ডা. শরীফ উদ্দিন

ডা. শরীফ উদ্দিন

এমবিবিএস (সিএমসি), সিসিডি (বারডেম) ডি-অর্থো (নিটোর),
হাড়-জোড়া, বাত ও ব্যথা বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন


০৪ জুন, ২০২২ ০১:২৪ পিএম

ক্যারিয়ার গাইডলাইন: বিষয় যখন অর্থোপেডিক্স

ক্যারিয়ার গাইডলাইন: বিষয় যখন অর্থোপেডিক্স
অর্থোপেডিক্সের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। অস্থিসন্ধি এবং অস্থির যেকোনো সমস্যার পাশাপাশি স্পাইনের সমস্যাগুলোও অর্থোপেডিক্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

মানবদেহের হাড় ও জোড়া সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে কাজ করেন একজন অর্থোপেডিক্স সার্জন। এই সময়ে অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিষয়ে ক্যারিয়ার হতে পারে সদ্য এমবিবিএস পাস করা একজন তরুণের প্রধান লক্ষ্য।

বর্তমানে বাংলাদেশে দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুর হার পরিসংখ্যানের দিক থেকে তৃতীয় নম্বরে রয়েছে। প্রথম স্থানে রয়েছে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ক্যান্সার। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শীগ্রই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হার দ্বিতীয় স্থানে চলে যাবে। সে হিসেবে অর্থোপেডিক সার্জনের কাজের ব্যাপ্তি এবং সম্ভাবনা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাবে।

তাছাড়া অর্থোপেডিক্সে রোগের আউটকাম এবং রোগীর সন্তুষ্টি অনেক বেশি। একজন শয্যাশায়ী স্পাইনাল ইঞ্জুরির রোগী, একজন চলাফেরায় অক্ষম পায়ের হাড়ভাঙা রোগী যখন অর্থোপেডিক সার্জনের অপারেশনের বদৌলতে সুস্থভাবে হেঁটে বাড়ি ফিরেন, তখন একজন অর্থোপেডিক সার্জনের যে আনন্দ এবং তৃপ্তি আসে, তা পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না।

অর্থোপেডিশিয়ান বলতে একজন সাধারণ মানুষ কেবল বাত ব্যথা বিশেষজ্ঞ বা এমন একজন চিকিৎসককে বুঝে থাকেন, যিনি হাড় ভাঙা রোগের চিকিৎসা দিতে পারেন। কিন্তু অর্থোপেডিক্সের ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। অস্থিসন্ধি এবং অস্থির যেকোনো সমস্যার পাশাপাশি স্পাইনের সমস্যাগুলোও অর্থোপেডিক্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আছে হ্যান্ড সার্জারি, রিকন্সট্রাকশান সার্জারি, আর্থোপ্লাস্টি, আর্থোস্কোপি, স্পাইন সার্জারি, স্পোর্টস ইনজুরি।

অর্থোপেডিক্স সার্জারির ব্যাপ্তি যেমন বিশাল, তেমনি এতে ক্যারিয়ার করার জন্যেও লাগে দীর্ঘ সাধনা, ধৈর্য এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা। অর্থোপেডিক্স সার্জারিতে ক্যারিয়ার করার পথে যে যে পথ পাড়ি দিতে হবে, তা এই লেখায় সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

যাত্রা শুরু

অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিষয়ে ক্যারিয়ার করতে চাইলে এমবিবিএস পাস করা একজন তরুণের সামনে বেশ কয়েকটি পথ খোলা থাকে।

১. ৫ বছর মেয়াদি বিএসএমইউর অধীন এমএস ডিগ্রি, 
২. ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের (বিসিপিএস) অধীন এফসিপিএস ডিগ্রি 
৩. বিএসএমইউর অধীন ২ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অর্থোপেডিক্স (ডি-অর্থো) ডিগ্রি 

এমএস

এমএস ডিগ্রি অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়য়ের (বিএসএমইউ) অধীন রেসিডেন্সি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হয়। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় শুক্রবারে ২০০ নম্বরের উপর এমসিকিউ পদ্ধতিতে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং কোর্স শুরু হয় পরবর্তী বছরের মার্চ মাসে। ইন্টার্ন শেষ হওয়া এবং কোর্স শুরুর মধ্যে এক বছরের ব্যবধান থাকতে হয়। ৫ বছর মেয়াদি এই কোর্স ২ ভাগে বিভক্ত। ২ বছরের ফেইজ ‘এ’ এবং ৩ বছরের ফেইজ ‘বি’। প্রতি ফেইজের শেষে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। অর্থোপেডিক্সে ক্যারিয়ার করতে আগ্রহীদের মধ্যে এমএস ডিগ্রি সবচেয়ে জনপ্রিয়।

এফসিপিএস

বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের (বিসিপিএস) অধীন এই ডিগ্রিও ৫ বছর মেয়াদি। প্রতি বছর পার্ট ওয়ান পরীক্ষা জানুয়ারি এবং জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বমোট তিন পেপারে এই পরীক্ষা হয়। প্রতি পেপারে ১০০ নাম্বারের জন্য ৫০টি প্রশ্ন থাকে, ৩৫টি মাল্টিপল চয়েস এবং ১৫টি প্রশ্ন সিঙ্গেল ব্যাজড। পাস মার্ক ৭০ করে। সব মিলিয়ে ২১০ নাম্বার পেতে হবে, কোনোটিতেই ৬৫ নাম্বারের কম পাওয়া যাবে না  এবং অন্তত ২ পেপারে ৭০ নম্বর পেতে হবে। 

অর্থোপেডিক্স সার্জারিতে সরাসরি পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দেওয়া যায়। আবার সার্জারিতে পার্ট ওয়ান পাস করে মিডটার্ম পরীক্ষা পাসের পর অর্থোপেডিক্স সার্জারিতে কনভার্ট করা যায়। তবে সার্জারি এবং অর্থোপেডিক্স সার্জারি উভয় বিষয়ের পার্ট ওয়ান পরীক্ষার প্রশ্ন একই। পার্ট ওয়ান পাস করার পর ২ বছর জেনারেল সার্জারিতে ট্রেনিং করে মিডটার্ম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। মিডটার্ম পাসের পর অর্থোপেডিক্স সার্জারিতে ৩ বছর ট্রেনিং করে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।

ডি-অর্থো

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই ডিগ্রি ২ বছর মেয়াদি। প্রতি বছর মার্চ মাসে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং কোর্স শুরু হয় জুলাই মাসে। নির্দিষ্ট ব্লকওয়াইজ ট্রেনিং শেষে ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যারা দ্রুত এবং অল্প সময়ের মধ্যে অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ শুরু করতে চান, তাদের কাছে এই ডিগ্রি জনপ্রিয়।

স্পেশালাইজড ট্রেনিং

এফসিপিএস, এমএস বা ডি-অর্থো পাস করার পর একজন অর্থোপেডিক্স সার্জারির বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তারপর অর্থোপেডিক্সের বিভিন্ন শাখা, যেমনঃ ট্রমা, স্পাইন সার্জারি, আর্থোপ্লাস্টি, আর্থোস্কোপি, পেডিয়েট্রিক অর্থোপেডিক্স, এলিজারভ সার্জারিতে ফেলোশিপ করার সুযোগ থাকে। ফেলোশিপ ছাড়াও নানা ধরনের হ্যান্ডস অন ট্রেনিং এবং সার্টিফিকেট কোর্স অনুষ্ঠিত  হয়। 

একজন অর্থোপেডিক সার্জন তার জ্ঞানকে শাণিত করার জন্য এসব ফেলোশিপ এবং ট্রেনিংএ অংশগ্রহণ করতে পারেন। ফেলোশিপগুলোর অধিকাংশই দেশের বাইরে গিয়ে অংশগ্রহণ করতে হয়। মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক অর্থোপেডিক সোসাইটিগুলো দেশেও আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে এসব ফেলোশিপ এবং ট্রেনিংয়ের সুযোগ করে দেয়। 

এসব ফেলোশিপ এবং ট্রেনিং যেসব সংস্থা বা সোসাইটি দিয়ে থাকে, তাদের মধ্যে সর্বজনস্বীকৃত এবং সবচেয়ে বিখ্যাত সংস্থাটি হলো AO FOUNDATION। ১৯৫৮ সালে সুইজারল্যান্ডে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইস ভাষায় AOএর পূর্ণরূপ হলো Arbeitsgemeinschaft für Osteosynthesefragen। এটার অর্থ দাঁড়ায় Association for the Study of Internal Fixation। 

AO FOUNDATION বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং কোর্সের আয়োজন করে। অধিকাংশ অর্থোপেডিক সার্জনদের নিকট এই কোর্সগুলো খুবই জনপ্রিয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সেমিনারগুলোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একজন অর্থোপেডিক সার্জন তার দক্ষতা বৃদ্ধি করে থাকেন।

মোটের উপর বলা যায়, অর্থোপেডিক্স বিষয়ের যেমন নানা সুযোগ এবং ব্যাপ্তি আছে, তেমনি এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং খ্যাতিমান হতে চাইলেও অনেক বেশি ধৈর্য, পরিশ্রম, শ্রম এবং সময়ের দরকার। তাই একজন পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং মেধাবী তরুণ চিকিৎসকের জন্য অর্থোপেডিক্স সার্জারিই হতে পারে সঠিক পছন্দ।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত