অনির্বাণ আবরার

অনির্বাণ আবরার

Student of Mandy Dental College. He is a Traveler & Freelance Journalist. He is also a

  • CEO and founder of Doctorch.com
  • Founder member of Sohay
  • Founder of Ghurist Team Bangladesh.

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০৬:৪০ পিএম

আশংকাজনক হারে বাড়ছে অবৈধভাবে কিডনি বিক্রির প্রবণতা !!!

আশংকাজনক হারে বাড়ছে অবৈধভাবে কিডনি বিক্রির প্রবণতা !!!

অনির্বাণ আবরার : বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের  অফিসিয়াল ফেইচবুক পেইজের পোষ্ট পড়ছিলাম। পোস্ট পড়া শেষে চোখ আটকে গেলো পোস্টের নিচের বাহারী কমেন্ট তথা বিজ্ঞাপনের দিকে। তারই কিছু ছবি দিলাম লেখার সাথে।

          

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এমনকি বেশকিছু জাতীয় পত্রিকায় এধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি, এর আগেও রাজধানীতে কিডনি বিক্রির একটি বিশাল বাজারের সন্ধান পাওয়া গেছে। অনেক আগের কথা যখন কিডনির দাম ছিল আকাশছোঁয়া। টাকা দিয়েও মিলেনি তা। বর্তমানে প্রতুলতার কারণে এর দামও পড়ে গেছে। এখন মাত্র দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকায় মিলছে কিডনি। দালালরা অনেক বিক্রেতার কিডনির এইচএলএ রিপোর্ট তৈরী করে রাখেন। রোগীর সঙ্গে মিলে গেলেই এক ঘন্টার মধ্যে মিলে যায় তরতাজা কিডনি। এভাবে প্রতিদিনই বিক্রি হয় মানব দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।

কয়েকমাস আগেও এর রমরমা বাজার ছিল ভারতের কলকাতা।গত  বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে কিডনি চক্রের পান্ডা পার্থ চৌধুরীকে কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশ বাংলাদেশ সংলগ্ন সন্দেশখালি থেকে আটক করে। পার্থ বাংলাদেশেও তার চক্রের কথা স্বীকার করে। এঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিডনি প্রতিস্থাপনে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে চক্রটি এখন বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা বিস্তার করছে।

আমার ধারণা এই থাতে দুই শ্রেণীর কিডনি দাতা রয়েছে। এদের প্রথম অংশটি হলো বেকার তরুন। কিছু অর্থ দিয়ে একটি ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবন কাটিয়ে দেয়ার আশায় এরা কিডনি বিক্রি করছেন। অন্য অংশ সব কিছু হারিয়ে অসহায় হয়ে কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই দু শ্রেনীর দাতারাই এখন দালালদের মাধ্যমে কিডনি বিক্রি করছেন। মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রিতে আইনী বাধা থাকায় তারা দালাল ধরতে বাধ্য হন। দালালরা সহজেই নোটারী পাবলিক ও ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছ থেকে সম্পর্ক নির্ধারনের একটি সনদ যোগাড় করে দেয়। 
 

১৩ এপ্রিল ১৯৯৯ সালে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন করা হয়। এতে বলা হয়েছে- সুস্থ ও সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোন ব্যক্তি তার দেহের এমন কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা বিযুক্তির কারণে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ব্যাঘাত সৃষ্টির আশংকা নেই তা কোন নিকট আত্মীয়ের দেহে সংযোজনের জন্য দান করতে পারবেন। “নিকট আত্মীয়” বলতে পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই, বোন ও রক্ত সম্পর্কিত আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রী বুঝানো হয়েছে। এর বাইরে কেউ কাউকে কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ দান করতে পারবেননা। আইনে “অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ” অর্থ মানবদেহের কিডনি, হৃৎপিণ্ড, যকৃত, অগ্নাশয়, অস্থি, অস্থিমজ্জা, চু, চর্ম ও টিস্যুসহ মানবদেহে সংযোজনযোগ্য যে কোন অঙ্গ বোঝানো হয়েছে। আঠার বছরের কম ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সের কোন ব্যক্তি অঙ্গ দান করতে পারবেননা। তবে রিজেনারেটিভ টিস্যুর ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতা ভাই-বোন সম্পর্কের হলে এ শর্ত কার্যকর হবে না। আর গ্রহীতাকে দুই বছর হতে সত্তর বছর বয়সের মধ্যে হতে হবে। এদের মধ্যে পনের বছর হতে পঞ্চাশ বছরের ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন। আইনে বলা হয়েছে-মানব দেহের যে কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা এর বিনিময়ে কোন প্রকার সুবিধা লাভ এবং সেই উদ্দেশ্যে কোন প্রকার বিজ্ঞাপন প্রদান বা অন্য কোনরূপ প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোন ব্যক্তি এই আইনের কোন বিধান লংঘন করলে অথবা লংঘনে সহায়তা করলে তিনি অনুর্ধ্ব সাত বছর এবং অন্যুন তিন বছর মেয়াদী সশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অন্যুন তিন ল টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর কোন চিকিৎসক এই আইনের কোন বিধান লংঘন করলে বা লংঘনে সহায়তা করিলে তিনিও এ বর্ণিত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এছাড়াও চিকিৎসক হিসাবে তার রেজিস্ট্র্রেশন বাতিলযোগ্য হবে। এছাড়াও এ আইনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপসহ সকল প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে একটি রেজিস্টার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

জাতীয় কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটের হিসেবে ২০০৫ সাল থেকে  ২০১৫ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে আট’শ ৭৫ জন রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭৪ জন এবং বিদেশে তিন’শ একজন রোগী তাদের দেহে কিডনি প্রতিস্থান করেছেন। এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন’শ ৪৭ জন কিডনি ফাউন্ডেশনে এক’শ ৩৪ জন, বারডেম হাসপাতালে ৪১ জন, জাতীয় কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটে ১২ জন, আল মারকাজুল হাসপাতালে ১৫ জন, এ্যাপোলো হাসপাতালে নয় জন, ইউনাইটেড হাসপাতালে ১৪ জন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুইজন রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। জানা গেছে, দেশে ১৯৮৮ সালে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে অনিয়মিতভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয়। ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি শনিবার নিয়মিতভাবে একজন রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়। কিডনি ফাউন্ডেশনে প্রতি সোমবার একজন রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। প্রতিদিনই কিডনি রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কিডনি ফাউন্ডেশনের জরিপ মতে, ১০ বছর আগে কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি। বর্তমানে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি। দেশের শতকরা ৪০ ভাগ নেফ্রাইটিসের কারণে, ডায়াবেটিসের কারণে ২৪ ভাগ ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে ১৫ ভাগ রোগীর কিডনি অকেজো হয়। আর এ সুযোগে কিডনি প্রতিস্থানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে দালালদের দৌরাত্ম। একজন মানুষের দুটো কিডনি থাকে। স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে গেলে এর একটি কিডনিই যথেস্ট। এ কারণেই কিডনি দান করতে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এখন আর আগের মতে দাতার ভয় নেই। কারণ তারা দেখছে ১৯৮৮ সালে কিডনি দেয়া ব্যক্তিও ভালো আছেন। 
 

আমার মতে  দেশে মৃত ব্যক্তির কিডনি প্রতিস্থাপন করা শুরু হলেই দালালদের প্রভাব কমবে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কিডনি ৫ থেকে ২০ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা গেলে কিডনি অকেজো দেহে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্রেন ডেথ (মস্তিষ্কে মৃত্যু) কমিটি গঠন এবং ঢাকার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অরগান প্রকিউরমেন্ট কমিটি (অঙ্গ ক্রয় কমিটি) গঠন করা। এই কমিটি ব্রেন ডেথ (মস্তিষ্কে মৃত্যু) ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর নিকটাত্মীয়কে অঙ্গ দানে সম্মত করে তা ক্রয় করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এবং উপযুক্ত হাসপাতালে তা পৌঁছে দেবে। এ পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে হাজার হাজার কিডনি অকেজো রোগী নতুন জীবন ফিরে পাবে আর এ ব্যবসাও বন্ধ হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত