ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


০১ জানুয়ারী, ২০১৭ ১১:০৮ এএম

জীবনের খেরোখাতা

জীবনের খেরোখাতা

নতুন বছরের শুরু হলো হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে নাইট ডিউটি দিয়ে। চিকিৎসক জীবনের অনুষঙ্গই এমন। বিশেষ দিনগুলো বিশেষভাবেই কাটে। অন্যদের মতো বন্ধু আড্ডা গানে হারিয়ে যাওয়া আমাদের সাজে না। তবে এভাবেও জীবনটা পার করে দেয়া যায়। এর আবেশ ভিন্ন অনুভব ভিন্ন। নিতান্তই ভাবলেশহীন ভাবে যেভাবে আমরা কারও মৃত্যু সংবাদ কাউকে দেই ঠিক একই ভাবে হাতের আঙুল পিছলে বেরিয়ে যায় একেকটা উৎসবের দিন। বছরের প্রথম দিন শুধু নয়; অন্য অনেক উপলক্ষেও একই প্রবর্তনা।

আজ বিশেষ দিন বলে 'বিশেষ' কিছু রোগী পেয়েছি। ইংরেজী বছরের নতুন দিনকে ইংরেজদের মতোই উদযাপন করতে গিয়ে রঙিণ তরল পান করে বেসামাল হয়ে যায় কেউ কেউ। এদের মধ্য থেকেই কয়েকজন হাত পা কেটে চিকিৎসার জন্য চলে এসেছিলো আমাদের কাছে। এলাকার বখাটে ছেলেদের ছুড়ে দেয়া আতশ বাজীতে আঘাত পেয়ে আহত হয়েও এসেছে একজন।

গড়পড়তা অন্য রোগীও আছে। স্বামীর অবহেলায় কষ্ট পেয়ে সাময়িক মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত নারী, দারুণ জ্বরাক্রান্ত শিশু, হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে ঘাড় ব্যাথার অভিযোগ করা বয়সী প্রবীণ, হার্ট এটাক করে রাস্তাতেই মারা যাওয়া নিথর দেহ নিয়ে আসা উৎকন্ঠিত স্বজন, দারুণ পেট ব্যথায় টিকতে না পেরে চলে আসা নানা বয়সের মানুষ; এরা সবাই ইমার্জেন্সী বিভাগের নিয়মিত অনুষঙ্গ। এদের নিয়েই দিন কাটে আমাদের; রাতের ফেরারী প্রহর সাক্ষী হয় ভোরের কুসুম সূর্যের।

রাত তিনটার দিকে একটা ছেলে এলো কাটা পা নিয়ে। তার সাথে দুইজন বন্ধু। না বড় লোকের বখে যাওয়া সন্তানের মতো উৎসবের উপলক্ষ খুজে সে লাল পানি খেয়ে মাতলামি করে পা কাটেনি। কোন এক ছাপাখানায় 'ওভারটাইম' করতে করতে ক্লান্তিতে ভারী যন্ত্রাংশ হাত থেকে পিছলে পড়ে গেছে। তাতেই তার পা থেতলে গেছে।

ছাপাখানাগুলোতে চলছে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার বানানোর ধুম। অগুনতি মানুষের জন্য উপহারের ডালি হিসেবে বানানো ক্যালেন্ডার ছাপানোর কাজ তাকে এতো রাতেও ঘুমাতে দেয়নি। ক্লান্তি ভুলে কাজ করতে বাধ্য করেছে। আবার সে আহতও হয়েছে দুর্ভাগ্যের কারণে। এই 'নিউ ইয়ার' তাকে 'হ্যাপি' হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পেরেছে কিনা জিজ্ঞেস করিনি। তবে ব্যথার ঘোরে বলতে শুনেছি এর চেয়ে একেবারে মরে যাওয়াই ভালো! এতো কষ্ট তার ভালো লাগে না।

আমি ডাক্তার। কখনো কখনো ভালোর জন্যেই রোগীকে আমি কষ্ট দেই; দিতে হয়। আমাকে নিষ্ঠুর হতে হয় তুলনামূলক ভালোর জন্য। তার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। পায়ে সেলাই দিতে হবে কয়েকটা। তীক্ষ্ণ সুই নির্মম হুল ফোঁটাবে বেশ কয়েকবার। ব্যথা নাশক দেয়ার প্রক্রিয়াও কম ব্যথাযুক্ত না। তাই এ সময়টাতে রোগীকে আমরা এটা সেটা বলে মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করি। সৃষ্টিকর্তার নাম ডাকতে বলি অক্ষমের আশ্রয় হিসেবে। তাকেও বললাম।

সে একবারও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলো না। যতোবার সে ব্যথায় কাতরেছে সে বিভিন্ন ধরণের বাক্য আওড়েছে। কখনও বন্ধুকে ডেকেছে। কখনও এটা ওটা বলে চিৎকার করেছে। কিন্তু পুরো সময়টাতে একবারও সৃষ্টিকর্তার নাম সে মুখে নেয়নি! অথচ আমি জানি সে মুসলিম। একটু অবাক হলাম। খেয়াল করে দেখলাম সে সচেতন ভাবেই নামটি উল্লেখ করেনি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম? সে জবাব দেয়নি। হয়তো দুঃখ কষ্টে থেকে স্রষ্টার প্রতি তার অভিমান জন্মেছে। এতোটা কষ্টের সময়েও তাই সে স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাওয়ার আগ্রহ পায়নি। হয়তো ভেবেছে কি লাভ হবে এ নাম নিয়ে? জীবনে তো কষ্টই করতে হচ্ছে তাকে!

তার অস্বাভাবিক আচরণ আমার মনে দাগ কাটলো। জীবনের দার্শনিক রূপ, জীবন পরিচালনার বিধান, ধর্ম, জীবনবোধ আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে যতোটা প্রভাব তৈরী করে অতোটা প্রভাব কেন যেন নিন্মবিত্ত এ সব খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে ফেলতে পারে না। ওদের অধিকাংশের কাছে জীবন মানে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কোনভাবে জীবনের সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। হাজারো অপ্রাপ্তি আর না পাওয়ার অভিমান কোন আত্মঘাতী নেশা বা কাজ দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করা। অদ্ভুতভাবে উচ্চবিত্তদের মতো ওরাও ভীষণ বস্তুবাদী। সমাজের দুই প্রান্তে বাস করেও এই একটি ব্যাপারে দারুণ মিল। ওদের কাছে জীবনের দর্শন মানে দুবেলা দুমুঠো ভাত। জীবনের বোধ মানে যে কোনভাবে পৃথিবীতে টিকে থাকা। এর জন্য যদি কোন অন্যায় করতে হয়, কারও সাথে বিছানায় যেতে হয় তবে তাই সই। বেঁচে থাকাটাই মুলকথা; জরুরী কাজ।

সম্মান-মর্যাদা, সতীত্ব-সম্ভ্রম, জীবনের প্রকৃত আদর্শ, গভীর জীবনবোধ; মধ্যবিত্তের ঘরের গুরুত্বপূর্ণ আসবাব। নিন্মবিত্তের ছাপড়া ঘরের সংকীর্ণ কুঠুরীতে এদের থাকার জায়গা থাকে না আর উচ্চবিত্তের বিলাসী আসবাবপত্র আর জৌলুসের তোড়ে এসবের উপস্থিতি কেবলই বাহুল্য। বিপ্লবীরা এসবের যোগ-বিয়োগ করে, চর্চা-গবেষণা-অনুধাবন করে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়। একই সমাজের ভিন্ন দুই প্রান্তিকের মানুষেরাও জীবন কাটায়; তবে ভিন্ন ব্যকরণে!

জীবন আসলেই বড় বিচিত্র, আসলেই অনেক বর্ণিল...

০১.০১.২০১৭

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না