুবার ব্যবহার করা হয়। একসঙ্গে ৫-৬ জন একই সিরিঞ্জ ও নিডল ব্যবহার করে থাকে। এই সিরিঞ্জ ও নিডলের মাধ্যমে মরণব্যাধিসহ সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু সহজে ছড়ায়।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের ব্লাড ব্যবহারে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। তারা  বলেন, দূষিত রক্ত রোগীদের দেহে ব্যবহার করার ফলে লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। বাড়ছে এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি।

সৌজন্যে : মানবজমিন। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত