১৬ অগাস্ট, ২০২২ ০৫:২৭ পিএম

পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ: যা বললেন বিশেষজ্ঞরা 

পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ: যা বললেন বিশেষজ্ঞরা 
ছয় মাসের প্রশিক্ষণে চিকিৎসক নয়, সহায়ক হওয়া যায়।

আলী হোসাইন: ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) ডিগ্রিধারীদের কর্মপরিধি ও ভুয়া চিকিৎসকদের প্রতিরোধ করতে বিএমডিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন করে সামনে আসছে পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের কথা। এ নিয়ে চিকিৎসক মহলে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এমনিতেই নামে-বেনামে অনুমোদনহীন অনেক প্রতিষ্ঠান পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে ঘোষণা দিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হলে তাদের দৌরাত্ম বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। এতে প্রতারিত হবে সাধারণ মানুষ। তবে কেউ কেউ বলছেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম ও নীতিমালা তৈরি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডক্টরস’ ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) চেয়াম্যান ডা. শাহেদ রফি পাভেল মেডিভয়েসকে বলেন, সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি রেফারেল পদ্ধতি আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিক সেবা দিয়ে আসছে। প্রথমে একজন রোগী কমিউনিটি ক্লিনিকে যাবে। সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হবে। আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আসবে জেলা হাসপাতালে।

সরকার স্বাস্থ্যখাতে পল্লী চিকিৎসকের সংযুক্তির কথা বলেনি জানিয়ে এ পেশাজীবী নেতা বলেন, কেউ একজন মনগড়া একটা কথা বলতে পারেন না। প্রয়োজন হলে সেটি সরকার দেখবে।

পল্লী চিকিৎসকদের মেডিকেল চিকিৎসার কোনো যোগ্যতাই নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তাঁদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রয়োজন নেই। মেডিকেল সায়েন্সের মতো একটি বিষয়ে কি প্রশিক্ষণ নিবেন তাঁরা। ওনাদের তো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মেডিকেল শিক্ষা নেই, তাহলে কিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁদের প্রশিক্ষণ বৈজ্ঞানিক সম্মত হবে না।’

বিডিএফ চেয়াম্যান বলেন, প্রশিক্ষণের নামে যা করা হবে, তা হবে প্রকৃত চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখন যদি ঘোষণা দিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়, তাহলে এসব পল্লী চিকিৎসকদের দৌরাত্মা আরো বেড়ে যাবে। মানুষ প্রতারিত হবেন। আরও বেশি ভোগান্তির শিকার হবেন। তথাকথিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভালো কোনো ফল আসবে না বলেও মনে করেন  তিনি।

ডা. শাহেদ রফি পাভেল বলেন, নার্সদেরও ন্যূনতম একটি একাডেমিক কোর্স সম্পূর্ণ করতে হয়। কাজ করার যোগ্যতা থাকতে হয়। পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে গেলে আগে তাঁদের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করে আসতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্য সেবায় কাজ করলে নেতিবাচক ফল আসবে।

তবে একই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।

পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে জানিয়ে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, প্রশিক্ষণের বিষয়ে দ্বিমত করেন না তিনি। তবে তাঁরা কি চিকিৎসা দিবে, সেটি নির্ধারিত থাকতে হবে। প্রশিক্ষণের বিষয় স্পষ্ট থাকতে হবে।

সাবেক এই ভিসি বলেন, চিকিৎসা নিয়ে কোনো হেয়ালিপনা করা যাবে না। চিকিৎসার মান নিয়ে কোনো আপোস করা যাবে না। পল্লী চিকিৎসকদের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তাদেরকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। 

ছয় মাসের প্রশিক্ষণে চিকিৎসক নয়, সহায়ক হওয়া যায়

অধ্যাপক কামরুল হাসান খান বলেন, ছয় মাসের বা তিন মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে চিকিৎসক হওয়া যায় না। চিকিৎসকের সহায়ক হতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এটুকু ধারণা দিতে হবে যে, রোগীটা কোথায় পাঠাতে হবে। প্রশিক্ষণের বাইরে তাঁরা যেনো হাত না দেয়।

তিনি এও বলছেন, সাধারণত অন্য বিষয়ে লিখাপড়া করে চিকিৎসক হওয়া যায় না। এ জন্য শুধু একবার প্রশিক্ষণ দিলে হবে না, কিছুদিন পরপর আবারও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমবার ছয় মাসের দিলে পরবর্তীতে এক মাসের, পনের দিনের এভাবে প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে।

এ সময় বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য সেবার আওতায় আনতে পল্লী চিকিৎসকের প্রয়োজনীতার কথাও তুলে ধরেন ডা. কামরুল ইসলাম খান। বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে তো ব্যাপক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছে না সরকার। একটি উপজেলায় চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষের বাস। সেখানে খুব বেশি হলে পঞ্চাশ থেকে একশ চিকিৎসক আছেন। এতো স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের দরকার আছে।

বৈজ্ঞানিকভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, যেটুকু চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ থাকবে, সেটুকু বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণে নীতিমালা নবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, সরকারি চিকিৎসক আছে প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো। এ দিকে বেকার রয়েছে ৬০-৭০ হাজার চিকিৎসক। সবাইকে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য একটি নীতিমালা করা দরকার যে, সরকারি চিকিৎসা যদি নাও দিতে পারে, তাহলে নিজ নিজ এলাকায় যাতে চিকিৎসা দিতে পারেন। এজন্য চেম্বার করে বা ব্যাংক লোন দিয়ে সরকার তাঁদের সহায়তা দিতে পারে।

‘একেবারে গ্রামে না গেলেওে উপজেলার কাছাকাছি থেকে তারা চিকিৎসা দিতে পারবে, বেকার বসে থাকবে না। সরকারকে একটা মেধাবী ছেলে বা মেয়ের দিকে নজর দিতে হবে। ৬০-৭০ হাজার চিকিৎসককে যদি সারাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছড়িয়ে দিতে পারা যায়, চিকিৎসক সংকট অনেকাংশ দূর হয়ে যাবে’, যোগ করেন তিনি।

অধ্যাপক কামরুল বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবকাঠামো ভালো আছে। এ কাঠামো ব্যবহার করে চিকিৎসকদরে কর্মসংস্থান এবং রোগীদের সেবা দেওয়া যায়, তাহলে ভালো কিছু হবে। চিকিৎসা সেবার বিনিময়ে রোগীর দেখার আয় হতে একটি অংশ বেসরকারি চিকিৎসকদের দিতে হবে। তাহলে তারা এখানে থাকবেন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশের পঞ্চাশ ভাগ লোক আধুনিক চিকিৎসার আওতায় রয়েছে। বাকি পঞ্চাশ ভাগ মানুষকে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আনতে অনেক পরামর্শ দিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তাতে খুব একটা টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, তবে কোনো অগ্রগতি নেই। তারা বলছেন, তৃণমূলের সব পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার আপডেট করা দরকার, যার মাধ্যেমে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।

প্রসঙ্গত, গত ২ আগস্ট ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পল্লী চিকিৎসক সমিতি আয়োজিত জেলা প্রতিনিধি সম্মেলন ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেন, গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষকে চিকিৎসা দেন পল্লী চিকিৎসকরা। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় পল্লী চিকিৎসকরা এখন ভুল করেন না। দেশের পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি

তিনি আরও বলেন, উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে পল্লী চিকিৎসকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পল্লী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ জরুরি। কারণ, তারা সঠিক তথ্য ও চিকিৎসা পদ্ধতি না জানলে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবে না এবং সঠিক চিকিৎসকের কাছেও পাঠাতে পারবেন না।

এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি