০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৫:৪৫ পিএম

ভাইয়াকে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছি: চবির ফাইনাল প্রফে প্রথম হওয়া ডা. মেসবাহ

ভাইয়াকে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছি: চবির ফাইনাল প্রফে প্রথম হওয়া ডা. মেসবাহ
ডা. এস এম মেসবাউল করিম জুয়েল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) অধিভুক্ত ১৪টি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ৫৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. এস এম মেসবাউল করিম জুয়েল। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছেন এ নবীন চিকিৎসক। চট্টগ্রাম সরকারি হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএস পাস করেছেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৬-১৭ সেশনে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় সারাদেশে ৮৪৪তম হয়েছিলেন এ কৃতি শিক্ষার্থী।

ডা. মেসবাহ্’র গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। বেড়ে ওঠা বন্দরনগরী চট্টগ্রামেই। বাবা-মা ও তিন ভাই নিয়ে ডা. মেসবাহ্’র পরিবার। বড় ভাই চিকিৎসক, মা গৃহিনী ও বাবা ব্যবসায়ী। ছোট বেলা থেকে কঠোর অধ্যাবসায় ও নিয়মিত প্রচেষ্টায় সব শ্রেণিতে শীর্ষে ছিলেন তিনি। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলে এক হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য ৮৩৪ জন চিকিৎসকের মাঝে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এ মেধাবী মুখ। নবীন এ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে ঈর্ষণীয় সাফল্যের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন

মেডিভয়েস: আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

ডা. মেসবাউল করিম: মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা যে, তিনি আমার চলার পথ সহজ ও সুগম করে দিয়েছেন। এরপর আমার মা-বাবা ও শিক্ষকদের ধন্যবাদ দিতে চাই, সেই সঙ্গে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। কারণ, তাদের দোয়া ও অনুপ্রেরণায় আমার এ পর্যন্ত আসা। আমি পরিবারের দ্বিতীয় চিকিৎসক হিসেবে কি যে খুশি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার এ সাফল্যে পুরো পরিবার আনন্দে ভাসছে। 

মেডিভয়েস: কোন অনুপ্রেরণায় এ পর্যন্ত আসা?

ডা. মেসবাউল করিম: আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার বড় ভাই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন। তখন থেকে ভাইয়াকে দেখে দেখে মেডিকেলে পড়ার একটা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। ধীরে ধীরে আমার মা-বাবা আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরা আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন ও ভয় কাটিয়ে দিয়েছেন। তাদের উৎসাহে এ পর্যন্ত আসা।

মেডিভয়েস: কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান?

ডা. মেসবাউল করিম: আমি যখন ওয়ার্ড কাজ করেছি, তখন থেকে নিউরো মেডিসিন পড়ার ইচ্ছা জাগে। কারণ, মানুষের মাথাটা একটু জটিল মনে হয়। মস্তিস্ক রহস্যে ভরা এবং এখানে জানার অনেক কিছু আছে। যখন মেডিকেলে রোগী আসতো, স্যারেরা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটাকে নির্ণয় করে রোগীকে ম্যানেজ করে ফেলতেন। একটা স্ট্রোকের রোগী, একটা পরিবারের জন্য বড় একটি উদ্বেগের কারণ। যথাযথভাব একজন রোগীকে ম্যানেজ করলে তার পরিবারকে ভালো সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব। এগুলো দেখে ধীরে ধীরে নিউরো মেডিসিনের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মে।

মেডিভয়েস: পরীক্ষার প্রস্তুতি ও কৌশল সম্পর্কে জানতে চাই।

ডা. মেসবাউল করিম: আমি ক্লাস নিয়মিত করতাম, স্যারদের লেকচারগুলো নিয়মিত অনুসরণ করতাম। বই পড়ার সময় স্যারদের লেকচারগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করতাম। স্যারদের লেকচারগুলো হলো একটা গিফটের মতো। একটা বই তিন ঘণ্টা পড়ে বুঝতে না পারলেও স্যারদের লেকচার আধা-ঘণ্টা শুনে বুঝা যায়। স্যাররা যেটা পড়াতেন, সেটা স্যারের লেকচার ও বই থেকে একসাথে উপভোগ করে কমপ্লিট করার চেষ্টা করতাম। আর পড়াগুলো বারবার রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। কতটুকু পড়েছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কতটুকু দিতে পেরেছি এটা গুরুত্বপূর্ণ। স্যারদের পড়া ও ওয়ার্ডের ক্লাসগুলো বারবার রিভিউ দিতাম। পূর্বের প্রশ্নগুলো বই ধরে ধরে চিহিৃত করে পড়তাম।

মেডিভয়েস: যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ।

ডা. মেসবাউল করিম: যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন, তারা আমার থেকে কোনো অংশে কম নয়। হয়তো পরিবারের চাপ ও পারিপার্শ্বিক কোনো কারণে তাদের ভাগ্য খারাপ। প্রস্তুতির কোনো একটা জায়গায় হয়তো একটু সমস্যা ও ঘাটতি ছিল। ওই ঘাটতিটা পূরণ করতে পারলে খুব সহজে দ্রুত আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে অকৃতকার্যরা।

মেডিভয়েস: অনেকেই বলেন, মেডিকেলে যে যত বেশি মুখস্ত করতে পারবে, সে তত বেশি ভালো করতে পারবে? এ চিন্তার বিষয়ে আপনার মতামত।

ডা. মেসবাউল করিম: এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত নয়। মুখস্ত করার অনেক কিছুই আছে। মুখস্ত ছাড়া অনেক কিছুই করা যায় না। মুখস্ত বইয়ের পড়ার সাথে ওয়ার্ডে দেখা প্র্যাক্টিক্যাল দেখা নলেজগুলোর সমন্বয় করতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। এনাটমি, ফার্মাকোলজি ও ফিজিওলজির জ্ঞানগুলো একসাথে সমন্বয় করাটা বেশ জটিল। আর এভাবে আমাদের স্যাররা এবং চিকিৎসকরা চলেন। আর এখানে মুখস্থ বিদ্যার বড় কোনো ভূমিকা নেই।

মেডিভয়েস: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।

ডা. মেসবাউল করিম: ইন্টার্নিতে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দিব। আমি একজন নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হতে চাই। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য ভালোভাবে পড়াশোনা করবো। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিসিএস ছাড়া সেবা দেওয়াটা খুব কঠিন হয়ে যায়। পোস্ট গ্রাজুয়েশন আর পরিবার সবকিছু মেনটেইন করা কঠিন। বিসিএসটা একজন চিকিৎসককে আর্থিক সমর্থনটা দিয়ে রাখে। এজন্য আমারও বিসিএস নিয়ে চিন্তা ভাবনা আছে। এ ছাড়া আমার সমস্তটুকু দিয়ে দেশের মানুষের সেবা করবো। 

মেডিভয়েস: চবির অধীনে অকৃতকার্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সার্জারিতে ফেইল করেছেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

ডা. মেসবাউল করিম: সার্জারিতে বিগত কয়েক বছর ধরে স্যাররা প্রশ্ন প্যাটার্ন ওয়ার্ড ভিত্তিক করে করছেন। এজন্য স্যাররা ওয়ার্ডে ও লেকচারে যা পড়ান, তা পড়লে ভালো করা সম্ভব। বেশির ভাগ প্রশ্ন আসে ওয়ার্ড ও লেকচার থেকে। থিওরি বেজ প্রশ্ন কম আসে, এজন্য হয়তো অনেকে ফেইল করেন। চেষ্টা করলে সবাই একদিন চিকিৎসক হবে। 

মেডিভয়েস: সম্প্রতি মেডিকেলে ক্যারিঅন বাতিল করা হয়েছে। সেইসাথে সিজিপিএ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ডা. মেসবাউল করিম: ক্যারিঅন বাতিল করা আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। সবাই অনেক কষ্টে করে পড়ালেখা করে। হয়তো কারও মা-বাবা অসুস্থ থাকতে পারে বা নিজে অসুস্থ থাকতে পারেন। কোনো কারণে পরীক্ষাটা মিস করে ফেললো। সেজন্য একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর নিজের ব্যাচমেট থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়া, ছয় মাস পিছিয়ে যাওয়া বা অনেক দিন আলাদা থাকা একটি অমানবিক কাজ বলে আমি মনে করি। ক্যারিঅন চালু রাখা উচিত। কারণ, মেডিকেলে সবার সাথে থেকে ধীরে ধীরে শিখে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেলে সবসময় পড়াশুনার অতিরিক্ত চাপ থাকে। শিক্ষার্থীরা চিন্তিত থাকে। ক্যারিঅন বাতিল হলে শিক্ষার্থীরা আরো হতাশায় ভুগবে। আমার মনে হয় এটা খুব ভালো কিছু বয়ে আনবে না। 

আর সিজিপিএ পদ্ধতিটা বাংলাদেশের মেডিকেল সিস্টেমের সাথে যায় না। এ পদ্ধতি চালু হলে আমাদের মধ্যে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। আর সামনের দিকে শিক্ষার্থীরাও অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে। এরপর এ, বি, সি গ্রেডের ডাক্তার নানা ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। অথচ আমরা সবাই একই পড়াশোনা করে ফাইনাল প্রফ দিয়েছি এবং ডাক্তারি পাস করেছি। কেউ অল্প একটু নাম্বারের জন্য সামনে পড়ে যাচ্ছে, কেউ পিছিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ কারও স্কোর অল্প কম বেশি। খুব বেশি নাম্বারের পার্থক্য হয় না। সিজিপিএ দিয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলাদা একটা দেওয়াল তৈরি করা ঠিক হবে না। যখন তারা পেশাগতভাবে রোগীকে ঢিল করতে যাবে, তখন নানামুখী চাপে পড়ব। এটা আসলে মেডিকেলের সাথে যায় না।

মেডিভয়েস: এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই, ‘একটি গবেষণায় দেখা গেছে। প্রায় ৩২ শতাংশ মেডিকেল শিক্ষার্থী নিজেকে অযোগ্য ও প্রতারক ভাবেন।’ এ বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখছেন?

ডা. মেসবাউল করিম: মেডিকেলের পড়ার সিস্টেমের কারণে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এখানে বন্ধু ও স্যারদের কাছ থেকে যে ধরনের মানসিক এবং সহযোগিতা পাওয়া দরকার, তা সবসময় সবার থেকে পাওয়া যায় না। দেখা যায়, আমরা একটা বিষয়ে খারাপ করার কারণে ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনে চলে যাই। একটা সময় পড়াশুনা থেকে ছিটকে পড়ি। আসলে কেউ অযোগ্য নয়, অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই মেডিকেলে সুযোগ পেতে হয়। যোগ্য বলেই মেডিকেলে আসতে পেরেছি। 

আরেকটি ব্যাপার হলো-আমরা কিছুদিন পর রোগীকে ট্রিটমেন্ট দিব। আমাদেরকে শিখিয়ে এবং যথেষ্ট জাজমেন্ট করে পাস করা হয়েছে। আমার মনে হয়, প্রতিটি মেডিকেলে মানসিক বা মনোরোগের মোটিভেশন করার জন্য একটা সেশন করা দরকার। হতাশায় ভুগা শিক্ষার্থীরা একটু মানসিক সাপোর্ট পেলে খুব সহজে তাদের সমস্যা অতিক্রম করতে পারতো। যেটা আমি আমার পরিবার থেকে সর্বদা পেয়েছি। আমার আশপাশের বন্ধুরা দিয়েছে। আবার অনেকেই মানসিক এই সাপোর্টটা পাচ্ছে না।

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চট্টগ্রাম মেডিকেল
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি