ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

এমবিবিএস (সিএমসি), সিসিডি (বারডেম) ডি-অর্থো (নিটোর),
হাড়-জোড়া, বাত ও ব্যথা বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন


০৫ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৪:৩৫ পিএম

আঙ্গুলের চিকিৎসা করতে গিয়ে শিশুর পেটে অস্ত্রোপচার: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

আঙ্গুলের চিকিৎসা করতে গিয়ে শিশুর পেটে অস্ত্রোপচার: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ছিল কিনা, এটা তদন্ত করা উচিত।

হাতের কোনো অংশ পুড়ে গেলে পরবর্তীতে পোস্ট বার্ন কন্ট্রাকচার ডেভলপ করে। এক্ষেত্রে পোড়া অংশের চামড়া কুচকে যায় এবং এক ধরনের ডিফর্মিটি হয়। ডিফর্মিটির কারণে হাতের মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হয়।

ডিফর্মিটি ঠিক করার জন্য এক ধরনের রিকনস্ট্রাকশন প্রসিডিউরের মধ্যে যেতে হয়। খুব হালকা ধরনের কন্ট্রাকচার রিলিজ করে শরীরের অন্য জায়গা থেকে স্কিন গ্রাফট এনে দিলেই হয়। খারাপ ধরনের কন্ট্রাকচার ঠিক করার জন্য স্কিন ফ্ল্যাপ দিতে হয়। সহজ ভাষায় বোঝানোর জন্য বলা যায়, স্কিন গ্রাফটে কেবল চামড়া বা চামড়াসহ নিচের অংশ আনলেই চলে। আর ফ্ল্যাপের ক্ষেত্রে চামড়া, চামড়ার নিচের অংশ এবং সংশ্লিষ্ট রক্ত সরবরাহের নালিকেও ইনভলভ করতে হয়। তাই হাতের যে জায়গা কন্ট্রাকচার আছে, সেটা ভালোভাবে রিলিজ করে ওই অংশটিকে ফ্ল্যাপ যেখান থেকে নিতে হবে, সেখানে স্থাপন করে রাখতে হয় কিছু দিন। বাচ্চাদের এবডোমেন যথেষ্ট প্রসারিত থাকে বলে, বাচ্চাদের পোস্ট বার্ন কন্ট্রাকচার কনস্ট্রাকশনের জন্য এবডোমেন বা পেটের চামড়া ব্যবহার করা হয়।

ছবিতে এ রকম একটা কন্ট্রাকচারের পর সংশ্লিষ্ট প্রসিডিউরের পোস্ট অপারেটিপ চিত্র দেখানো হয়েছে।

কুড়িগ্রামের একটি শিশু ঢাকার এক হাসপাতালে এ রকম একটা প্রসিডিউরের মাঝপথে এনেস্থেটিক কমপ্লিকেশনে মারা যায়। বাচ্চা খারাপ হয়ে যাওয়ায় অপারেশন থামিয়ে স্কিন ক্লোজ করে দেওয়া হয়। পরে মারা যাওয়ার পর বাচ্চাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাচ্চার গোসলের সময় বাচ্চার পেটে সেলাই দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়।

সঠিক কাউন্সেলিংয়ের অভাবে হোক বা যেকোনো কারণেই হোক, ব্যাপারটি নিয়ে বাচ্চার স্বজন, প্রতিবেশীরা ক্ষেপে যায়। থানা পুলিশ ডাকা হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল চিকিৎসকের নিষ্ঠুরতা, কিডনি চুরি, এমনকি নাড়িভুড়ি চুরি শিরোনামে নিউজ করা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
 
যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। বিশেষ করে ফুলের মতো একটা মেয়ে হাসতে হাসতে হাসপাতালে এলো এবং লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলো, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। 

এখানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল কিনা, এটাও তদন্ত করা উচিত। বিশেষ করে কয়েকটা প্রশ্ন একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। 

১. মেয়েটার অভিভাবকদের কাছে ঠিকভাবে অপারেশনের প্রসিডিউর বা কমপ্লিকেশন ব্যাখ্যা করা হয়েছিল কিনা?
২. অপারেশন থিয়েটার বা হাসপাতালের পরিবেশ ঠিক ছিল কিনা?
৩. অপারেশনের আগে প্রি-অপারেটিভ চেক আপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা?
৪. কমপ্লিকেশন ডেভলপ করার পর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা?

কিন্তু এসব প্রশ্ন না তুলে চিকিৎসককে ঢালাও দোষারোপ, কিডনি চুরি, পেটে সেলাই করে নিষ্ঠুরতা, নাড়িভুঁড়ি চুরির হাস্যকর আলাপ করে যারা চিকিৎসা সেবাকে চিকিৎসকদের জন্য আরো কঠিন করে তুলছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব, অসচেতন রোগী, যারা চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়, হাতুড়ে কবিরাজের কাছে গিয়ে জীবন বিপন্ন করে, তাদের আরো ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন, তারা কি আসলে ঠিক কাজটি করছেন?

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত