ঢাকা      সোমবার ২৪, জুন ২০১৯ - ১০, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



এম এল গণি

কানাডা প্রবাসী প্রকৌশলী। সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। 


কানাডায় মেডিকেলে ভর্তি

এম এল গণি : 

একটা সুখবর দিয়েই শুরু করি বন্ধুরা: আমাদের রাজকন্যা অয়ন কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব মেডিসিন (MD) প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছে। 

এর বাইরে, ক্যালগেরী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তার ভর্তির অফার এসেছিলো; নানা বিবেচনায় সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে সে।

 আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওর ক্লাস শুরু হবে এ বছরের আগস্টের শেষদিকে । 

 

মেডিক্যালে চার বছর পড়াশোনার পর শুরু হবে রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম, যা বাংলাদেশের ইন্টার্নি প্রোগ্রামের সাথে তুলনা করা চলে হয়তোবা।

 ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান হতে হলে দু বা, তিন বছরের রেসিডেন্সি করতে হয়; আর, স্পেশালিস্ট বা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হতে হলে তিন থেকে পাঁচ, এমনকি ছ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

তার মানে, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে একজন হবু ডাক্তারকে মেডিক্যাল কলেজ বা, হাসপাতালে আট থেকে দশ বছর কাটাতে হয়। এ এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া বটে।

 

বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেই ডাক্তারি পড়া শুরু করা যায়; এখানে ব্যাপারটা সে রকম নয়।

 কেবল স্কুল কলেজের পরীক্ষার ভালো ফলাফল এদেশে মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।

 উচ্চমাধ্যমিক (গ্রেড ১২) শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে কয়েক বছর পড়তে হয় বা ক্ষেত্রবিশেষে চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রী ভালো জিপিএ-সহ পাশ করতে হয়।

এরই মাঝে মেডিক্যাল কলেজ এডমিশন টেস্ট (MCAT) নামের অনলাইন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে গ্রহণযোগ্য স্কোর পেতে হয়।

 

এসোসিয়েশন অব আমেরিকান মেডিকেল কলেজেস (AAMC) এ পরীক্ষা পরিচালনা করে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বায়োলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, সাইকোলজি, সোসিওলজি, ইত্যাদি বিষয় এ পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

মাল্টিপল চয়েজ ধাঁচের MCAT পরীক্ষা অনেক দীর্ঘ; প্রায় সাত-আট ঘন্টা লাগে এটি সম্পন্ন করতে। 

 

পড়াশোনার পাশাপাশি নানা প্রকারের এক্সট্রাকারিকুলার একটিভিটিজও, যেমন, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ভলান্টিয়ারিং, চাকুরী, ইত্যাদি করতে হয়।

 তাছাড়া, কারো অধীনে চাকুরী করেছে বা, রিসার্চ করেছে এমন ব্যক্তিবর্গ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ফরমে একাধিক রেফারেন্স লেটারও সংগ্রহ করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার জিপিএ, MCAT স্কোরসহ প্রয়োজনীয়সব তথ্যাদি যোগাড় করার ফাঁকে ফাঁকে নিজের একটা প্রফাইলও তৈরী করতে হয়।

 অতপর, যথাযথ ফি দিয়ে ভর্তির আবেদনপত্র পূরণ ও জমা দেবার পালা। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে আবেদন করতে হয়।

 

মেডিক্যাল ভর্তির ফলাফল চূড়ান্ত হবার কমবেশি এক বছর আগে ভর্তি প্রক্রিয়া, যেমন, MCAT পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া, রেফারেন্স লেটার সংগ্রহ, ইত্যাদি, শুরু করতে হয়।

 আবেদনপত্র বিশদ যাচাই বাছাইয়ের পর কিছু সংখ্যক প্রার্থীকে সাক্ষাত্কারের জন্য আহ্বান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটি।

এ সাক্ষাত্কার আবার কয়েকভাগে বিভক্ত, যাকে বলে MMI বা, মাল্টিপল মিনি ইন্টারভিউ।

কয়েকটি স্টেশনে পৃথক পৃথক গ্রুপ বা কমিটি পৃথক পৃথকভাবে ইন্টারভিউ নিয়ে থাকেন, এবং একেক গ্রুপ একেক বিষয়ের উপর ফোকাস করে থাকেন।

 নানারকম কমিটির মখোমুখি করে ইন্টারভিউ নিয়ে আসলে প্রার্থীর কোন বিশেষ দোষ-গুন পরখ করতে চান তাঁরা?

সোজা উত্তর, নানাদিক; বিভিন্নমুখী প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তাঁরা দেখতে চান প্রার্থী আসলে মানুষ হিসেবে কেমন।

তার মানে, তিনি কি কেবল টাকা কামানোর মেশিন হতে ডাক্তার হতে চাইছেন, না তাঁর মধ্যে মানবীয় গুনাবলীও বিদ্যমান?

 

যেমন ধরুন, জানতে চাওয়া হলো, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এক রোগী মরতে চাইছেন স্বেচ্ছায় । আপনি কি তাঁকে যে করেই হউক বাঁচিয়ে রাখতে চাইবেন?

বা ধরুন, এমনও হতে পারে, কোনো রোগী বিশেষ একটি ওষুধ খেতে আপত্তি করছেন যা তার গ্রহন করা একান্তই দরকার ।

এ অবস্থায় ডাক্তার হিসেবে আপনার ভুমিকা কি হওয়া উচিত?

 

এমন প্রশ্নও শুনেছি, হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থী আবেদন করেছে, তাঁদের কাউকে বাদ দিয়ে আপনাকে ভর্তির অফার দেয়া যৌক্তিক মনে করেন কেন বলবেন?

অপর এক প্রার্থীকে নাকি এক কমিটি এ প্রশ্নও করেছেন, স্পেশালিস্ট ডাক্তারদের বেতন তো অস্বাভাবিক রকমের বেশি; তাঁদের বেতন কমানোর বিষয়ে আপনার কোনো সুপারিশ আছে কী?

- দেখুন অবস্থা, ডাক্তাররাই ডাক্তারদের বেতন কমানোর সুপারিশ শুনতে চাইছেন !

এ যেনো আমাদের দেশের কোন জেলা প্রশাসক (DC) স্বেচ্ছায় দাবি তুলছেন তাঁকে জেলা প্রশাসক না বলে ডেপুটি কমিশনার সম্বোধন করতে (সে কি হয়?)।

কানাডায় মেডিক্যালে ভর্তিতে প্রার্থীর ইন্টারভিউ-এর ফলাফল অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এ ইন্টারভিউ'র গুরুত্ব পুরো ভর্তি প্রক্রিয়ার পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

 অর্থাৎ, প্রার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিপিএ, MCAT পরীক্ষার ফলাফল, ইত্যাদি হতে আহরিত মোট পয়েন্ট বা স্কোর, কেবল ইন্টারভিউ হতে অর্জিত স্কোরের সমান গন্য করা হতে পারে।

ক্যালগেরী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সে নিয়মই অনুসরণ করা হয়।

 অপরদিকে, এডমন্টন শহরে অবস্থিত আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারভিউর গুরুত্ব মোট স্কোরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

মোটকথা, একজন প্রার্থীর একাডেমিক অর্জন যত উঁচুমানেরই হউক না কেন, তাকে মাল্টিপল মিনি ইন্টারভিউ (MMI) সফলভাবে মোকাবেলা করতে হবে; এর অন্যথা নেই।

এভাবে নয়-দশটি কমিটির সমন্বয়ে আলাদাভাবে ইন্টারভিউ নেয়া হয় বলে এক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণের শিকার হবার সম্ভাবনা কল্পনা করাও কঠিন ।

 

 সাক্ষাত্কার গ্রহণ পর্বের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় মেডিক্যাল স্কুলে (বলা দরকার, এসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয়কেও স্কুল বলে) ভর্তি পরীক্ষার সর্বশেষ পর্যায় বা ধাপ।

ইন্টারভিউর মাস খানেকের মাথায় ভর্তি কমিটি চূড়ান্ত মনোনীত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ভর্তির অফার লেটার পাঠান।

অফার গ্রহন করলেই ভর্তি নিশ্চিত।

বলা বাহুল্য, খুব ভালো রেজাল্ট করা এবং সম্ভাবনাময় ছাত্র-ছাত্রীরাই এদেশে ডাক্তারিতে ভর্তি হবার জন্য আবেদন করে থাকে।

তারপরও, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের কমবেশি দশ শতাংশ কেবল কানাডায় মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তির চূড়ান্ত সুযোগ পায়। 

 

এদেশে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির নির্ধারিত কোনো বয়স নেই।

 তাই, 'একবার না পারিলে দেখো শতবার' উপদেশ পালন করার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত।

এভাবে, অনেকে বারবার চেষ্টা করতে থাকেন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির।

এ কারণে, মাস্টার্স ডিগ্রীধারী, এমনকি, বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদেরও মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় কানাডা বা আমেরিকায়।

অনেক সময় মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন জিপিএ পেলে মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া যায়? এর সহজ কোনো উত্তর নেই।

এটা নির্ভর করছে আপনি কোন পর্যায় থেকে মেডিক্যালে ভর্তির আবেদন করছেন তার উপর।

 

এর মানে হলো, কেউ যদি মাস্টার্স ডিগ্রী কমপ্লিট করে এপ্লাই করেন তাঁর যা জিপিএ দরকার হবে- তার চেয়ে অনেক বেশি জিপিএ লাগবে যে প্রার্থী ব্যাচেলর ডিগ্রী (এদেশে বলে আন্ডারগ্রেজুয়েট বা, আন্ডারগ্রেড) সম্পন্ন করার আগেই আবেদন করেছেন।

এর পেছনে যুক্তি হলো, উচ্চ ডিগ্রিধারীর আহরিত জ্ঞানের পরিমান বেশি, তাই তাঁর ততটা উঁচু লেভেলের জিপিএ না হলেও সমস্যা নেই।

অকাট্য যুক্তি বটে। আফটার অল, এসব দেশ তো যুক্তিতেই চলে।

এছাড়া, প্রার্থী কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেছেন তার রেংকিং’এর একটা ব্যাপার তো আছেই।

উচ্চ রেন্কিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রতিযোগিতার মাত্রাও বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

কানাডায় মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তিতে বাড়াবাড়ি রকমের প্রতিযোগিতার কারণে অনেকে ক্যারিবিয়ান কোনো অনুমোদিত মেডিক্যাল স্কুল, বা, পাশের দেশ আমেরিকায় চলে যায় ডাক্তারি পড়তে।

এমনকি, কেউ কেউ পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশেও সাময়িক পাড়ি জমায়।

তবে, এসব ক্ষেত্রে পড়ার খরচ কানাডার চার-পাঁচগুণ বা, তারও বেশি পড়ে যায়।

অধিকন্তু, কানাডার বাইর থেকে ডাক্তারি পাশ করে পরবর্তিতে কানাডায় ঢুকে রেসিডেন্সি পেতেও বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়; যে কারণে এদের অনেকেরই আর কানাডায় ফিরে আসা হয়ে উঠে না।

শুনে মজা পাবেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছেন এমন নজিরও অনেক।

 বিভিন্ন ব্যাচের ছাত্ররা মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারে বলে নতুনদের জন্য এ সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ।

মেডিক্যালে ভর্তির এ অভাবনীয় প্রতিযোগিতার মূল কারণ হলো, উচ্চ বেতনের নির্ভরযোগ্য চাকুরী। যেখানে লে-অফ পাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; পাশাপাশি, সামাজিক মর্যাদা, সম্মান, এসব তো আছেই।|

 

লেখক: এমএল গণি

কানাডা প্রবাসী প্রকৌশলী। সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর