ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, এপ্রিল ২০১৮ - ১১, বৈশাখ, ১৪২৫ - হিজরী

মেডিভয়েসের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার

বিসিপিএস যথাসাধ্য চেষ্টা করছে: অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহহার

সম্প্রতি মেডিভয়েস মুখোমুখি হয়েছিলো মেডিসিনের জীবন্ত কিংবদন্তী অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহহার স্যারের। কথা হয়েছে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং উচ্চ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিসিপিএস নিয়ে। বাদ পড়েনি আটপৌড়ে জীবনের কথাও।প্রিয় পাঠাকের জন্য রইলো সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অনির্বাণ আবরার

মেডিভয়েসঃ স্যার আসসালামু আলাইকুম। মেডি ভয়েস এর পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। 

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম। 

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনে আপনি একজন সফল ব্যক্তিত্ব। আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমি মূলত গ্রাম থেকে উঠে আসা। আমার শৈশবটা কেটেছে গ্রামে। যখন আমার বাবার মৃত্যু হয় তখন আমার বয়স ৪ বছর। পরবর্তীতে আমার বড় ভাই সবার দেখাশুনা করতেন। উনি একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। যত জায়গায় উনি বদলি হয়ে গেছেন তত জায়গায়ই উনার সাথে সাথে আমার যেতে হয়েছিলো। এ জন্য আমার প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত দশটা ক্লাস ১২টা স্কুলে পড়তে হয়েছে। সুতরাং বলতে হলে আমার শৈশব কৈশরটা যাযাবরের জীবন। এরপর ১৯৭০ সালে আমার গ্রামের স্কুলে ফিরে যাই। সেই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে নটরডেম কলেজে ভর্তি হই।

নটরডেম কলেজে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। মাঝখানে খুব স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হই। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজের এ্যাডমিশন রেজাল্ট বের হওয়ার পর পরই ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসি। পড়াশুনা মোটামুটি নিয়মিতই পড়ে আসছি। অনেক ভাল ছাত্র আমি ছিলাম না। তবে নিয়মনীতি মেনে পড়াশুনা করে মেডিকেল কলেজে মোটামুট রেগুলার পাস আমার ছিলো। 

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, আপনার কর্মজীবন সম্বন্ধে জানতে চাই। 

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ মেডিকেল কলেজের পড়াশুনা শেষ করে এক বছর ইর্ন্টানশীপ কমপ্লিট করে আমার গ্রামে চাকরিতে যেতে হয় এবং আমি যাই। পরবর্তীতে পিজি হসপিটাল যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি এখন সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হই পার্ট-১ এফসিপিএসে। পার্ট-১ এফসিপিএসে ৬ মাস পর পরীক্ষা শেষে পাশ করে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার হিসেবে নিয়োগ পাই। আমি এক বছর এসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার এবং এক বছর রেজিস্টার - এই ২ বছর ঢাকা মেডেকেল কলেজে ছিলাম। সেটা ছিলো ১৯৮৬-১৯৮৭ সালের কথা।

পরবর্তীতে এফসিপিএস পার্ট-২ পড়াশুনা করার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, তখনকার পিজি হসপিটালে ভর্তি হই। এফসিপিএস পার্ট-২ এক বছরের কোর্স। এক বছর শেষে আমি ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে এফসিপিএস পার্ট-২ পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি। পরবর্তীতে কনসালটেন্ট হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করি। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো - পাবনা।

পরবর্তীতে আমি সরকারের লিয়েন নিয়ে সৌদি আরব যাই। তিন বছর সেখানে চাকরি করার পরে ব্রিটেনে যাই - সেখানে আমি প্রায় এক বছর ছিলাম। ব্রিটেনে পড়াশুনা করে এমআরসিপি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আসার পর আমার প্রথম পোস্টিং হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ। সেখান থেকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ, তারপর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হয়ে শেষ পর্যায়ে ২০০৯ সালে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিরে আসি।

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, সম্প্রতি চিকিৎসকদের সাথে সাধারন মানুষের ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে একটি দূরত্ব তৈরী হচ্ছে। মাঝে মাঝে মারামারি হামলা-মামলার মতও দুর্ঘটনাও ঘটছে। এ লক্ষ্যে একটি চিকিৎসক-রোগী সুরক্ষা আইন তৈরী হচ্ছে। এই আইনের মাধ্যমে কি এই দূরত্ব দুর করা সম্ভব?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ দুরত্ব ঘুচানো সম্ভব। সারা পৃথিবীতে আমরা যদি দেখি এ্যাডভান্স ইনফরমেশন টেকনোলজির যুগে পৃথিবীর কোথায় কি হচ্ছে মূহুর্তে আমি ঘরে বসে তার খবর পাই। সুতরাং আমাদের দেশের চিকিৎসক ও সচেতন জনসাধারণ তারা পৃথিবীর সব জায়গার খবর নেয়। খবর নিয়ে তারা তাদের জানার সঙ্গে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিটা মেলাতে চেষ্টা করে। ইউরোপ, ব্রিটেন, আমেরিকা আর বাংলাদেশ এক না। এই পার্থক্যটুকু তারা বুঝে যায়। এই পার্থক্যটুকু তারা বুঝার পর তাদের এক্সপেক্টটেশন বেড়ে গেছে। আমাদের রিসোর্সিং লিমিটেড, আমাদের জনবলও সীমিত। সেই অনুপাতে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখবো ডাক্তাররা যথেষ্ট সার্ভিস দেয়ার চিন্তা করে এবং তারা চেষ্টা করে। তারা যে করছে না তাতো না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমরা যদি টোটাল বেডের কথা চিন্তা করি, তাহলে সরকারি এলটমেন্টে প্রায় ২৫০০/২৬০০ বেড আছে। কিন্ত এখানে গড়ে ৪৫০০ এর বেশি রোগী থাকে। আমরা যদি ধরি, এখানে প্রায় ৪০০০ রোগী থাকে এই যে এক্সটা ১৫০০ রোগীকে সার্ভ করা, তাদের ওষুধ দেওয়া, তাদের খাওয়া দাওয়া এগুলো ডেফিনেটলি সরকারি নির্দিষ্ট বাজেটের মাঝখান থেকেই আসে। সুতরাং সব সময় একটা অভাব অভাব ভাব ওষুধ নাই এটা মানুষের পরিবর্তিত অভ্যাস। যদিও বর্তমানে সরকারিভাবে যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তবুও আপনাকে বিচার করতে হবে যে ২৫০০ রোগীর জন্য যেটা বরাদ্দ সেটা ৪০০০/৪৫০০ রোগীকে দিলে ভাগটা যেমন হয়, সেটা মেনে নিতে মানুষ আগ্রহী না।

আমরা দ্বিতীয়ত যদি চিন্তা করি, তাহলে সারা পৃথিবীজুড়ে দেখা যাবে যে মেডিকেল কারিকুলামের কোর্সে বিহ্যাভিওরাল সাইন্স বলে একটা অংশ আছে। সেটা তাদেরকে পড়ানো হয়। আনফরচুনেটলি আমাদের এখানে এরকম সিলেবাসে অবশ্য পাঠ্যনীয় বিহ্যাভিওরাল সাইন্স ছিলো না। নতুন কারিকুলামে এটা ঢুকানো হয়েছে । এটা পরবর্তীতে আমার কাছে মনে হয় যে, যদি বিহ্যাভিওরাল সাইন্স এর ব্যাপারটা - আমরা আমাদের কারিকুলামের অন্তর্ভূক্ত করতে পারি, তাহলে আমাদের স্টুডেন্ট যারা আছে - যারা ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে, তাদের শিখাতে পারি যে রোগীর সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়। রোগীর লোকজন যারা আছে তাদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়। কলিগদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়। ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কেমন করে কথা বলতে হয়। সাংবাদিকদের সাথে কেমন করে কথা বলতে হয়। বিহ্যাভ কি করতে হয়। এ ব্যাপারগুলা যদি আমরা জানি বা আমরা শিখাতে পারি, তাহলে আমার কাছে মনে হয় সম্পর্কটা অনেক সহজ হবে।

আর একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চিকিৎসক যারা আছেন তারা সর্বোতভাবে মানুষের সেবা দেওয়ারই ইচ্ছা করে। তারা সর্বোতভাবে চেষ্টা করে কিন্তু তাদের চেষ্টা মানুষের এক্সপেক্টটেশনের মাঝে সব সময় একটা গ্যাপ বৃদ্ধি করে এটা থাকতেই পারে। আমরা যদি বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখি, তাহলে একটা প্রশ্ন বার বারই এসে যায় বাংলাদেশের মানুষ এখন বিদেশে চিকিৎসা করে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতে যায়, বাংলাদেশের মানুষ সিঙ্গাপুর যায়। ভারতের মানুষ সিঙ্গাপুর যায়, সিঙ্গাপুরের মানুষ ব্রিটেনে যায়, ব্রিটেনের মানুষ আমেরিকায় যায়। আমেরিকায় মানুষ এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে যায়। সুতরাং আমরা এদিকটা কখনো কিন্তু চিন্তা করি না।

আর বিদেশি হাসপাতালের সাথে আমাদের হাসপাতালের তুলনা করি - ডেফিনেটলি আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আমাদের সীমিত স্বচ্ছলতার মাঝে আমরা এই সমাজ এই সরকার যতটা দেয়ার চেষ্টা করে তার যথেষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের সম্পদ সীমিত। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। আর আমরা যদি সরকারি ব্যবস্থাপনার সাথে চিন্তা করি, তাহলে আপনাকে চিন্তা করতে হবে বিদেশে যারা যান তাদের বেশির ভাগই বেসরকারি ক্লিনিকে যান। এ্যাপোলো, ইন্ডিয়ান এ্যাপোলো তার সঙ্গে কম্পেয়ার করা। ইন্ডিয়ান একটা সরকারি হাসপাতাল যেটা আছে বা আপনি পৃথিবীর অন্য দেশের সরকারি হাসপাতালের সাথে আমাদের সরকারি হাসপাতালের তুলনা করে দেখেন পার্থক্য খুব একটা নেই। বাংলাদেশের স্কয়ার, এ্যাপোলো, ইউনাইটেডের সাথে ইন্ডিয়ান এ্যপোলো বা ইন্ডিয়ান বেসরকারি যে হাসপাতাল আছে তার সাথে আপনার তুলনা করতে হবে। হ্যাঁ, ভারতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের তুলনা করা যেতে পারে না। ভারতের সরকারি যে হাসপাতাল আছে, ধরেন হোগলায় নীল রতন সরকারি মেডিকেল কলেজ বা কলকাতা সরকারি মেডিকেল কলেজ যেটা আছে তার সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের তুলনা করতে পারেন। সেটা যদি করেন, তাহলে আমি বলবো যে সরকারি ব্যবস্থাপনা যতটা সম্ভব আমরা এগিয়ে থাকবো।

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, আমরা জানি যে আপনি অনেক সময়নিষ্ঠ । ব্যাক্তি-পরিবার, পেশা, হাসপাতাল - একসাথে কিভাবে সমন্বয় করেন?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ এটা একটা গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন। সব জায়গাই একটু একটু ছাড় দিতে হয়। তবে আমি আমার পেশাটাকে এবং শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্বটাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করি।

আমি আমার পরিবারকে ছুটির দিনগুলোতে যথা সাধ্য চেষ্টা করি সময় দিতে। সেটা মাঝে মাঝে যে কোথাও ঘাটতি পড়ে না এটা আমি বলবো না। তবে সত্যি কথা বলতে কি পরিবারের দিকেই ঘাটতিটা একটু বেশি পড়ে। কারণ পারিবারিক কোন প্রোগ্রামে যাওয়ার কথা এসেছে। হয়ত রওয়ানাও হয়েছি। হঠাৎ করে যে কোন হাসপাতাল থেকে খবর এলো - স্যার রোগীর অবস্থা খারাপ আপনাকে একবার দেখতে হবে। সেই ক্ষেত্রে আমাকে তো আমার পরিবারকে সেক্রিফাইস করতে হবে। সুতরাং আমার বিবেচনায় কোন অলটারনেটিভ নাই।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাটা আসলে এখন কোন হাসপাতাল বেইজ হয় না। এটা পাটিকুলার চিকিৎসক বেইজ হয়। যার জন্য পার্টিকুলার সেই চিকিৎসক না দেখা পর্যন্ত রোগী স্বস্তিবোধ করেন না।

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, বর্তমানে চিকিৎসা শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব। 

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আসলে আমরা যদি পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিবেচনা করে দেখি, তাহলে সামাজিক অবক্ষয় সব জায়গায় আছে। সাথে চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও আছে। আমরা কখনই মনে করতে পারিনা যে শুধু চিকিৎসা শিক্ষা ক্ষেত্রে পারফেকশন বজায় থাকবে আর সমাজের অন্য সব ক্ষেত্রে ইমপারফেকশন থাকতে পারবে। এটা সম্ভব না। কারণ সমাজের একটি বিষয়ের সাথে আরেকটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আজকাল প্রায়ই দেখা যায় ছাত্ররা এসএসসি-এইচএসসি-তে প্রচুর ভাল ফলাফল করে মেডিকেলে বুয়েটে পড়তে আসছে। কিন্তু আসলেই তাদের সে ফলাফলের সাথে জ্ঞানের মিল আছে? তারাই কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হয়ে চিকিৎসক হবেন আবার কেউ আর্কিটেক্ট হবেন তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। অর্থাৎ সাধারন শিক্ষার মান যদি উন্নত না হয়, তাহলে কারিগরি শিক্ষার মান কখনোই উন্নত করা সম্ভব হবেনা।

আর শিক্ষকতা একটা মহান পেশা। যেখানে শিক্ষক হতে হয় নিবেদিত প্রাণ। সেই পেশার জন্য যোগ্য লোক বেছে নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি চিকিৎসা পেশার কথা বলি, তাহলে যে ছাত্রকে আমরা মেডিকেল সাইন্সের ছাত্র হিসেবে গড়ে নেবো তার ভাল রেজাল্টটাই কিন্তু সবকিছুনা। এই পেশার প্রতি বা শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কতটুকু বা এটাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা কতটুকু তা বিবেচনায় নিতে হবে।

উন্নত বিশ্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন বৃটেনে একজন শিক্ষার্থী শুধু ভাল রেজাল্ট করলেই কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হতে পারবেনা। তাকে সাইকোলজিকাল টেস্ট দিতে হয়। টেস্টে যদি সে প্রমাণ করতে পারে যে, সে এই পেশা গ্রহণ করতে মানসিকভাবে সক্ষম তাহলেই কেবল সে মেডিকেলে ভর্তি হতে পারে।

 

মেডিভয়েসঃ বাংলাদেশে মেডিকেল উচ্চশিক্ষা কতটুকু কার্যকরী বা সফলতা লাভ করছে বলে আপনি মনে করেন? 

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমি বলবো বাংলাদেশে মেডিকেল উচ্চ শিক্ষা অনেকটাই সফলতা অর্জন করেছে। তবে আমরা এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদেরকে স্থাপন করতে পারিনি। বিভিন্ন পেশায় যে রকম ট্রেনিং এর সুযোগ-সুবিধা আছে চিকিৎসা পেশায় ততটা নেই। সরকারি উদ্যোগে যদি দেশের বাইরে পর্যাপ্ত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা যায় তাহলে দেশের মেডিকেল শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য সেবা, মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাপনা অনেক উন্নতি হবে।

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, বিসিপিএস কিছু কার্যক্রম ইদানিং তরুণ চিকিৎসকদের মাঝে শঙ্কা তৈরী করছে। যেমন এফসিপিএস এর ফি বৃদ্ধি করা এবং পরীক্ষা পাসের হার ক্রমশ কমছে' বা বাছাই পদ্ধতি নিয়ে অনেকেই হতাশ। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমি বিসিপিএস এর কন্ট্রোলার অব এক্সামিনেসনস । আমি এই বিষয়ে এই ফোরামে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।

 

মেডিভয়েসঃ বিসিপিএস কি পারছে মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ চিকিৎসক তৈরী করতে?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমরা যদি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে প্রথম যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিসিপিএস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেখি, তাহলে দেখতে পাবেন বাংলাদেশের প্রতিটি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা বিসিপিএস এরই ফেলো। সুতরাং তখনকার সরকার যে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশেই আমাদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিৎ। তাহলে দেশের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে দেশের মানুষও উপকার পাবে। সে ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি আমরা অত্যন্ত সফল।

পরবর্তিতে আমরা যদি চিন্তা করে দেখি একটির সাথে আরেকটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো সরকারি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সেগুলোতে কি যথেষ্ট শিক্ষক আছে, যথেষ্ট মানসম্মত শিক্ষক আছে, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছে? সেখানে কি জ্ঞানের চর্চা সত্যিকারে হয়? সেখানে কী যথেষ্ট পরিমানে শিক্ষক আছে?

যদি না থাকে - তাহলে তাদের শিক্ষা অপর্যাপ্ত হয়। এর ফলে যদি ঐ মেডিকেল কলেজগুলো থেকে কম মেডিকেল জ্ঞানসম্পন্ন যে সব চিকিৎসক বের হয়ে আসছে। তারাও তো অন্যান্য মেডিকেল কলেজের সাথে একই কাতারে আসবেন। তাহলে তাদের যদি একোমোডেট করেন, তাহলে একই রেজাল্ট পাবেন। আপনি যদি তিন তলা বিল্ডিং এর ভিতে ছয় তলা তোলেন তাহলে সেই বিল্ডিং টিকবে না।

আমার মনে হয়, যত মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, তত আমাদের মেডিকেল শিক্ষায় একটা ধ্বস নেমে আসছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ সঙ্গে সাতক্ষীরা বা কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের তুলনা কি হয়? কিন্তু সব মেডিকেল কলেজের পাশ করা ডাক্তাররাতো একই সার্টিফিকেট পান। তারাতো বিএমডিসির একই রেজিস্ট্রেশন নিয়ে একই কাতারে দাড়িয়ে যায়। আপনি কি উভয়ের কাছ থেকে একই লেভেলের চিকিৎসা সেবা পেতে পারবেন বলে আশা করবেন?

 

মেডিভয়েসঃ উচ্চ শিক্ষার ট্রেনিং এর ক্ষেত্রে অনারারি সিস্টেমকে রহিত করে ভাতা সিস্টেম চালু করলে উচ্চশিক্ষার মান বাড়বে - এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ হ্যাঁ, ভাতা সিস্টেম চালু করলে উচ্চ শিক্ষার মান বাড়বে, এটা আমি মনে করি। কিন্তু ভাতাটা দেবে কে? সরকার? সরকার দিতে রাজি না। হ্যাঁ, সিস্টেমটা অসন্তোসজনক। এটা সত্যি। কিন্তু সরকার এই অনারারির ভাতার ব্যাপারে রাজি না। সরকারের আর্থিক সংস্থান নাই।

আপনি হয়তো শিগগিরি জেনে যাবেন যে, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেসিডেন্সি কোর্সে যারা ট্রেনিং করছেন, তাদের প্রত্যেককে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে দিত - সেটাও মনে হয় সরকার বন্ধ করে দিবে।

 

মেডিভয়েসঃ ইদানিং বিসিপিএস এবং তরুণ চিকিৎসকদের মাঝে একটা দূরত্ব তৈরী হচ্ছে বলে কি আপনি মনে করেন? 

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ হ্যাঁ, আমার মনে হয় যে, হতেই পারে কোনো ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে। তবে আমি বলবো তরুণ চিকিৎসকদের নিজেদের অবস্থান, নিজেদের ব্যাপারগুলোও চিন্তা করা দরকার। বিসিপিএস যথাসাধ্য চেষ্টা করে তরুন চিকিৎসদের সঠিক মান উন্নয়নে কার্যক্রম নেয়ার।

বিসিপিএস আগামীতে চেষ্টা করবে প্রতিষ্ঠানটির যে মান মর্যাদা এবং সার্টিফিকেট বা ফেলোদের কোয়ালিটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিভাবে নিয়ে যাওয়া যায়। এটা বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রতিটি পরীক্ষায় বিদেশ থেকে ২৫-৩০ পরীক্ষক আসেন। তারা পরীক্ষা নিয়ে তারপরে যান। গত জানুয়ারী পরীক্ষায় ২৬জন পরীক্ষক এসেছিলেন। আগামী জুলাইতে ২৮-৩০ জন বিদেশি শিক্ষক আসবেন।

 

মেডিভয়েসঃ তরুণ চিকিৎসকদের আপনার কোনো বিশেষ দিক নির্দেশনা?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ মানুষকে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কঠোর অনুশীলন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষার মত একটা ব্যবহারিক শিক্ষা আত্মস্থ করে তারপরেই এগিয়ে যেতে হবে। এর কোনো শর্টকাট পথ নেই। সুতরাং প্রত্যেকটা তরুণ চিকিৎসককে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই এটা সম্ভব, অন্যথায় না।

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, আপনার দীর্ঘ চিকিৎসক জীবন বা ছাত্র জীবনের একটি স্মরণীয় স্মৃতি আমাদের বলুন।

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশীপ করে সরকারি চাকুরীতে গ্রামে যাচ্ছি। আমার যিনি প্রফেসর ছিলেন উনার সাথে আমি দেখা করতে গেলাম, পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। উনি আমাকে বললেন গ্রামে যাও, চাকুরী কর, মানুষের সেবা কর। আর একটি বিষয় খেয়াল করবে “Do not run after money, Let money run after you''.

 

মেডি ভয়েসঃ স্যার, আপনার পরিবার সম্পর্কে একটু জানাবেন?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ পরিবারের সদস্য চার জন। স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর মেয়ে ইংরেজীতে গ্রাজুয়েশন করছে দেশের বাইরে। 

 

মেডিভয়েসঃ স্যার, আমাদের মেডি ভয়েসের এই উদ্যোগকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ আমি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। যারা জুনিয়র চিকিৎসক বা মেডিকেল স্টুডেন্টদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য মেডিভয়েস গুরুত্বপূর্ণ সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করবে। আমি সবসময় চাই আমাদের সিনিয়র এবং জুনিয়রদের মাঝে যেন একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে।
 

মেডিভয়েসঃ স্যার, মেডিভয়েসকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারঃ মেডিভয়েসকেও ধন্যবাদ।

(মেডিভয়েস এর নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০১৬ সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 

আরো সংবাদ

একজন লিজেন্ডারি সার্জনের বিদায়

একজন লিজেন্ডারি সার্জনের বিদায়

১৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১১:১৭

তুমি কখনো ফিরিশতা দেখেছো?

তুমি কখনো ফিরিশতা দেখেছো?

০৭ এপ্রিল, ২০১৮ ১৪:২২

একজন সফল চিকিৎসক ও মা

একজন সফল চিকিৎসক ও মা

০৭ এপ্রিল, ২০১৮ ১১:৪১

যে ডাক্তার ফিলোসফির কথা বলে

যে ডাক্তার ফিলোসফির কথা বলে

০৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১২:১৯








হোম পেইজের ডানদিকে নোটিশ বোর্ড ক্যাটাগরির উপরে | এই বিজ্ঞাপনের সাইজ (ওয়াইড ফিক্সড : ৩৭৪ পিক্সেল )
হোম পেইজের ডানদিকে  সর্ব শেষ , সর্বাধিক পঠিত ক্যাটাগরির উপরে  | এই বিজ্ঞাপনের সাইজ (ওয়াইড ফিক্সড : ৩৭৪ পিক্সেল )

জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর