ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. সারওয়াট জাবিন আনিকা

ডা. সারওয়াট জাবিন আনিকা

 মেডিকেল অফিসার, মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলা। 


২৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১১:৩৪

মনপুরার ডায়েরী-১

মনপুরার ডায়েরী-১

সারওয়াট জাবিন আনিকা : 

বাসায় পা রেখেই প্রথম মুখে যে কথাটা এলো- "এ কোন ভাগারে আনলে আমাকে!" আসলেই ভাগার- দেয়াল থেকে চুন প্লাস্টার খসে পড়ছে, বানানোর পর থেকে মনে হয় কেউই ঘর পরিষ্কার করেনি, ঝুল আর মাকড়শায় পুরোই ভূতুড়ে বাড়ি। লাজুক মুখে ওর উত্তর- "মনপুরায় স্বাগতম!"

ওর অফিসের দুই স্টাফকে নিয়ে ঘরগুলো বাসযোগ্য করলাম দুইজন মিলে। মনপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভোরবেলা যতটা মুগ্ধ করেছিল, বেলা বাড়তে এই ফাংগাস আর মাকড়শার বাড়াবাড়িতে তা পুরোই উবে গেল। আমার মাকড়শাভীতি দেখে খেজুরের ডাল ভেংগে এনে ও সব পরিষ্কার করলো, মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল- বাড়ীতে তেলাপোকা দেখে "আম্মা" বলে আতংকিত চিৎকার দিলেই মা ঝাঁটা বা স্যান্ডেল হাতে ছুটে আসেন এই ধাড়ী মেয়ের কাছে; তাঁর ছেলে এখন সে অভাব পূরনের চেষ্টা করছে।

আমার সারা জীবনের শখ ছিল মিনিমাম জিনিস নিয়ে থাকব, যা না হলেই না তা নিয়ে। মনপুরায় এসে সে শখ পূরণ হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ. তোষক পেতে মাটিতে একখানা বিছানা- ফার্নিচার বলতে এই আমাদের. বাসার পাশের গাছে শুধু পাখি আর পাখি. সামনে ছোট্ট সৌখিন বাগান - ওর লাগানো লেবু গাছ, পেয়ারা গাছ, এ্যালোভেরা, তুলসী, ক্যাপসিকাম,চেরী আরো বেশ কিছু। বেডরুমের জানালা দিয়ে আসা মিঠে রোদ, পাখির ডাক আর সবুজের মেলা দেখে মনে হল- এইজন্যেই বুঝি ও মনপুরার প্রেমে পড়েছে; শহরের ভীড়ভাট্টা -কোলাহল থেকে দূরে শান্ত সুন্দর এই দ্বীপ আমারও আপন হয়ে যাবে মাকড়শা, ফাংগাস, হিউমিডিটির অত্যাচার শর্তেও। এইখানে ইলেকট্রসিটি নাই- সারাদিন অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন সন্ধ্যা আসবে -সন্ধ্যা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত কারেন্ট থাকে এই দ্বীপে। লঞ্চ থেকে ভোরের প্রথম আলোয় কুয়াশার চাদর মোড়া দ্বীপ দেখেই এর প্রেমে পড়েছি। সুস্থ মস্তিস্কের শহুরে মানুষেরা এই কাজ করে না যা আমরা করছি- আমাদের পরিবার আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাপোর্ট আর দু'য়া-ই সম্বল এখানে।

এইখানের মানুষেরা খুব আন্তরিক, বিশেষ করে ডাক্তারদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ দেখার মত। প্রায় একলাখ মানুষের জন্যে তিনজন ডাক্তার আর হাতে গোনা কিছু স্টাফ নিয়ে মনপুরা হেলথ কমপ্লেক্সের ইউএইচএফপিও এর পরিশ্রম ও আন্তরিক চেষ্টা সত্যি প্রশংসনীয়। প্রচন্ড তৎপর এবং পরিশ্রমী একজন মানুষ ডা: মাহমুদুর রশীদ স্যার, ইউএইচএফপিও মনপুরা হেলথ কমপ্লেক্স। আমাদের সমাজে এমন স্বার্থহীন মানুষ আরো দরকার- এমন ডাক্তার আরো প্রয়োজন যারা মাসে আড়াই-তিন লাখ টাকার প্র‍্যাকটিস পায়ে ঠেলে দেশের দুর্গম অঞ্চল গুলোতে শুধু মানবতার স্বার্থে নিরলস কাজ করে যান।

স্যার আমাকে বারবার এক কথাই বলছিলেন- "খুব সাহসী মেয়ে তুমি. এমন কাজ সবাই করে না." মনপুরার ইতিহাসে আমি প্রথম ফিমেল ডক্টর- শুনে লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেল। এতকিছু ভেবে আমি এইখানে আসিনি কিন্তু, ইশফাকের জন্যেই আসা। দ্বিতীয়ত্ব, ও যখন মনপুরার মানুষদের কষ্টের কথা বলেছিল সেকেন্ড কোন থট দেইনি- সিম্পলি দুই রাকাত ইশতেখারার সালাহ পড়ে ব্যাগ গুছিয়ে চলে এসেছি। মেডিক্যাল ফাইনাল ইয়ারে থাকতে আলেপ্পো থেকে পাঠানো আয়ারল্যান্ডের এক ডাক্তারের খোলা চিঠি মনে বড় দাগ কেটেছিল- আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম যেন যুদ্ধ বিধ্যস্ত কোন দেশে মানবতার সেবায় কাজ করতে পারি, ইন্টার্নি

করার সময় রিয়েলাইজেশন হল ভিনদেশ কেন- আমার নিজের দেশের মানুষই কম দুস্থ কোথায়। সিরিয়াতে সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু আমার দেশের এই অসহায় মানুষগুলো, যারা বিনা চিকিৎসায় রোগে ভুগে মরে তাদের তো আমি সাহায্য করতেই পারি। প্রবলেম ছিল একটাই- বিনা মাহরাম ফিল্ডে কাজ করা সম্ভব না আমার। আল্লাহর কি রহমত, পরিস্থিতির জন্যে প্রায় জিন্দা কবর দেওয়া এককালে দেখা স্বপ্নকেও তিনি ইশফাকের মাধ্যমে পূরণ করে দিলেন সুবহানআল্লাহ। আসলে আমরা ভাবি এক, চাই এক- আর দেন আল্লাহ. কল্পনাও করিনি যে ইমম্যাচিওর একটা স্বপ্নকে আল্লাহ তাঁর মত করে পূরণ করে দিবেন. সত্যি- "All we need to ask"!

সন্ধ্যায় স্যার দুইজনকে চা খেতে ডেকেছিলেন -গিয়ে ওর রুমে বসতে না বসতেই স্যার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলেন; একজন লেবারের পেশেন্ট এসেছে- আমি যেন ম্যানেজ করে ব্রিফ করি স্যারকে।লেবাররুম দেখে আমি বেকুব! 100 ওয়াটের একটা বালব টিমটিম করে জ্বলছে, ষোল বছরের একটা মেয়ে নেতিয়ে পড়ে আছে লেবার টেবিলে, একজন সিস্টার আছেন দাঁড়িয়ে পাশে। রাত 3টা থেকে ব্যথা শুরু হয়েছে- দাই দিয়ে চেষ্টা করেছে বাসায়, বিগতিক দেখে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে মাগরিবের আগ দিয়ে।

১৪ঘন্টাতেও কোন প্রগ্রেস নাই, মা নেতিয়ে গেছে- ফিটাল হার্টরেট পাচ্ছি না- রাত ৮টায় সিদ্ধান্ত নিলাম এপিসিয়োটমি দিয়ে দিবো, কেননা মা-বাচ্চা দুইজনেরই বিপদ; বিশেষ করে বাচ্চাটার। সিজার আর ফরসেপ চাইতে সিস্টার বললেন কিছুই নেই- একটা ব্লেড বাদে! ভ্যাবলার মত তাকায় থাকলাম- বললাম, "দেন, ব্লেডই দেন. সুচার রেডি করেন।"
-"ম্যাডাম, সুচার নাই. এইখানে পাওয়া যায় না!"

আমরা যে পরিবেশে ট্রেনিং করেছি তার সাথে এইখানের তুলনা আকাশপাতাল! আজ এই মা-বাচ্চা মারা গেলেও আমাকে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না- সবাই বাস্তবতা জানে। বিসমিল্লাহ বলে কাজে লেগে গেলাম,তৃতীয়বারের চেষ্টায় বাচ্চাটা বের হলো - পুরো নীল হয়ে; গলায় নাড়ির তিন প্যাঁচ নিয়ে- তাও আবার মিউকোনিয়াম স্টেইনিং নিয়ে. আমি তো ভেবেই নিয়েছি বাচ্চা শেষ, সিস্টারের হওলায় মাকে ছেড়ে রক্তে মাখামাখি হয়ে বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সাকার নাই, আম্বু ব্যাগ নাই- মেডিক্যাল পারশনরা হয়ত বুঝবেন কি অসহায় অবস্থায় আমি পড়েছি! শেষে সিপিআর আর মাউথ টু মাউথ দিতে যাবো আর বাচ্চাটা ভক করে মুখ থেকে ময়লা বের করে দিয়ে প্যাঁ করে চিৎকার দিয়ে উঠল আলহামদুলিল্লাহ। মাকে দেখতে একটু সরেছি বাচ্চার কাছ থেকে, বাচ্চার দাদী বাচ্চার নাভীতে চুন লাগাতে চলে এসেছে!

বকা দিলেও নড়ে না, বাচ্চাকে অক্সিজেন দেওয়ার উপায় নাই- তার মুখে মুখ লাগায় আহ্লাদ করতে এসেছে যত বুড়ী মহিলা গুলো! তারা আমাকে নার্স ভেবেছে- পাত্তাই দেয় না! কড়া গলায় প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে মাকে ম্যানেজ করলাম সিস্টারকে নিয়ে. হাতে গায়ে রক্ত মেখে যখন বের হয়েছি হাত ধুতে- ইশফাকের হাসিমুখ দেখতে পেলাম; "কনগ্রাচুলেশনস. আই এ্যম প্রাউড অফ ইউ"; কথাটা শুনে যতটা ব্লাস করলাম, বিয়ের সময়ও এত ব্লাস করেছি কিনা সন্দেহ!

স্যারও এসে কনগ্রাচুলেট করলেন- ওয়ার্ডে ততক্ষনে কানাকানি পড়ে গেছে, সবাই দেখি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে"মহিলা ডাক্তার" দেখছে. স্যার পরে জানালেন হাসপাতাল ইতিহাসে এই প্রথম কোন ফিমেল ডাক্তার ডেলিভারী কনডাক্ট করলো. এই অঞ্চলের মানুষ মহিলা ডাক্তার দেখে অভ্যস্ত না, রাস্তায়-বাজারে-অফিসে সবখানেই দেখি আমাকে আলাদাভাবে বারবার দেখা হচ্ছে! অদ্ভুত, অথচ বাংলাদেশেই আছি।

আসলেই এই পরিবেশে কাজ করা প্রচন্ড চ্যালেঞ্জিং, আমার না আছে ইকুইপমেন্ট- না ম্যান পাওয়ার। স্যারকে জানাতে তিনি বললেন সব নিজ হাতে শুরু থেকে আমাকেই গুছিয়ে নিতে হবে, যা সহযোগিতা প্রয়োজন তিনি করার ব্যবস্থা করে দিবেন।

আল্লাহ যেন এই চেষ্টা আর ইনসাইটফুল জার্নিতে বারাকাহ দেন, আমীন। 

 

লেখক : সারওয়াট জাবিন আনিকা

মেডিকেল অফিসার, মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলা। 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত