০১ অক্টোবর, ২০২২ ০৬:৪৩ পিএম

ভর্তি পরীক্ষায় অপেক্ষমাণ তালিকার নুসরাত চবির ফাইনাল প্রফে তৃতীয়

ভর্তি পরীক্ষায় অপেক্ষমাণ তালিকার নুসরাত চবির ফাইনাল প্রফে তৃতীয়
ডা. নুসরাত জাহান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) অধিভুক্ত ১৪টি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছেন রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ডা. নুসরাত জাহান। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছেন এ নবীন চিকিৎসক। পরিবারের মধ্যে একমাত্র চিকিৎসক হওয়ায় খুশির যেনো শেষ নেই।

কঠোর অধ্যাবসায়ী ডা. নুসরাত গ্রামের বাড়ি বি-বাড়িয়ায়। বাবা-মা ও তিন ভাইবোন নিয়ে ডা. নুসরাতের পরিবার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা গোপিনাথপুর শহীদ বাবুল হাই-স্কুল থেকে এসএসসি ও বি-বাড়িয়া গোপিনাথপুর আল-হাজ্জ শাহ আলম ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএস পাস করেছেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৬-১৭ সেশনে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় ওয়েটিং লিস্ট থেকে রাঙ্গামাটি মেডিকেলে ভর্তি হন ডা. নুসরাত জাহান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলে এক হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য ৮৩৪ জন চিকিৎসকের মাঝে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন এ মেধাবী মুখ। নবীন এ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ঈর্ষণীয় সাফল্যের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন

মেডিভয়েস: অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে মেডিকেল ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে চমৎকার ফলাফল করেছেন। কেমন লাগছে?

ডা. নুসরাত জাহান: এই অনুভূতিটা খুবই আনন্দের। দীর্ঘ পাঁচ বছর পড়াশোনা এবং সাধনা করে নামের পাশে ডা. শব্দটা বসাতে পেরে ভালো লাগছে। ভালো ফলাফল করায় মা, বাবা এবং শিক্ষকদের খুশি দেখে আপ্লুত হয়েছি।

মেডিভয়েস: কোন অনুপ্রেরণায় এ পর্যন্ত আসা?

ডা. নুসরাত জাহান: আম্মু, আব্বু ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় এ পর্যন্ত আসা। আব্বু-আম্মু সবসময় বলতেন পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে এবং ভালো রেজাল্ট করতে হবে। মেডিকেলে আসার পরও একই কথা বলতেন তাঁরা। তাদের খুশির জন্য এবং ইচ্ছাপূরণ করার জন্য একটু ভালো করে পড়াশোনা করা এবং টার্গেট রাখা। শিক্ষকরা প্রতিটি প্রফে সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। একটু পারলে বলতেন আরও চেষ্টা করো, তুমি ভালো করতে পারবা। এক স্যার, ভাইভার সময় বললেন, শুধু অনার্স মার্ক পেলেই হবে না, প্লেসও করতে হবে। স্যারের এই কথাটাতে আমি অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি। এরপর থেকে আমি বেশি পড়াশোনা করতাম। এরপরই আমি থার্ড প্রফে চতুর্থ হয়েছি। আর ফাইনাল প্রফে তৃতীয় হয়েছি।

মেডিভয়েস: এতো ভালো ফলাফল অর্জন করলেন কিভাবে?

ডা. নুসরাত জাহান: আল্লাহর ইচ্ছা এবং সবার দোয়ায় ভালো ফলাফল করতে পেরেছি। নিজের চেষ্টা, আগ্রহ এবং পরিশ্রমও করতে হয়েছে। শিক্ষকদের গাইডলাইন ছাড়া পাস করা সম্ভব, তবে ভালো ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। অন্তত শিক্ষকদের গাইডলাইন ছাড়া আমি ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারতাম না। আর আমি ক্লাস ও ওয়ার্ড মিস দেইনি। ক্লাস-ওয়ার্ডে স্যাররা বলে দিতেন পরীক্ষায় কোনটা আসবে বা কোনটা গুরুত্বপূর্ণ টপিক এবং কিভাবে পড়তে হবে। স্যারদের লেকচারগুলোই বেশি অনুসরণ করেছি। 

মেডিভয়েস: দৈনন্দিন পড়াশোনা কিভাবে করতেন?

ডা. নুসরাত জাহান: দৈনিক তিন, চার বা পাঁচটা লেকচার হতো। আর সব লেকচারের পড়া একদিনে পড়া সম্ভব নয়। যেটা আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতো, সেটা প্রথমে পড়তাম। তারপর অন্যগুলো শুরু করতাম। এতে দেখা যেত একটু একটু করে অনেক দূর আগানো হয়ে যেত।

মেডিভয়েস: এমবিবিএসের পাঁচ বছরের সময়টা কেমন ছিল?

ডা. নুসরাত জাহান: এমবিবিএসের সময়টা আমার কাছে বেশি কষ্টেরও মনে হয়নি, আবার দুঃখেরও মনে হয়নি। সবসময় নিশ্চিন্ত থাকার চেষ্টা করতাম। শুধু পড়াশোনা করতে হবে, এমনটা নয়। টানা ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেনি। ঘুরাফেরা করেছি, বন্ধুদের সাথে প্রচুর আড্ডা দিয়েছি। এমনও হয়েছে দুই বা তিনদিন পর পরীক্ষা, তারপরও আড্ডা দিতাম। এতে মন ভালো থাকতো। এমবিবিএস লাইফে দুঃখ, কষ্ট ও আনন্দ সবই ছিল।

মেডিভয়েস: পরীক্ষা কৌশল ও প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাই?

ডা. নুসরাত জাহান: সবসময় আমি স্যার-ম্যামদের ফলো করতাম। এতে আমি বুঝে যেতাম গুরুত্বপূর্ণ টপিক কোনটি। লেকচারগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতাম এবং প্রয়োগ করতাম। এতে আমার ভাইভা, লিখিত এবং ওএসপিই সব কাভার হয়ে যেত। স্যার-ম্যামদের লেকচারের পাশাপাশি আমার পছন্দের দুই একটা মূল বই রাখতাম। সেইসাথে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলোর উপর জোর দিতাম। কোনভাবেই মিস দিতাম। যতটুকু পারতাম এ টু জেড পড়তাম, মিস দিতাম না। আর ওয়ার্ডে রোগী দেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ওয়ার্ডে একটু সকাল সকাল চলে যেতাম। গিয়ে ওয়ার্ডে ঘুর-ঘুর করতাম। দেখতাম অন্যান্য কি কি রোগী আছে এবং কেস আছে। এতে অনেক কিছু শিখা হয়ে যেত। এগুলোই প্রাধ্যন্য দিয়েছি।

মেডিভয়েস: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।

ডা. নুসরাত জাহান: আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ভালো একজন মানুষ হওয়া। সেই সঙ্গে একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসক হওয়া। দেশের মানুষের সেবা করতে চাই। বিসিএস দেওয়ার ইচ্ছা আছে। স্যার-ম্যামরা বলছেন, এখনই বিসিএস, এফসিপিএসের জন্য পড়াশোনা শুরু করো। 

মেডিভয়েস: কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান?

ডা. নুসরাত জাহান: এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কারণ গাইনি এবং মেডিসিন দুটিই সমান ভালো লাগা। যখন মেডিসিনে ওয়ার্ড করতাম মনে, হতো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হয়ে যাই। আবার যখন গাইনি বিভাগে ওয়ার্ড করতাম, তখন মনে হতো গাইনি বিশেষজ্ঞ হয়ে যাই। তবে ইন্টার্নির সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। তখন আরও অভিজ্ঞতা অর্জন হবে। সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো।

মেডিভয়েস: আপনার আশেপাশের অনেক বন্ধু-বান্ধব অকৃতকার্য হয়েছেন। তাদের জন্য কি পরামর্শ দিবেন?

ডা. নুসরাত জাহান: আমার বন্ধুদের জন্য পরামর্শ থাকবে হতাশ হওয়া যাবে না এবং নিরাশ হওয়া যাবে না। সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রেখে যে বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, সেই বিষয় দুই তিন মাস ভালোভাবে পড়তে হবে। যাতে দ্বিতীয়বার কোনো সমস্যা না হয়।

মেডিভয়েস: চবির অধীনে অকৃতকার্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সার্জারিতে ফেইল করেছেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

ডা. নুসরাত জাহান: আমার মনে হয় ভাইবা বা ওএসপিইতে ফেইলের সংখ্যাটা বেশি। কারণ, রিটেন লিখতে পারলে ভালো নাম্বার পাওয়া যায়, সাধারণত ফেইল আসে না। ভাইভাতে একটু সমস্যা হয়। ভাইভাটা মেডিকেল টু মেডিকেল ভেরি করে এবং পড়ার উপর অনেকটা নির্ভর করে। এ ছাড়া অনুশীলনের উপরও নির্ভর করে। যাদের বেশি শর্ট কেস, লং কেস হিস্ট্রি নেওয়ার প্রতি এক্সপোজার থাকে, তাদের ফেইল হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমার মনে হয় ভাইভাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক ফেইল হয়েছে। স্যার-ম্যাম সবাই বলে, শর্ট কেসটা একটু কঠিন। কারণ, দুই-চার মিনিটের মধ্যে নির্ধারণ করা যায়। আপনি পাস করবেন, না ফেইল করবেন। এসময় অনেকেই নার্ভাসনেস কাটতে কাটতেই সময় লেগে যায়। আর ওই দুই-চার মিনিটের মধ্যে নাম্বার দেওয়া হয়ে যায়। এটাই ফেইলের কারণ হতে পারে। আবার অনেকে অসুস্থতার কারণেও ফেইল করে। আবার চেষ্টা করলে তাঁরাও পাস করবে।

মেডিভয়েস: মেডিকেল ক্যারিঅন বাতিল করা হয়েছে। সেইসাথে সিজিপিএ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ডা. নুসরাত জাহান: আমি এই দুটি পদ্ধতি চালু করার বিপক্ষে। কারণ হলো- আমাদের মেডিকেলে এমনিতেই পাঁচ বছর কোর্স সাড়ে পাঁচ বছর লেগে যায়। ক্যারিঅন না থাকলে ফেইল করলে ছয়-সাত বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যাবে। যেমন-বেশির ভাগ সিনিয়র বা জুনিয়ররা বিভিন্ন কারণে এমবিবিএসে এক বা দুই বিষয়ে ফেইল করে থাকে। ফেইল করা বিষয়ে চাইলে কম সময়ে প্রস্তুতি নিয়ে পুনরায় পরীক্ষা দিতে পারে। পরবর্তী ইয়ারে পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে পারে। ক্যারিঅন না থাকলে কিভাবে কন্টিনিউ করবে? এমবিবিএসে ক্যারিঅন না থাকলে লম্বা সময় পড়াশোনার পিছনে চলে যাবে। দেখা যাবে, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু চার বছর বা সাড়ে চার বছরের মধ্যে পাস করে বেরিয়ে যাবে। অথচ সে ছয়-সাত বছরেও শেষ করতে পারেনি। এতে শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভোগবে। এমনিতেই হতাশার হারে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা এগিয়ে।

আর সিজিপিএ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য নয়। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে অনেক বৈষম্য হয়। সিজিপিএ এ বৈষম্য আরো প্রকট করে তুলবে। রোগীরা চিকিৎসকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করবে। এটা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। বৈষম্য দূর না করাপর্যন্ত দেশের মেডিকেল ক্যারিকুলামে সিজিপিএ আনা ঠিক হবে না। এটা শুধু তাদের জন্য ভালো হবে, যারা বিদেশে ডিগ্রি বা লাইসেন্স নিতে যাবে। অল্প কিছুর জন্য বেশি মানুষকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। তারপরও এগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ভালো হবে।

মেডিভয়েস: অনেকেই বলে জেলা পর্যায়ের মেডিকেলে পড়লে ভালো ফলাফল অর্জন করা যায় না, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ডা. নুসরাত জাহান: এটা একদমই ভুল ধারণা। আমি নিজেই জেলা পর্যায়ের মেডিকেল থেকে তৃতীয় হয়েছি। অনেকে মনে করে রাঙ্গামাটি একটা প্রত্যন্ত অঞ্চল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য গত বছরও আমাদের একজন আপু চবির অধীনে দ্বিতীয় হয়েছে। এর আগেও অনেকে ভালো ফলাফল করেছে। জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের মেডিকেলের মান কম, এগুলো চিন্তা করা ঠিক না। সবকিছু নির্ভর করে নিজের ইচ্ছা ও চেষ্টার উপর। সেই সঙ্গে ভালো মানের শিক্ষক দরকার। যারা নিজ থেকে আগ্রহী হয়ে শিক্ষার্থীদেরকে পড়াবে এবং বুঝাবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি