০২ জুলাই, ২০২২ ১২:৫৩ পিএম

ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে ইউএইচএফপিও লাঞ্ছিত

ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে ইউএইচএফপিও লাঞ্ছিত
ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ তাওহিদুল আনোয়ার।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: হাসপাতালের বাইরে মোটরসাইকেল রাখতে বলায় ওষুধ কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধির হামলার শিকার হয়েছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা (ইউএইচএন্ডএফপিও) ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার। বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) হাসপাতাল চত্বরে এ হামলার শিকার হন তিনি।

হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে ডা. তৌহিদুল আনোয়ার আজ শনিবার (২ জুলাই) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ওই দিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আমার স্টাফরা জানালেন, বহির্বিভাগ ভবনে খুব ভিড়। ভিতরে ওষুধ কোম্পানির লোকজন গাড়ি পার্কিং করেছেন। এ কারণে রোগীরা লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না। আমি গিয়ে ৪/৫টি মোটর সাইকেল ও রোগী পরিবহনের ২/১টি ভ্যান দেখতে পাই। এ সময় গাড়ি বাইরে রেখে তাদের ভেতরে আসতে বলি। এতে কয়েকজন গাড়ি সরিয়ে নেয়। কিন্তু ফার্মাশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধি ইফেতাকারুল ইসলাম ওরফে ধলু (২৫) গাড়িসহ ভেতরে থাকতে চায়। এতে বাধা দিলে উত্তেজিত হয়ে আমার ওপর হামলা চালায়। তার হেলমেট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করতে থাকে। পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মচারী ও বহির্বিভাগের রোগীর স্বজনরা উদ্ধার করে আমাকে কক্ষে নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমার আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ ডাকে। কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে সাড়ে তিনটা লেগে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করে।’

পুলিশ বিলম্বে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুব বৃষ্টি হওয়ার কারণে আসতে দেরি হয়েছে বলে তাঁকে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন ডা. মোহাম্মদ তাওহিদুল আনোয়ার। বর্তমানে তিনি স্বাভাবিক আছেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারছেন।  

হামলার ঘটনায় শুক্রবার মামলা হয়েছে জানিয়ে ঘোড়াঘাটের ইউএইচএফপিও বলেন, এখনো আসামি ধরা পড়েনি। পুলিশ আসামি খুঁজছে।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে গতকাল ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে মিটিং হয়েছে। এতে সকল কর্মকর্তা মিলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর ও থানায় স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কারণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউএনও অফিস ও প্রকৌশল অফিস—এগুলো থানা থেকে ৮/১০ কিলোমিটার দূরে। ফলে পুলিশ ডাকলে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়।’

অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আটজন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে ৫ জনই মহিলা। তাদের প্রায়ই রাতেও ডিউটি করতে হয়। আমার সঙ্গে যা ঘটলো দিন-দুপুরে, তখন তো অনেক মানুষ ছিল। এমন ঘটনা যদি রাতের বেলায় মহিলা চিকিৎসকের সঙ্গে ঘটে। তাহলে কে নিরাপত্তা দেবে? ঘটনার ৪/৫ ঘণ্টা পর পুলিশ আসবে। ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে যায়। এর পর ২/৩ দিন ধরে আসামি খোঁজা হবে। এ রকম নিরাপত্তাহীনতায় কোন ভরসায়, কে সেবা নিশ্চিত করবে? সুতরাং সশস্ত্র কিছু আনসার থাকলে নির্বিঘ্নে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’

এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের জন্য সবাই তৎপর আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বেশ আন্তরিক। জনসাধারণও এ ব্যাপারে যথাযথ বিচারের জন্য মুখিয়ে আছেন।’

বিডিএফ’র প্রতিবাদ

নিয়মিত বিরতিতে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনায় বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তা বৈষম্যের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে বলে মত দেন তারা। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানির ওষুধ না লিখতে চিকিৎসক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস’ ফাউন্ডেশন (বিডিএফ)। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ডা. তৌহিদের উপর হামলা, কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সারা বাংলাদেশে ফার্মাশিয়ার ঔষধ বন্ধ থাকবে। আপনারা এদের এমআর, এরিয়া ম্যানেজার, আরএসএমকে ডেকে জানিয়ে দেন। এবার একসাথে এদের বর্জন করুন। এদের স্যাম্পলও নিবেন না। এদের হাইয়ার অথোরিটির চিকিৎসকদের নিকট ক্ষমা  চাইতে, দোষী এমআর’র বিরুদ্ধে  আইনগত ব্যবস্থা  নিতে হবে। প্রতিবাদের  শুরু হোক এইখানে।’

পেশাজীবী নেতার ক্ষোভ

এ বৈষম্যের বিষয়ে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে পেশাজীবী নেতা ডা. শেখ বাহারুল আলম ফেসবুকে এক পোস্টে বলেন, ‘এই সেই ঘোড়াঘাট উপজেলা, যেখানে মাত্র কিছুদিন আগে ইউএনও তাঁর পরিচ্ছন্নতাকর্মী দ্বারা আহত হলে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যে দৃষ্টিভঙ্গি ও সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল, তা আমাদের সকলের স্মরণে আছে। সেই ঘটনার পর ইউএনও অফিস ও বাসভবনে সশস্ত্র আনসার দ্বারা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অথচ পাশেই হেলথ কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ও ইউএইচএন্ডএফপিও’র কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে চিকিৎসকদের আবেদন নিবেদনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সরকারের এতটুকু টনক নড়েনি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউএইচএফপিও এবং ইউএনও’র কর্মস্থলের নিরাপত্তা প্রদানের বৈষম্যের দৃশ্যপট দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা উদাহরণ হয়ে থাকবে।’   

তিনি সকল চিকিৎসককে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে এই বৈষম্য রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক নিগ্রহ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি