ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

ডা. বায়জীদ খুরশিদ রিয়াজ

চিকিৎসক ও সরকারী চাকুরিজীবী। 


১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১২:০৯ পিএম

শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী

শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী

নাম : ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী

ডাকনাম : ঠান্টু

পিতার নাম : আফসার উদ্দিন আহমেদ

পিতার পেশা : সরকারি চাকরি

মাতার নাম : সুফিয়া খাতুন

ভাইবোনের সংখ্যা : চার ভাই ও চার বোন; নিজক্রম-প্রথম

ধর্ম : ইসলাম

স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম-ছাতিয়ানি, উপজেলা-হেমায়েতপুর, জেলা-পাবনা

নিহত/নিখোঁজ হওয়ার সময় ঠিকানা : জলপাইগুড়ি হাউজ, বাড়ি নং-৭৫, সড়ক-সিদ্ধেশ্বরী রোড, থানা-রমনা, জেলা-ঢাকা

জন্ম : ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২। পাবনা

শিক্ষাগত যোগ্যতা :

ম্যাট্রিক : মেধা তালিকায় স্থান, ১৯৪৮, পাবনা জিলা স্কুল

আইএসসি : মেধা তালিকায় স্থান, ১৯৫০, ঢাকা কলেজ

এমবিবিএস : ১৯৫৫, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে অনার্স মার্কস, চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান

এম আর সি পি (কার্ডিওলজি) : ১৯৬০, রয়েল কলেজ অব ফিজিসিয়ানস, এডিনবরা, ইউ কে

এম আর সি পি (ইন্টারনাল মেডিসিন) : ১৯৬২ রয়েল কলেজ অব ফিজিসিয়ানস, লন্ডন, ইউ কে

শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার : এমবিবিএস চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বর্ণপদক লাভ

শখ : সঙ্গীত চর্চা, আলোকচিত্র গ্রহণ, বইপড়া ইত্যাদি

চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা : ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ও ল্যান্সেটে তার রচিত অনেক বৈজ্ঞানিক প্ৰবন্ধ প্রকাশিত

হত্যাকারীর পরিচয় ; বহুল আলোচিত কাদা মাখা মাইক্রোবাসে আগত বাহিনী

নিহত/নিখোঁজ হওয়ার তারিখ : ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকেল ৪টায় নিখোেঁজ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে নিহত

মরদেহ:

প্রাপ্তি স্হান: রায়ের বাজার বধ্যভূমি, ঢাকা

সন্ধানদানকারীর পরিচয় : জনৈক সাংবাদিক

কবরস্থান ; আজিমপুর নতুন কবরস্থান

স্মৃতিফলক/স্মৃতিসৌধ ; আলাদাভাবে নেই। বিএমএ কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ চিকিৎসক স্মৃতিফলকে নামাঙ্কিত আছে

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে সাহায্য/দান/পুরস্কার : ঢাকা ডেন্টাল কলেজ পদক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ

স্ত্রীর নাম : ডা. জাহান আরা রাব্বী (মরহুমা)

বিয়ে : ৮ জানুয়ারি ১৯৫৭

সন্তান-সন্ততি : এক পুত্র ও দুই কন্যা

নাসরিন সুলতানা : এমএ (ইতিহাস)

ওমর রাব্বী : বিএ, ব্যবসায়ী

ড. নূসরাত রাববী : পিএইচডি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় । সায়েন্টিস্ট, Genertech, CA, USA.

 

আমার স্বামী শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী

ডা. জাহানারা রাব্বী

ডাক্তার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কারডিওলজিস্ট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এই তাঁর পরিচয় । তার চেয়েও বড় এবং সত্য পরিচয় হলো তিনি একজন মানুষ ছিলেন। সত্যিকারের মানুষ যেমন সচরাচর চােখে পড়ে না। আমি তার স্ত্রী, তারই সন্তানদের জননী ।

আমি নিজেকে ধন্য মনে করি এমন একজন মানুষের জীবন সঙ্গিনী ছিলাম বলে। পৃথিবীর সুখী মহিলাদের মধ্যে আমি ছিলাম অন্যতমা । আমার কথা হলো আজ আমাকে কিছু বলতে হবে। তিনি আমার স্বামী। এও সত্যি তিনি এ দেশে সব স্তরের মানুষের মধ্যে বহুল পরিচিত ছিলেন। বহুলোকই তাকে ঠিক আপনজন বলেই জানতো ।

এই আপন করে নেয়ার আর সহজভাবে গিয়ে পাশে দাড়াবার একটা সহজাত ক্ষমতা তার ছিল, যা মনে হতো কেবল তাকেই মানাতো । বছর ঘুরে এলো। অনেকের মুখে অনেক কথা শুনি। ভাবি, ১৩, ১৪ ১৫—কোনাে সঠিক তারিখ সাধারণ লোক জানে না। আমার দায়িত্ব ঠিক খবরটি দেশবাসীকে পৌছে দেয়ার।

১৫ ডিসেম্বর। বিকেল ৪টা। আর একটু পেছন থেকে বলছি। ১১ ডিসেম্বর। আমি অফিসে গিয়ে দেখি দুই-তিনজন ছাড়া কেউ নেই। সারা অফিস খালি । আমি হাসপাতালে তার কাছে গেলাম। আরও কয়েকজন প্রফেসর বসেছিলেন। ইতস্তত করে কথাটা বললাম, 'দেখুন সবাই বলছে তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে চলে যেতে।

আর বোধহয় থাকা ঠিক হবে না।” বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে আমি আবার তাকে বললাম, 'দেখো গো, কোথাও যেতে হয়।” তিনি বললেন, “আচ্ছা দেখি কারো সঙ্গে আলাপ করে। আজ বিকেলে কিছু ঠিক করা যাবে।” হাসপাতাল থেকে প্রায় রোগীরা বিদায় নিচ্ছে তখন । আপনারা যারা ঢাকায় ছিলেন নিশ্চয়ই জানেন, ঢাকায় তখন কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। সেদিনই হঠাৎ বেলা ৩টার সময় কারফিউ জারি হলো।

আমি চমকে উঠলাম। টিঙ্কুর আব্বা, ওরা কি জানে আমরা পালাবাে আজা?' আমি প্রশ্ন করলাম। ডা. রাব্বী বিমূঢ় হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘যুদ্ধের সময় পৃথিবীর কোথাও কোনাে কারফিউ দেয়ার রীতি নেই। এবার হয়তো ওরা আমাদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে মারবে, স্বামী বললেন।

১২ তারিখ কারফিউ উঠলো না ; ১৩ তারিখ দুই ঘণ্টার জন্য উঠলো। ১৪ তারিখ উঠলো না। ১৫ তারিখ অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর। আমার মনে আছে—ছবির মতাে সবই ভাসছে অহরহ প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি কথাই ভাসে। তাও আমি চলি, চলছি—বেঁচে থাকা পর্যন্ত চলতে হবে।

আমি মিসেস রাব্বী। ডাক্তার রাববীর স্ত্রী। তাঁর ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে হবে। অন্তত মানুষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা তো করতে হবে। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর রাতে এক স্বপ্ন দেখলাম। একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি জেয়ারত করছি একটা জায়গায়—সেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কী যেন আছে।

১৫ ডিসেম্বর সকালে আমি আমার স্বামীকে স্বপ্নটা বললাম, তিনি চুপ করে শুনলেন। আমি প্রশ্ন করলাম, এটি কী দেখলাম গো? মক্কা শরীফ না মদিনা শরীফ?” একটা কালো ছায়া নেমে এলো তাঁর মুখে। আমি যেন এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই।

বললেন—“তুমি বােধহয় আমার কবর দেখেছ টিঙ্কুর আম্মা।’ আমি যে - তড়িতাহত হয়ে টেলিফোনটা টেনে তার সামনে এনে বললাম—“ফোন কর কে কোথায় আছেন।” কয়েকজন প্রফেসরের বাড়িতে তিনি ফোন করলেন-বেশিরভাগ লোকই তিনি বাড়িতে পেলেন না।

ঢাকার প্রায় টেলিফোন তখন অকেজো । অসম্ভব ভয় লাগছিল আমার । ভয়ে সিঁটিয়ে আসছি তখন। ঝাঁকে ঝাঁকে ঝলকে ঝলকে আকাশে প্লেন আসছে। রকেট ফেলছে, শেল পড়ছে। হঠাৎ বেলা ১০টার দিকে শোনা গেল কারফিউ উঠেছে।

দুই ঘণ্টার জন্য। তিনি গাড়ি নিজে বের করে পুরান ঢাকায় যাবেন এক অবাঙালি রোগী দেখতে। আমি পেছনে পেছনে নেমে এলাম। একতলায়, বললাম-"যেয়াে না তুমি, ও তো অবাঙালি।' তিনি হাসলেন। হাসি ছাড়া তিনি কথা বলতেন না। ভুলে যেয়াে না সে মানুষ।

আমি আবার বললাম, ‘তুমি যে বলো আজই ওরা আত্মসমর্পণ করবে। তো মিরপুর, মোহাম্মদপুরের লোকদের আমরা ক্ষমা করতে পারবাে?” গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে তিনি বললেন, "আহা! ওরাও তো মানুষ। তাছাড়া ওদের দেশ নেই।”

আমি বললাম, কিন্তু এতো সবের পর ওদেরকে ক্ষমা আমরা কেমন করে করবো?” “হ্যা, ক্ষমাও করবে এবং আমাদের স্বাধীন দেশে থাকতেও দেবে।’ স্বাধীন বাংলার এতো স্বপ্ন দেখতেন ডা. রাব্বী। দেশকে এতো ভালোবাসতেন। স্বাধীনতা সংগ্ৰামীদের এতো সাহায্য করেছিলেন আমার স্বামী।

কিন্তু স্বাধীনতা তিনি দেখে যেতে পারেননি, পারেননি দেখে যেতে স্বাধীনভাবে গর্বিত সে রক্তচিহ্নিত পতাকা । তাকে দেখতে দেয়া হয়নি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। আমাদের একমাত্র ছেলে টিঙ্কু, বয়স তখন ১৩ বছর। সে-ও চলে গিয়েছিল মুক্তিসংগ্রামে যোগ দিতে।

দু’মাস পরে তার বাবা গিয়ে তাকে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনে। সাড়ে এগারোটায় তিনি বাড়ি এলেন—অনেক মাছ, গোশত-সবজি নিয়ে। হেসে বললেন, “দেখো কতো কী এনেছি। সারেন্ডারের সময় এখন, খুব গোলমাল হবে। কোনাে জিনিস পাওয়া যাবে না। একি, তুমি এতো ভয় পাচ্ছে কেন? তোমার এতো সাহস, এতো বুদ্ধি।

চালো মুর্শেদ ভাইয়ের বা মইনুল ইসলাম সাহেবের বাসা থেকে ঘুরে আসি, আমি স্তব্ধ হয়ে শোবার ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। ছেলেকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আমি একটা সুটকেস গুছিয়ে তৈরি হয়েই ছিলাম। আমি যাবােই। যেতেই হবে আমাদের।

দুপুর ১২টায় কারফিউ। তিনি এলেন। খেলাম আমরা। খাবার টেবিলে বললেন, ‘আজকের দিনে এত ভালো খাবার খেলাম। খুব ভালো খাওয়ালে তো তুমি।” আমি চুপ করে ছিলাম। কেননা রান্না আমাদের সেদিন হয়নি নতুন করে-আগের দিনের তরকারি। বোমা পড়ছে, যুদ্ধ চলছে।

রেডিওতে বিভিন্ন ভাষায় ইন্ডিয়ান আর্মি স্টাফ জেনারেল মানেকশর আত্মসমর্পণের আহবান জানাচ্ছেন, এক অজানা সর্বনাশা ভয়ে আমি কুঁকড়ে আসছি। দুপুরে আমি তাকে অনুরোধ করলাম, চলো এখন যাই। একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকো”; একটা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য তিনি ফোনও করেছিলেন।

পরে বললেন, “আচ্ছা দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই।” আমার মুখে কোনাে কথাই জোগালো না। আমি আস্তে আস্তে কেমন যেন নির্জীব হয়ে আসছিলাম। বিকেল চারটা। আমাকে একটা লিব্রিয়াম খাওয়ালেন। হেসে ছেলেমেয়েদের ডেকে বললেন, “দেখো তোমার আম্মা কেমন ভয়ে নীল হয়ে যাচ্ছে।” বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি প্লেন থেকে রকেট পড়া দেখছিলেন।

আমি ডাকলাম, ঘরে আসো।” স্প্লিটার ছুটে এসে লাগতে পারে।” আমি খাটে শুয়ে। তিনি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ডান হাত আমার বা গালে রাখলেন। হেসে বললেন, “মনি ভয় পেয়ো না। এই তো স্বাধীন হয়ে গেল।’ আমি তাকিয়ে ছিলাম তার চেহারার দিকে। বিরাট চেহারা।

হাসিতে উজ্জ্বল চােখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। ‘কথা বলছ না যে? চা খাবে?” জিগ্যেস করলেন তিনি। বিমূঢ় আমি তাকিয়েই আছি। কলিং বেল টিপলেন। বাবুর্চি এলো, ফিসফিস করে বললো, "সাহেব বাড়ি ঘিরে ফেলেছে ওরা-গাড়ি।” তিনি সোজা সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম ।

হ্যাঁ-বহু রাজাকার, আলবদর, আর্মি। একটা সাদা কাদা মাখানাে মাইক্রোবাস, একটি জিপ । তিনি নিচু গলায় পেছনে না ফিরেই বললে, ‘টিঙ্কুর আম্মা, আমাকে নিতে এসেছে।” আমি মুহুর্তে দৌড়ে গিয়ে তিন ছেলেমেয়েকে ওদের শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করলাম। কাছের এক বাড়ির ভদ্রলোক বারান্দায় ছিলেন, তাকে চিৎকার করে ডাকলাম। তারপর দেখলাম।

আশপাশের সব দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে গেল। আমি দৌড়ে সামনের বারান্দায় এলাম। ইতোমধ্যে ডা. রাববী দারোয়ান ইদ্রিসকে ডেকে তালা বন্ধ করে সদর দরজা ও সিঁড়ির দরজা খুলে দিতে বলেছিলেন। এসে দেখলাম তিনি ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছেন। চারদিক থেকে পাঁচ-সাতজন সশস্ত্র সৈন্য তাকে ঘিরে আছে।

তিনি নামতে শুরু করলেন সিঁড়ির দরজা পেরিয়ে। আমি দৌড়ে গিয়ে বাধা দিতে চেষ্টা করলাম। ‘হল্ট’ বলে দু'জন এগিয়ে এসে আমার বুকে বন্দুকের নল চেপে ধরলো, আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি দেখলাম পেছনে থেকে তিনি মাথা উঁচু করে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়িটা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো।

ওরা আমার বুক থেকে বন্দুক নামালো। তখন বেলা চারটা-১৫ ডিসেম্বর; কয়েক মিনিটের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম। তারপর টেলিফোন করতে লাগলাম চারদিকে পাগলের মতো। অবশেষে কর্নেল হেজাজী স্বীকার করলেন, “ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী ও ইউনিভার্সিটি থেকে বিশজন প্রফেসরকে নিয়েছি। রাজনৈতিক অপরাধবশত । ‘কাল সকালে দেখা যাবে।” কাল সকাল আর তাদের জীবনে আসেনি।

১৬ ডিসেম্বরের সূৰ্যলাল আকাশ তাদের জন্য ছিল না। ১৫ ডিসেম্বর দিনগত রাত তিনটায় লালমাটিয়া ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ট্রাকে তুলে এদেরকে রায়ের বাজারের ইটখোলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সে সময়ে খুন করা হয়। আমি শুনতে পেয়েছিলাম তার মরণাহত সে আর্তনাদ, কেমন করে তা আজও জানি না।

আমি বসে ছিলাম ঘরে, তখনও কারফিউ চলছে, ব্ল্যাকআউট, টিঙ্কুর আম্মা’ তীব্র আর্ত একটা চিৎকার। আমি অন্ধকারের মধ্যেই শোবার ঘরের দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটে গেলাম।— সিঁড়ির দরজা বন্ধ। বাবুর্চি, দারোয়ানরা আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে শোবার ঘরে রাখলো।

একটা ছেলে যে বেঁচে আসতে পেরেছিল সে-ই পরে এসে একথা আমাকে বলে গিয়েছিল—গুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই ‘টিঙ্কুর আম্মা’ বলেই তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। আর সে রাত দশটায় ডা. রাববীকে প্রশ্ন করেছে পাক আর্মি, “তুমি ডা. রাব্বী?”

হ্যাঁ ।'

“কত টাকা দিয়েছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের?

‘আমি সরকারি চাকুরে, তাদের আমি কোনাে আর্থিক সাহায্য করিনি।” ধীর শান্ত উত্তর। অনেকে কেঁদেছে বন্দিদের মধ্যে, প্রাণভিক্ষা চেয়েছে। তিনি অবিচলভাবে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করেছেন। মাথা নােয়াননি

‘আমাদের যখন মেরেই ফেলবে তাে ওদের সঙ্গে কথা বলা বৃথা।” তিনি বলেছিলেন শান্তস্বরে। এই আমার স্বামী ।

১৬ ডিসেম্বর সকাল। আমার স্বামী সম্বন্ধে ফোনে খোজ করাতে কর্নেল হেজাজী বললেন, ‘তাদের কী হয়েছে আমি জানি না।’ ওদের এ ধরনের কথার অর্থ তখন আমরা ধরতে শিখেছি। মেরে ফেলার পরই ওরা ব্যক্তিদের সম্পর্কে কিছু জানে না। আমি একটা অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আমার স্বামীর দেহ খুঁজে বের করার জন্য ইউন নেশন্সের চেয়ারম্যান জন কেলির কাছে গিয়েছিলাম।

হােটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তখন সারেন্ডারের টার্মস সম্পর্কে মিটিং চলছে। পাকিস্তান ও ইন্ডিয়ান আর্মিদের ছোটখাটাে একটা খণ্ডযুদ্ধের সামনে পড়লাম।

১৮ ডিসেম্বর। অবশেষে তাঁর মৃতদেহ খুঁজে বাড়ি আনলো আমার এক আত্মীয়। হ্যা, তিনি ঘুমিয়ে আছেন শান্তিতে। মুখটা ডানদিকে একটু হেলানাে। বাঁ দিকের গালের হাড়ে ও কপালের বা পাশে বুলেটের সারাটা বুকে বহু বুলেটের চিহ্ন—ক’ত আমি গুনিনি। তবে একথা মিথ্যে যে তাঁর বুক কেটে ফেলা হয়েছিল। আমি সে বুক দু'হাতে ধরে দেখেছি।

তারপর দীর্ঘ দু'মাস। আবছা মনে পড়ে—মাঝে মধ্যে। কত লোক বহু ভিড়। আমি কোনো লোক চিনতে পারতাম না, কিছু ভালো মনে করতে পারতাম না। আমি কাঁদতে পারিনি তাঁকে দেখে। আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। ভুল হয়—তিনি আছেন। হ্যাঁ, আমার জন্য তিনি আছেন- আছেন আমার দৃষ্টিতে, অনুভূতিতে, চেতনায়, আমাকে ঘিরেই তিনি আছেন, আছেন আমাদের ছেলেমেয়েদের ঘিরে। আমি একা নই। তিনি আছেন আমার মাঝেই ।

আমাদের পৃথিবীতে যখন জন্ম একদিন তখন মৃত্যুও একদিন হবে। আমার স্বামীর সঙ্গে আমার কথাই ছিল তিনি আগে যাবেন। প্রশ্ন আমার একটাই, কিন্তু এভাবে কেন ?’

 

সংকলনে : মেডিভয়েস।

সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক (জীবন কোষ) ।

লেখক:  বায়জিদ খুরশীদ রিয়াজ।

 

 

 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত