০৯ অগাস্ট, ২০২২ ১০:২৬ এএম

ঢামেকের ইন্টার্ন চিকিৎসককে পিটিয়ে রক্তাক্ত

ঢামেকের ইন্টার্ন চিকিৎসককে পিটিয়ে রক্তাক্ত
নির্মম আঘাতে তার কানের পর্দা ছিড়ে গেছে। কানে কম শুনতে পাচ্ছেন। দাঁতের মাড়ি কেটে গেছে। ডান চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে।

আবু নাঈম মনিরঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক সাজ্জাদ হোসাইনের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। হামলায় তার নাক, চোখ, দাঁত ও কানে গুরুতর জখম হয়েছে। সোমবার (৮ আগস্ট) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ হামলা হয়।

হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে আজ মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) সকালে মেডিভয়েসকে কে-৭৩ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, নির্মম আঘাতে তার কানের পর্দা ছিড়ে গেছে। কানে কম শুনতে পাচ্ছেন। দাঁতের মাড়ি কেটে গেছে। ডান চোখে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। নাকের সেপ্টাম ইঞ্জুর্ড হয়েছে।

আইডি কার্ড না থাকায় পাশবিক নির্যাতন

নিজের ওপর চলা পাশবিকতার বর্ণনা দিয়ে ডা. সাজ্জাদ বলেন, সোমবার রাত ৯টার দিকে শহীদ মিনারে যান তিনি। সে সময় মূল বেদির পাশে মাটির ওপরের রেলিংয়ে বসে ছিলেন তিনি। তখন কয়েকজন ছেলে এসে তার পরিচয় জানতে চায়। ঢাকা মেডিকেলের বলার পরও তারা ডা. সাজ্জাদের পড়াশোনার বর্ষ জানতে চায়।

এ সময় ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিচয় দিলে তারা তার আইডি কার্ড দেখতে চায়। আইডি কার্ড দেখাতে না পারায় চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তাদের সাথে তো ঢাবির আইডি কার্ড আছে।’

এ সময় ডা. সাজ্জাদ ক্যাম্পাসের পাশেই এসেছেন উল্লেখ করে সবাই আইডি কার্ড সাথে নিয়ে ঘুরে কিনা, জানতে চান?

সঙ্গে সঙ্গে তাকে মারধর শুরু করে সন্ত্রাসীরা। তিনি অবাক হয়ে জানতে চান, তার দোষ কী? এর পর তাকে দ্বিতীয় দফায় মারতে শুরু করে তারা।

মাথা ও মুখে উপর্যুপরি লাথি 

ডা. সাজ্জাদ জানান, ততক্ষণে ৪/৫ জনের আরেকটি গ্রুপ এসে তাকে ইচ্ছামতো পিটায়। তারা তার মাস্ক ছিড়ে ফেলে। কানের নিচে সজোরে আঘাত করায় তার মাথা ঘুরতে থাকে। এ সময় নিজেকে রক্ষায় বসে পড়লে মাথা ও মুখ বরাবর লাথি মারা হয়। এতে নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন পকেট টিস্যু বের করে রক্ত বন্ধের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তখনো থামেনি পৈশাচিক হামলা। 

এক পর্যায়ে স্থান ত্যাগ করতে বলে সন্ত্রাসীরা। কিন্তু মাথা ঘোরার কারণে হাঁটতে না পরায় বসে থাকেন তিনি। আর এতে ইচ্ছামত মারতে থাকে তারা।

অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে নিজেরা একটি রিকশা ডেকে ডা. সাজ্জাদকে ‍এতে উঠিয়ে দিয়ে চালককে বলে, ‘ও যেখানে নামতে চায়, নামিয়ে দিস।’ 

রিক্সা নিয়ে ববশিবাজার সিগনালের গেইটে গেলে রুমমেট এসে তাকে নিয়ে যায়। ডা. সাজ্জাদ বলেন, এরপর থেকে এক কানে কম শুনছেন তিনি। হামলায় দাঁতের মাড়িও কেটে গেছে। গালের পাশে ফুলে আছে। ডান পাশের চোখ লাল হয়ে আছে।

রুমে যাওয়ার পর তাকে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়। পুলিশ কেইস সিলসহ ইঞ্জুরি নোট লিখেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। পরে তাকে নাক-কান-গলা বিভাগে রেফার করা হয়। চিকিৎসকরা জানালেন, তার নাকের সেপ্টাম ইঞ্জুর্ড হয়েছে। কানের পর্দায় ব্লিডিং স্পট আছে, তবে হিয়ারিং লস আছে কিনা, তা বুঝতে বুধবার (১০ আগস্ট) অডিওগ্রাম করতে হবে।

ঢামেকে চিকিৎসা নিতে আসা ঢাবি ও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতি ও সমানুভূতির কথা ব্যক্ত করে ডা. সাজ্জাদ বলেন, ‘ইন্টার্নশিপে জয়েন করার পর থেকে ঢাবির/বুয়েটের অনেক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আসতে দেখছি। তাদেরকে যথাসম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। স্যারদের কাছেও রোগীর কোন দরকারে গেলে বলছি স্যার রোগী ঢাবির স্টুডেন্ট। পাশের ক্যাম্পাস, নিজেদের লোক ভেবেই এইটা করতাম। আজকে এ রকম প্রতিদান পেলাম।’

নিজের শান্তিপ্রিয়তার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জীবনে কারো সাথে মারামারি করেছি, মনে পড়ে না। হলে আছি আজকে ৬ বছর ধরে। আমার পরিচিতরা জানেন, কতটুকু নম্রতার সাথে চলতে চেষ্টা করি। এরপরেও রক্ষা পাইনি এমন অভিজ্ঞতা থেকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেই শহীদ মিনার ঢামেকের হলে ঢামেকের স্টুডেন্টদের দ্বারা প্রথম বানানো হয়েছিল, সেই শহীদ মিনারে ঢামেকের পরিচয় দেওয়ার পরও এভাবে মার খেতে হলো। আমি কোনো দিন শহীদ মিনারকে আমার ক্যাম্পাসের বাইরের কিছু ভাবিনি।’

‘কি চমৎকার দেশে বাস করি, এইটাই ভাবছি। যখন-তখন যে যারে পারছে, মানুষের সামনে আরেকজনকে মারছে। মানুষও মজা করে দেখছে। কেউই প্রতিবাদ করছে না। আহা কি সুন্দর’, যোগ করেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এ কৃতিসন্তান।

এ ঘটনায় ঢামেক কর্তৃপক্ষ মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতেও বহুবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ জাতীয় ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ না করায় এর পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলছে। আমি চাই, আমার আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটুক।’

ঢামেক প্রশাসনের বক্তব্য

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞা আজ মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) দুপুরে বলেন, ‘আজ বন্ধের দিন হওয়ায় কিছুক্ষণ আগে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মহোদয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমাদের একজন শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসক, যারা মূলত হাসপাতালের মূল কাজটা সম্পাদন করেন। তাঁর ওপর অতর্কিতে হামলা হওয়ায় আমরা বিব্রত বোধ করছি। এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য না। কাজ শেষে একজন বিশ্রাম নিচ্ছেন, এটা আবার ঢাকা মেডিকেলের একেবারেই লাগোয়া চত্বরে, যেখানে সব সময় আমাদের চিকিৎসক শিক্ষার্থীদের আনাগোনা আছে। সেখানে যারা এ রকম আক্রমণ করলো, আমরা তাদের সুষ্ঠু বিচার চাই। আমরা ইন্টার্নদের সঙ্গে আলোচনা করবো, তারা হয় তো প্রতিবাদ কর্মসূচি যাচ্ছে। আমরা তাদেরকে বলবো, রোগীদের সেবা যেন ব্যাহত না হয় এবং এর মাধ্যমে যেন উপযুক্ত সমাধান নিশ্চিত হয়। হামলাকারীদের যেন বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করবো। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতৃবৃন্দ মিলেই একটি সিদ্ধান্ত নেবো, যাতে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা না ঘটে।’

হামলাকারীরা ঢাবির শিক্ষার্থী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা করবো।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. নাজমুল হক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এর আগে জানতে পারিনি, আপনার মাধ্যমেই জেনেছি। আমার জানা উচিত ছিল, কিন্তু জানতে পারিনি। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছি। তার চাওয়ার ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা খোঁজ নিচ্ছি, নিগ্রহের ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা দেখবো এবং যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেগুলো করবো।’

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক নিগ্রহ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি